পূর্ব জেরুসালেমে জাতিসঙ্ঘ সংস্থার দফতর গুঁড়িয়ে দিলো ইসরাইল

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition
  • গাজায় জোর করে উচ্ছেদের নির্দেশ ইসরাইলের
  • যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত

অধিকৃত পূর্ব জেরুসালেমে জাতিসঙ্ঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ-এর সদর দফতরের ভবন গুঁড়িয়ে দিতে শুরু করেছে ইসরাইল। মঙ্গলবার শেখ জাররাহ এলাকায় অবস্থিত সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে ইসরাইলি বাহিনী বুলডোজার নিয়ে অভিযান চালায়। খবর আলজাজিরার।

ইউএনআরডব্লিউএ এক বিবৃতিতে জানায়, ইসরাইলি সেনারা সংস্থাটির কর্মীদের জোরপূর্বক বের করে দেয় এবং কর্মীদের ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করে। সংস্থাটি বলেছে, এটি শুধু ইউএনআরডব্লিউএর ওপর হামলা নয়, বরং জাতিসঙ্ঘের মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, আশপাশের রাস্তা সিল করে দিয়ে ভারী সামরিক উপস্থিতির মধ্যে ভবনের ভেতরের স্থাপনা ভাঙা হয়। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় দাবি করেছে, নতুন আইনের আওতায় ইউএনআরডব্লিউএর কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেনগভির ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে একে ‘ঐতিহাসিক দিন’ বলে মন্তব্য করেন। এর আগে ইসরাইল ২০২৪ সালের অক্টোবরে একটি আইন পাস করে ইউএনআরডব্লিউএর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে এবং পরে সংস্থাটির বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগও বন্ধ করে দেয়। জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছেন এবং ইসরাইলকে আইন প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন। ইউএনআরডব্লিউএর কার্যক্রম বন্ধ হওয়ায় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে প্রায় ২৫ লাখ শরণার্থী মারাত্মক মানবিক সঙ্কটে পড়েছে।

এ দিকে ইউএনআরডব্লিউএ স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা (পিএলও)। এক লিখিত বিবৃতিতে সংগঠনটি একে আন্তর্জাতিক আইনের ‘গুরুতর ও বিপজ্জনক লঙ্ঘন’ বলে উল্লেখ করেছে। পিএলওর মানবাধিকার ও সিভিল সোসাইটি বিভাগ জানায়, ইউএন ভবনে ইসরাইলি পতাকা উত্তোলন এবং জাতিসঙ্ঘের পতাকা নামিয়ে ফেলা একটি পরিকল্পিত আগ্রাসী পদক্ষেপ। এটি জাতিসঙ্ঘ সনদ ও ১৯৪৬ সালের বিশেষাধিকার চুক্তির সরাসরি লঙ্ঘন। পিএলও আরো বলেছে, একজন দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরাইলের যে আইনি দায়িত্ব রয়েছে, এই পদক্ষেপ তা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছে। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

যুদ্ধবিরতির মধ্যেই গাজায় জোরপূর্বক উচ্ছেদের নির্দেশ ইসরাইলের : যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর প্রথমবারের মতো গাজার দক্ষিণাঞ্চলে জোরপূর্বক উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছে ইসরাইল। খান ইউনুসের পূর্বে বানি সুহেইলা এলাকায় বসবাসরত অন্তত ৭০টি ফিলিস্তিনি পরিবারকে এলাকা ছাড়তে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। খবর রয়টার্সের।

