ড. ইউনূসের সাথে বিএনপির বৈঠক

রোডম্যাপে সুনির্দিষ্ট আশ্বাস মেলেনি

স্বৈরাচার ফিরে এলে দায় সরকারের

Printed Edition
প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে বিএনপি নেতাদের বৈঠক : পিআইডি
প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে বিএনপি নেতাদের বৈঠক : পিআইডি

বিশেষ সংবাদদাতা

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে বৈঠকে ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের রোডম্যাপ দেয়ার দাবি তুললেও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো আশ্বাস পায়নি বিএনপি। দলটি বৈঠকে বিতর্কিত উপদেষ্টাদের বাদ দিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছে। তবে তারা প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগ চায়নি বলে বৈঠকে জানানো হয়।

গতকাল শনিবার রাত পৌনে ৮টার দিকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় শুরু হওয়া এ বৈঠক চলে ৫০ মিনিটের মতো। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপির চার সদস্যের প্রতিনিধি দল এতে অংশ নেন। প্রতিনিধি দলে ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সালাহউদ্দিন আহমদ।

ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদ নির্বাচন নিয়ে সেনাপ্রধানের বক্তব্য, বিভিন্ন বিষয়ে তার সাথে অন্তর্বর্তী সরকারের মতভিন্নতা; সেই সাথে প্রধান উপদেষ্টার ‘পদত্যাগের ভাবনা’ সব কিছু মিলিয়ে রাজনীতিতে তৈরি হওয়া অস্থিরতার মধ্যে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

জানা গেছে, বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন নিয়ে দলের অবস্থান লিখিতভাবে ড. ইউনূসকে দেয়া হয়।

বৈঠক শেষে লিখিত বক্তব্যে ড. মোশাররফ বলেন, ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র উত্তরণের লক্ষ্যে বিএনপি প্রথম থেকেই একটি সুস্পষ্ট জাতীয় নির্বাচনী রোডম্যাপ দাবি করে আসছে। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে সরকারের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার স্বার্থে বিতর্কিত উপদেষ্টাদের বাদ দিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠন করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপির প্রতিটি নেতাকর্মী পারিবারিক, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, এজন্য আওয়ামী লীগের বিচারের দাবি সবচেয়ে বেশি বিএনপি’র। এই বিচার প্রক্রিয়া কোনোভাবে অসম্পন্ন থেকে গেলে বিএনপি সরকারের দায়িত্বে গেলে বিচারের আওতায় এনে তা স্বাধীন বিচার বিভাগের মাধ্যমে পরিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করবে।’

মোশাররফ বলেন, ‘নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সংস্কার কার্যক্রম অবিলম্বে সম্পন্ন করে ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য দ্রুত একটি রোডম্যাপ প্রদানের দাবি জানিয়েছি। বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বাস করে যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মূল দায়িত্ব হচ্ছে একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে গণতন্ত্র উত্তরণের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা। যেকোনো উছিলায় নির্বাচন যত বিলম্ব করা হবে আমরা মনে করি জাতির কাছে আবার স্বৈরাচার আবারো ফিরে আসার ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে। এর দায়দায়িত্ব বর্তমান সরকার এবং তাদের সাথে সংশ্লিষ্টদের উপরে বর্তাবে।’

ড. মোশাররফ বলেন, বিএনপি কখনোই প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগ চায়নি, বরঞ্চ প্রথম দিন থেকেই এই সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে যাচ্ছে।

রোডম্যাপ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু বলেননি : রোডম্যাপ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো আশ্বাস পেয়েছেন কি না এ প্রশ্নের উত্তরে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘রোডম্যাপ নিয়ে স্পেসিফিক কোনোরকম কথা হয়নি। তিনি স্পেসিফিক কিছু জানাননি। হয়তোবা তারা প্রেসের মাধ্যমে এ বিষয়ে জানাবেন।’ বৈঠক নিয়ে আপনারা সন্তুষ্ট কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে বিএনপির নেতারা কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।

ডিসেম্বরের আগেও নির্বাচন করা সম্ভব : আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ সময় বলেন, ‘মূলত সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচন- এ তিনটার ওপর আলোচনা হয়েছে। সংস্কারের ব্যাপারে আমরা যা বলেছি তাতে তারা একমত হয়েছেন। সংস্কারগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে সম্পন্ন করতে হবে এবং সেই কাজ অতি সহসা সম্পন্ন করা সম্ভব। এখানে কোনো দ্বিমত পোষণ তারা করেননি। বিচার নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে সেখানেও তাদের কোনো দ্বিমত নাই। সুতরাং ডিসেম্বরের আগেও নির্বাচন করা সম্ভব। এ আলোচনা হয়েছে এখানে।’

রোডম্যাপ নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে ড. মোশাররফ বলেন, ‘আমাদের আলোচনার মধ্যে আসছে সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচন। আমরা বলেছি একটার সাথে আরেকটার কোনো সম্পর্ক নাই। কেননা সংস্কার চলমান বিষয়ে এটা চলতে থাকবে। আমরা আশা করেছি এ সরকার সবার সাথে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটা সংস্কার প্রস্তাব দেবে। সেটা চলমান থাকবে এবং আমাদের যদি ভবিষ্যতে জনগণ ক্ষমতায় বসায় সেই সংস্কার বাস্তবায়নের আমরা প্রচেষ্টা নেবো।’ তিনি বলেন, ‘আমরা স্বৈরাচারী সরকারের কর্তাব্যক্তিদের এবং যারা দায়ী তাদের বিচার চাই। আমরা বিচারের পক্ষে, তবে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এ বিচার সম্পন্ন করবে। এটা কোনো দিন-তারিখ ঠিক করে দেয়া সম্ভব নয়।’

সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচন নিয়ে কথা বলেছি : ড. মঈন খান বলেন, নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং আর দুইজন ছাত্র উপদেষ্টা যাদের কারণে এ সরকারের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে তাদেরকে বাদ দেয়ার জন্য আমরা আজকে লিখিত বক্তব্যে জানিয়েছি। আমরা আমাদের বক্তব্য দিয়েছি সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচন নিয়ে। আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলেছি এগুলোর একটার সাথে আরেকটার কোনো সম্পর্ক নেই এবং যদি দ্রুত নির্বাচন দেয়া হয় তাহলে যেসব নৈরাজ্য হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে তা কেটে যাবে।

প্রধান উপদেষ্টার সাথে বৈঠকে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রিয়াজ উপস্থিত ছিলেন।