ভারত থেকে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র দেশে ঢুকছে, ট্রানজিট পয়েন্ট রাজশাহী সীমান্ত

দু’দিন পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এই নির্বাচন ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে চোরাকারবারিরা। ভোট গ্রহণের বেশ আগে থেকেই ভারত থেকে সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢুকছে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক। এসব অস্ত্র ও বিস্ফোরক রাজশাহী হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যাচ্ছে। তবে এসব অত্যাধুনিক অস্ত্রের কিছু কিছু চালান রাজশাহীতে উদ্ধার করা হচ্ছে। অস্ত্র উদ্ধার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে এর মূলহোতা ও চোরাকারবারিরা।

আব্দুল আউয়াল, রাজশাহী ব্যুরো
Printed Edition

আর মাত্র দু’দিন পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এই নির্বাচন ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে চোরাকারবারিরা। ভোট গ্রহণের বেশ আগে থেকেই ভারত থেকে সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢুকছে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক। এসব অস্ত্র ও বিস্ফোরক রাজশাহী হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যাচ্ছে। তবে এসব অত্যাধুনিক অস্ত্রের কিছু কিছু চালান রাজশাহীতে উদ্ধার করা হচ্ছে। অস্ত্র উদ্ধার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে এর মূলহোতা ও চোরাকারবারিরা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, অস্ত্র চোরাচালানের ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে রাজশাহীকে। তবে রাজশাহীর পাশাপাশি চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ সীমান্তও ব্যবহার হচ্ছে রুট হিসেবে। মূলত সীমান্তবর্তী এই জেলাগুলো দিয়ে অস্ত্র ঢুকছে। সবচেয়ে বেশি অস্ত্র ঢুকছে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে। এসবের বেশিরভাগ চালানই আসছে ভারত থেকে।

সূত্রটি জানিয়েছে, রাজশাহীর চারঘাট, বাঘা ও পবা, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর, শিবগঞ্জ, ভোলাহাট এবং নওগাঁর পোরশা, ধামইরহাট ও সাপাহার সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র আসছে। সীমান্ত দিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র চোরাচালানের অন্যতম রুট চাঁপাইয়ের শিবগঞ্জ। ভারত থেকে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে দেশে ঢুকছে এসব আগ্নেয়াস্ত্র।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ভারত থেকে বিভিন্ন পণ্যের ট্রাকেও অস্ত্র আসছে। সবচেয়ে বেশি অস্ত্র ঢুকছে সীমান্ত লাগায়ো পদ্মা নদীর চর দিয়ে। যেগুলো রাজশাহীতে নিয়ে এসে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে মূল হোতারা। কারা দেশে এসব অস্ত্র ঢুকাচ্ছে তা নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গেল বছরের ২৬ অক্টোবর চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ছেড়ে যাওয়া বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনে অভিযান চালিয়ে আটটি বিদেশী পিস্তল, ১৪টি ম্যাগাজিন, ২৬টি গুলি, গানপাউডার ও প্লাস্টিক বিস্ফোরক উদ্ধার করে সেনাবাহিনী। এতে নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরপর সীমান্ত এলাকায় অস্ত্র উদ্ধার অভিযান শুরু হয়।

সূত্র বলছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের কয়েকটি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বিস্ফোরক আসছে। এর মধ্যে কিরণগঞ্জ, বিনোদপুর, বিশ্বনাথপুর, কারিগঞ্জ সোনামসজিদ এবং ধীনগরে কয়েকজন সীমান্তপথে অস্ত্র চোরাচালানে জড়িত। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার মীরগঞ্জ, চকরাজাপুর এবং পাকুড়িয়া দিয়ে ঢুকছে অস্ত্র। তবে এসব এলাকা মাদক চোরাচালানের অন্যতম রুট হলেও এর পাশাপাশি এখন অস্ত্রও আসছে।

সূত্রটি আরো জানায়, ভারতীয় অস্ত্র চোরাকারবারিরা পশ্চিমবঙ্গের মালদার সীমান্তবর্তী কালিয়াচক, বৈষ্ণবনগর, খোজাপুর, মোজামপুর এবং মুর্শিদাবাদের সমশেরগঞ্জ এলাকায় অবস্থান করে। এসব অস্ত্র প্রথমে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে মজুদ হয়। সেখান থেকে সীমান্তপথে বাংলাদেশে আসে সিন্ডিকেটের হাতে। এরপর পাঠানো হয় সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায়। অবৈধ অস্ত্র বহন ও পাচারের জন্য রয়েছে আরেকটি সিন্ডিকেট। এরা বাংলাদেশে অস্ত্রের ক্রেতাদের সাথে যোগাযোগ করে চালান নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর শর্তে দরদাম ঠিক করে।

গেল এক বছরে র‌্যাব-৫৭০টির বেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৫৭৪ কেজি গান পাউডার উদ্ধার করে। জেলা পুলিশ উদ্ধার করেছে চারটি বিদেশী পিস্তল, ১১ রাউন্ড গুলি, চারটি ম্যাগাজিন। এ ছাড়া সীমান্ত থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অস্ত্র উদ্ধার করেছে বিজিবি।

সবশেষ রাজশাহীর বাঘা উপজেলা সীমান্তে ৬ ফেব্রুয়ারি ভোর সাড়ে ৫টার দিকে রাওথা থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র উদ্ধার করে বিজিবি। এর মধ্যে দুইটি বিদেশী পিস্তল, চারটি ম্যাগজিন, আট রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। এর আগে গেল ১৭ জানুয়ারি বিজিবির একটি টিম কাটাখালী পৌরসভার সীমান্ত এলাকা থেকে মাটিতে পুতে রাখা অবস্থায় দুইটি বিদেশী পিস্তল, চারটি ম্যাগজিন ও আট রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে।

রাজশাহী ব্যাটালিয়ান-১ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিয়াজ শাহরিয়ার জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে জেলায় মোট ১০টি বেইজ ক্যাম্প, ২৮ প্লাটুন মোবাইল স্ট্রাইকিং ফোর্স, কে-৯ সদস্য, পদ্মানদীতে সাতটি স্পীডবোট এবং ফাস্ট পেট্রোল ক্রাফট, সীমান্তের ১৬টি বিওপির প্রত্যেকটিতে ১০ জন করে স্ট্রাইকিং রিজার্ভসহ মোট ৭০০ সদস্য মোতায়ন করা হয়েছে। কোনোভাবেই সীমান্ত দিয়ে যাতে অস্ত্র প্রবেশ না করতে না পারে সেদিকে নজর আছে আমাদের।

রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহানের আগে জানিয়েছিলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও ব্যবহার রোধে পুলিশের কার্যক্রম ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রতিটি ঘটনার আগে তথ্য সংগ্রহ, জড়িতদের শনাক্তকরণ ও আটক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ সদর দফতরের নির্দেশনা মোতাবেক কাজ চলমান। এরইমধ্যে বেশ কিছু অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তবে ভোটের পরিবেশ স্বাভাবিক আছে বলে মনে করেন তিনি।