ডিজিটাল লেনদেন বাড়লেও টাকার বেশির ভাগ এখনো অফলাইনে

জাতীয় পেমেন্ট ডাটায় ধরা পড়ল বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থার দ্বৈত বাস্তবতা

লেনদেনের সংখ্যায় ডিজিটাল মাধ্যম এগিয়ে থাকলেও, মোট লেনদেনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অর্থ এখনো হাতবদল হচ্ছে নন-ডিজিটাল বা নগদ ও ম্যানুয়াল ব্যবস্থায়। এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থার একটি গভীর দ্বৈততা উন্মোচন করে- এক দিকে এমএফএস ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে লেনদেনের বিস্ফোরণ, অন্য দিকে বড় অঙ্কের অর্থ এখনো ব্যাংকের কাউন্টার, চেক ও ম্যানুয়াল ট্রান্সফারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

বাংলাদেশে ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার নিয়ে সরকারি ভাষ্য যতই আশাবাদী হোক না কেন, বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। জাতীয় পেমেন্ট ডাটার (সেপ্টেম্বর ২০২৫) বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে- লেনদেনের সংখ্যায় ডিজিটাল মাধ্যম এগিয়ে থাকলেও, মোট লেনদেনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অর্থ এখনো হাতবদল হচ্ছে নন-ডিজিটাল বা নগদ ও ম্যানুয়াল ব্যবস্থায়। এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থার একটি গভীর দ্বৈততা উন্মোচন করে- এক দিকে এমএফএস ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে লেনদেনের বিস্ফোরণ, অন্য দিকে বড় অঙ্কের অর্থ এখনো ব্যাংকের কাউন্টার, চেক ও ম্যানুয়াল ট্রান্সফারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

লেনদেনের সংখ্যায় ডিজিটাল, টাকার নিয়ন্ত্রণ অফলাইনে : বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ মোট আর্থিক লেনদেন হয়েছে ৯৯ কোটি ৯০ লাখের বেশি, যার মোট মূল্য প্রায় ২৭.৭৭ ট্রিলিয়ন টাকা। লেনদেনের সংখ্যায় ডিজিটাল লেনদেন : ৪৮.৪৮% আর নন-ডিজিটাল লেনদেন : ৫১.৫২%। লেনদেনের মূল্যের বিবেচনায় ডিজিটাল লেনদেন : মাত্র ৩৪.৭১% আর নন-ডিজিটাল লেনদেন : বিশাল ৬৫.২৯%। অর্থাৎ, লেনদেন যত ডিজিটাল হচ্ছে, টাকার বড় অংশ ততটাই রয়ে যাচ্ছে অফলাইন ব্যবস্থায়।

ব্যাংকিং সেক্টর : ডিজিটাল কম, নগদ ও ম্যানুয়াল আধিপত্যে ব্যাংকিং খাতে মোট লেনদেনের চিত্র আরো স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখায়। ব্যাংকিং সেক্টরের ডিজিটাল লেনদেন সংখ্যা : ৫.৯৮% আর লেনদেন মূল্য : ৩০.৯৫%। অন্য দিকে ব্যাংকিং সেক্টরের নন-ডিজিটাল লেনদেন লেনদেন সংখ্যা : ১১.১৬% আর লেনদেন মূল্য : ৬২.৪০%।

বিশেষভাবে লক্ষণীয়- ম্যানুয়াল ট্রান্সফার (চেক/ভাউচার) একাই মোট লেনদেন মূল্যের ৩২.১৬%, আর ক্যাশ ডিপোজিট ও উইথড্রয়াল : ২২.৬৮%। অর্থাৎ বড় অঙ্কের অর্থপ্রবাহ এখনো মানুষের হাতে-হাতে, কাগজে-কলমে।

