নতুন সরকারে আ’লীগে স্বস্তি

মনিরুল ইসলাম রোহান
Printed Edition

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে নজিরবিহীন পতন ঘটে আওয়ামী লীগের। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও দলটির প্রধান শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে নিরাপদ আশ্রয় নেন এবং তার সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও দলের শীর্ষ নেতৃত্বসহ পুরো বডি ভয়ে আত্মগোপনে চলে যান। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলটি দেশ-বিদেশে পালিয়ে-আত্মগোপনে থাকায় বেকায়দায় ছিল ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। গঠিত হয় বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। এর মাধ্যমে ১৭ মাস আড়ালে আবডালে থেকে জীবন পার করা নেতৃবৃন্দের মধ্যে একপ্রকার স্বস্তির আভাস দেখা গেছে। নির্বাচনের পর অন্তত এক কুড়ি দলীয় কার্যালয় খোলার ঘটনা ঘটেছে। ক্ষমতাচ্যুত দলটির বিভিন্ন অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন এবং পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে এসে সক্রিয়ভাবে তৎপরতা চালাচ্ছেন। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রকাশ্যে কর্মসূচি পালন করে তাদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরছেন।

পতিত দলটির নেতাদের ভাষ্যমতে, ড. ইউনূসকে আওয়ামী লীগের জন্য হুমকি মনে করা হতো। ছাত্রদের আন্দোলনের ঘাড়ে ভর করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হন তিনি। ওই সময় খেলাপি ঋণ আর কর্মসংস্থানের সঙ্কট।

এই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক বাণিজ্য, বিদ্যুৎ আমদানি, ট্রানজিট সুবিধা ও অবকাঠামো সংযোগ অপরিহার্য। আর এখানেই ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতা মেনে নেয়া মানেই কি রাজনৈতিক নির্ভরতা? আর অতীত ইতিহাস কী বলে যে ভারতের সহযোগিতা অর্থনৈতিক দুর্দশা কাটাতে সহায়তা করেছে? নাকি আর্থিক খাতের লুটপাটের অন্তরালে সহায়তাকারীর ভূমিকায় দেখা গেছে।

সমঝোতা বনাম সার্বভৌমতা : সূক্ষ্ম সীমারেখা

শ্রীংলার প্রস্তাবিত “প্রাগম্যাটিক কমপ্যাক্ট” বাংলাদেশের জন্য দ্বিমুখী বাস্তবতা তৈরি করে- সুযোগ : জ্বালানি সহযোগিতা; সীমান্ত বাণিজ্য বৃদ্ধি; বিনিয়োগ আর সংযোগ অবকাঠামো।

ঝুঁকি : অতিরিক্ত অর্থনৈতিক নির্ভরতা; কূটনৈতিক স্বাধীনতা সঙ্কুচিত হওয়া; অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘ভারতঘেঁষা’ তকমা।

বাংলাদেশের ইতিহাস দেখায়, একতরফা নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। তাই দিল্লির সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন যেমন জরুরি, তেমনি ভারসাম্য রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাপ : বিএনপির সামনে শুধু কূটনৈতিক নয়, রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। দলের ভেতরে জাতীয়তাবাদী আবেগ, ভারতের শাসক শ্রেণীর অখণ্ড ভারত দর্শন এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির চাপ রয়েছে। অতীতে খালেদা জিয়ার সময়কার নীতির স্মৃতি এখনো রাজনৈতিক আলোচনায় সক্রিয়।

একই সাথে তরুণ ভোটারদের একাংশ ‘প্রতিবাদী রাজনীতি’ থেকে উঠে আসা শক্তির দিকে ঝুঁকছে। ফলে সরকার যদি দিল্লির সাথে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হয়, সেটি বিরোধীদের জন্য রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।

দিল্লির নিরাপত্তা অগ্রাধিকার : ঢাকার জন্য বার্তা

শ্রীংলা স্পষ্টভাবে বলেছেন- বাংলাদেশ যেন কোনো অবস্থাতেই পাকিস্তান-কেন্দ্রিক কৌশলে জড়িয়ে না পড়ে এবং ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্ব দেয়। সেই উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে প্রতিরক্ষা নিয়ন্ত্রণ।

এটি ভারতের স্বাভাবিক কৌশলগত অবস্থান। তবে প্রশ্ন উঠছে- বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা ও স্বার্থ কি সমান গুরুত্ব পাবে? নিরাপত্তা স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ মেনে নেয়া হলে সার্বভৌমত্ব রক্ষা পাবে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্পর্ক হতে হবে ‘পারস্পরিক’, ‘একতরফা’ কোনোভাবেই নয়।

সামনে কী কৌশল নেবে ঢাকা : বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি সরকারের জন্য কার্যকর কৌশল হতে পারে- ভারতের সাথে সহযোগিতা, কিন্তু নীতিগত স্বাধীনতা বজায় রাখা; বাণিজ্যে বহুমুখীকরণ (চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য); আঞ্চলিক সংযোগে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি; অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে জোর দেয়। অর্থাৎ, দিল্লির সাথে সম্পর্ক হবে অংশীদারত্বের, নির্ভরতার নয়।

কোন পথ বেছে নেবে নতুন সরকার?

শ্রীংলার লেখাটি মূলত ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে। সেখানে সহযোগিতার আহ্বান যেমন আছে, তেমনি কৌশলগত সতর্কবার্তাও রয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা আরো জটিল। এখানে অর্থনীতি, জাতীয়তাবাদ, আঞ্চলিক রাজনীতি ও সার্বভৌমতার প্রশ্ন একে-অপরের সাথে জড়িত।

নতুন সরকারের সামনে তাই আসল চ্যালেঞ্জ- ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন, কিন্তু আত্মসমর্পণ নয়; সহযোগিতা, কিন্তু সমতার ভিত্তিতে। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত ঢাকারই।

এই মুহূর্তে প্রশ্নটি শুধু কূটনৈতিক নয়, ঐতিহাসিকও- বিএনপি কি বাস্তববাদী উন্নয়নের পথে হাঁটবে, নাকি পুরনো আবেগের রাজনীতিতে ফিরে যাবে?