সোমবার ইসরাইলি বাহিনী আরবি, হিব্রু ও ইংরেজি ভাষায় লেখা লিফলেট ছড়িয়ে জানায়- এলাকাটি এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং সবাইকে অবিলম্বে সরে যেতে হবে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এটি গত কয়েক মাসে ‘নিরাপত্তা সীমারেখা’ বারবার সম্প্রসারণের ধারাবাহিক অংশ। গাজার মিডিয়া অফিস বলছে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে খান ইউনুসের পূর্বাঞ্চলে পাঁচবার এলাকা দখল বাড়ানো হয়েছে, এতে অন্তত ৯ হাজার মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। মানবিক সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, এই উচ্ছেদ গাজায় আশ্রয় সঙ্কট আরো তীব্র করবে। বর্তমানে গাজার প্রায় পুরো জনগোষ্ঠী সীমিত এলাকায় অস্থায়ী তাঁবু ও ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনে বসবাস করছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও এ ধরনের পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরো অনিশ্চিত করে তুলছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

দ্বিতীয় দিনের মতো হেবরনে ইসরাইলি সামরিক অভিযান : অধিকৃত পশ্চিম তীরের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর হেবরনে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো সামরিক অভিযান চালাচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী। স্থানীয় সূত্র জানায়, শহরের বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। ইসরাইলি সেনারা ফিলিস্তিনিদের বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশি চালাচ্ছে এবং প্রকাশ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। হেবরনের দক্ষিণাঞ্চলে কারফিউ জারি থাকায় স্বাভাবিক জীবন পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী আগেই জানিয়েছে, এই অভিযান কয়েক দিন চলতে পারে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিম তীরেও হামলা ও অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ বাড়িয়েছে ইসরাইল। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, অক্টোবর ২০২৩ থেকে এখন পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ১,১০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২১ হাজারের বেশি আটক হয়েছেন।

যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত : যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ হামলায় অন্তত দুই ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন বলে হাসপাতাল সূত্রের বরাতে জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি। উত্তর গাজার জাবালিয়া শহরের পশ্চিমে আল-ফালুজা এলাকায় ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে ২০ বছর বয়সী নূর আল-মাকুসি ও সাবির আবু বেইদ আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একই সময়ে বেইত লাহিয়ার বিভিন্ন এলাকায় ইসরাইলি কামান থেকে গোলাবর্ষণ করা হয়। এ ছাড়া গাজা শহরের পূর্বাঞ্চলের সিক্কা সড়কে বিমান হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। মধ্য গাজায় আল-বুরেইজ শরণার্থী শিবিরের পূর্বে কামান হামলা এবং দেইর আল-বালাহর দক্ষিণ-পূর্বে হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানো হয়। দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের পূর্বে ইসরাইলি যুদ্ধবিমান দু’টি বিমান হামলা চালায়। স্থানীয় সূত্র বলছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৪৬৫ ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক হাজার ২৮৭ জন আহত হয়েছেন। গাজা উপত্যকায় তীব্র শীত ও মানবিক সহায়তা সঙ্কটের মধ্যে ঠাণ্ডাজনিত কারণে মারা গেছে সাত মাস বয়সী এক শিশু। হাসপাতাল সূত্র জানায়, পূর্ব গাজা শহরের দারাজ এলাকায় বসবাসকারী শিশু শাজা আবু জাররাদের হৃদযন্ত্র হঠাৎ বন্ধ হয়ে মারা যায়। ফিলিস্তিনি আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, অঞ্চলটি বর্তমানে মেরু অঞ্চল থেকে আসা তীব্র শীতল বায়ুর প্রভাবে রয়েছে। প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও আশ্রয়সামগ্রীর অভাবে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। শীত মৌসুম শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত গাজায় অন্তত ৯টি শিশু ঠাণ্ডাজনিত কারণে মারা গেছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও মানবিক পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি বলে জানিয়েছে সহায়তা সংস্থাগুলো।

ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ নিয়ে বাড়ছে সন্দেহ : গাজা পুনর্গঠন ও ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা তদারকির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ‘বোর্ড অব পিস’ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাড়ছে সংশয়। যদিও হোয়াইট হাউস এটিকে শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি বৈশ্বিক কাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করছে, সমালোচকরা বলছেন, বাস্তবতার সাথে এর দূরত্ব অনেক। খবর আলজাজিরার।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, বোর্ডটি গাজার যুদ্ধপরবর্তী পুনর্গঠন তদারকি করবে এবং একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটি দৈনন্দিন প্রশাসন চালাবে। তবে গাজার ভেতরে এই ঘোষণার কোনো বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ধ্বংসস্তূপ, নিরাপত্তাহীনতা এবং অব্যাহত ইসরাইলি হামলার মধ্যে সাধারণ মানুষের কাছে ‘ফেজ টু’ শুধুই কাগুজে ঘোষণা। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, যাদের সমর্থনে গাজা ধ্বংস হয়েছে, তাদের দিয়েই পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, এতে আস্থা তৈরি হচ্ছে না। এখনো ড্রোনের শব্দ, বিচ্ছিন্ন হামলা এবং নিরাপত্তাহীনতা নিত্যদিনের বাস্তবতা। বিশ্লেষকদের মতে, শান্তি শুধু বোর্ড বা ঘোষণার মাধ্যমে আসে না। শান্তি অনুভূত হয় যখন মানুষ নিরাপদে ঘুমাতে পারে, হাসপাতাল কার্যকর থাকে এবং শিশুরা ভয় ছাড়া বড় হতে পারে। গাজার মানুষের কাছে ‘বোর্ড অব পিস’ আপাতত একটি প্রতীক মাত্র। বাস্তব পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত এই উদ্যোগ তাদের কাছে দূরের কোনো কূটনৈতিক শব্দই থেকে যাবে।

গাজা ইস্যু আন্তর্জাতিকীকরণে ক্ষুব্ধ ইসরাইল : গাজাকে আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত করার ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ উদ্যোগে প্রকাশ্য অসন্তোষ জানিয়েছে ইসরাইল। বিশেষ করে বোর্ডে তুরস্ক ও কাতারের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আপত্তি তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। খবর মিডলিস্ট আইয়ের। ডাভোস অর্থনৈতিক ফোরামে বোর্ডটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ট্রাম্প। এতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ ট্রাম্পঘনিষ্ঠরা থাকলেও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ও কাতারি কূটনীতিক আলি আল-ছাওয়াদির অন্তর্ভুক্তি ইসরাইলকে উদ্বিগ্ন করেছে। নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, বোর্ডের এই গঠন ইসরাইলের নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, গাজায় তুরস্ক ও কাতারের ভূমিকা বাড়লে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের পথ খুলে যেতে পারে- যা ইসরাইল চায় না। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, বোর্ড অব পিস মূল সমস্যার সমাধান নয়। বরং ইসরাইল ও হামাসের ওপর কার্যকর চাপই যুদ্ধ-পরবর্তী স্থিতিশীলতার চাবিকাঠি। ট্রাম্পের এই উদ্যোগ ইসরাইলের জন্য কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি করলেও, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ভাঙার পর্যায়ে যাবে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মার্কিন অনুরোধ সত্ত্বেও রাফাহ সীমান্ত খুলছে না ইসরাইল : মার্কিন প্রশাসনের অনুরোধ সত্ত্বেও গাজা উপত্যকার সাথে মিসরের রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং খুলে না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরাইল। ইসরাইলি দৈনিক ইয়েদিওথ আহরোনোথের এক খবরের বরাতে আনাদোলু এজেন্সি জানায়, রোববার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এক জ্যেষ্ঠ ইসরাইলি কর্মকর্তা বলেন, যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ শুরুর ঘোষণা দিলেও তেল আবিব সরকার রাফাহ ক্রসিং খোলার বিষয়ে সম্মত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ থাকা সত্ত্বেও সীমান্তটি বন্ধই থাকবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর আগে ইসরাইল জানায়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর সংঘর্ষে নিহত ইসরাইলি সেনা রান গিভিলির লাশ হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত রাফাহ খোলা হবে না। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের মে মাস থেকে রাফাহ সীমান্ত ইসরাইলের দখলে রয়েছে, যা গাজার বাইরের বিশ্বের সাথে একমাত্র অইসরাইলি সংযোগ পথ।