আরটিজিএস : কম লেনদেন, বিশাল অঙ্কের টাকা : ব্যাংকিং ডিজিটাল লেনদেনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো আরটিজিএস (রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট)। এ ধরনের লেনদেন সংখ্যা : মাত্র ০.১১% কিন্তু মোট লেনদেন মূল্য : ২২.৭০%।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বড় করপোরেট, রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও উচ্চমূল্যের আর্থিক লেনদেন এখনো সীমিতসংখ্যক খেলোয়াড়ের হাতে কেন্দ্রীভূত- যা আর্থিক ক্ষমতার অসম বণ্টনের ইঙ্গিত দেয়।

পিওএস, কিউআর ও কার্ড : ডিজিটাল অর্থনীতির দুর্বল ভিত্তি : ডিজিটাল পেমেন্টের ‘ভবিষ্যৎ’ হিসেবে যেসব মাধ্যম প্রচার করা হয়- পিওএস, কিউআর, কার্ড- তাদের অবদান বাস্তবে অত্যন্ত সীমিত। পিওএস লেনদেন মূল্য : মাত্র ০.০৩%, কিউআর লেনদেন মূল্য : ০.০১% এবং এটিএম (এনপিএসবি) : ০.১৮%।

এটি প্রমাণ করে- ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো থাকলেও, ভোক্তাপর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা ও ব্যবহার এখনো দুর্বল।

মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) : সংখ্যায় রাজা, টাকায় ছোট : এমএফএস খাতেই সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়। এতে মোট লেনদেন সংখ্যা : ৮২.৮৬% কিন্তু মোট লেনদেন মূল্য : মাত্র ৬.৬৫%। বিশেষভাবে- এমএফএস ডিজিটাল লেনদেন : ৩.৭৬%, এমএফএস ক্যাশ ইন/আউট : ২.৮৯%। এর মানে হলো- এমএফএস মূলত ক্ষুদ্র ও দৈনন্দিন লেনদেনের মাধ্যম, বড় অর্থপ্রবাহ এখনো ব্যাংক ও নগদের হাতে।

নগদনির্ভরতা : কালো টাকা ও অনিয়মের ঝুঁকি

অর্থনীতিবিদদের মতে, এত বড় অংশের নন-ডিজিটাল লেনদেন- করফাঁকি সহজ করে; কালো টাকার প্রবাহ বাড়ায়; মানিলন্ডারিং ঝুঁকি তৈরি করে এবং নীতিনির্ধারণে ডেটা ঘাটতি সৃষ্টি করে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেন, ‘ডিজিটাল লেনদেন যতটা বাড়ছে, তার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে নগদ ও ম্যানুয়াল ট্রান্সফারের মূল্য। এটা আর্থিক সংস্কারের জন্য অশনিসঙ্কেত।’

নীতিগত প্রশ্ন : ডিজিটালাইজেশন কার জন্য?

এই পরিসংখ্যান কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে- বড় করপোরেট ও প্রভাবশালীরা কেন এখনো ম্যানুয়াল ও ক্যাশ-নির্ভর? আরটিজিএস ও ইএফটি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও নজরদারি কতটা কার্যকর? ডিজিটাল পেমেন্ট কি শুধু সাধারণ মানুষের জন্য, আর বড় টাকা কি বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য আলাদা পথে চলবে?

এ অবস্থায় করণীয় সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ হলো- বড় অঙ্কের নগদ ও চেক লেনদেনে নিরুৎসাহমূলক নীতি, আরটিজিএস ও ম্যানুয়াল ট্রান্সফারে শক্ত নজরদারি; পিওএস ও কিউআর ব্যবহারে প্রণোদনা ও বাধ্যবাধকতা; কর ও শুল্ক ব্যবস্থার সাথে ডিজিটাল পেমেন্ট সংযুক্তি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য প্রকাশে আরো স্বচ্ছতা আনা।

বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থায় ডিজিটালাইজেশন এখনো দুই গতিতে চলছে- সাধারণ মানুষের ছোট লেনদেনে ডিজিটাল; কিন্তু বড় টাকার বেলায় অফলাইন। এই দ্বৈততা ভাঙতে না পারলে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে।