কারখানা বন্ধে সঙ্কটে গার্মেন্ট ও টেক্সটাইল খাত

Printed Edition

বুটেক্স প্রতিনিধি

  • গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কটে উৎপাদন ব্যাহত, বায়ারদের আস্থায় ফাটল
  • বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের ভিজিট ও অডিট বাতিলে আস্থার ঘাটতির ইঙ্গিত

বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও গার্মেন্ট শিল্প বর্তমানে গভীর সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ২২০টিরও বেশি গার্মেন্ট ও টেক্সটাইল কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের অন্যতম প্রধান রফতানি খাত তীব্র চাপে পড়েছে। এর প্রভাব কেবল রফতানি আয়ে সীমাবদ্ধ নয়; পুরো শিল্পশৃঙ্খল, শ্রমবাজার এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একই সাথে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।

এই সঙ্কটের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক বায়ারদের আচরণে। সাম্প্রতিক সময়ে এইচঅ্যান্ডএম, জারা, নাইকের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের ভিজিট ও অডিট বাতিল হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের প্রতি আস্থার ঘাটতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। পাশাপাশি এলইইডি ও বিভিন্ন কমপ্লায়েন্স অডিট স্থগিত হওয়ায় পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উৎপাদনে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে একাধিক কাঠামোগত কারণ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে টেক্সটাইল শিল্প মূলত উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের পরিশ্রমের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও সরকারের কার্যকর সহায়তা ছিল সীমিত। শিল্প টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক সাপোর্ট- যেমন কাঁচামালের সহজলভ্যতা, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ- বাস্তবে যথাযথভাবে নিশ্চিত হয়নি। বরং কর ও বিভিন্ন চার্জ বৃদ্ধির মাধ্যমে শিল্পের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় বিদেশ থেকে সুতা আমদানি বাড়ায় দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যদিও দেশের স্পিনিং শিল্পে বিশ্বমানের আধুনিক যন্ত্রপাতি ও উল্লেখযোগ্য উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, নীতিগত দুর্বলতার কারণে এ খাত ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে।

তবে সঙ্কটের দায় শুধু নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপালেই শেষ হয় না। শিল্পের ভেতরেও স্বল্পমেয়াদি লাভকেন্দ্রিক মানসিকতা একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে শিল্প টিকিয়ে রাখার পরিকল্পনার অভাব এই দুর্বলতাকে আরো তীব্র করছে। পাশাপাশি টেক্সটাইল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে টেক্সটাইল বিষয়ে প্রকৃত জ্ঞানসম্পন্ন জনবলের ঘাটতি কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে।

সাম্প্রতিক সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে টেক্সটাইল খাতের বাস্তব চিত্র, কারণ ও উত্তরণের পথ নিয়ে মতামত দিয়েছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞ।

ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহ আলিমুজ্জামান বেলাল বলেন, টেক্সটাইল কারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে সরকার ও শিল্প- উভয় পক্ষেরই দায় রয়েছে। কাঁচামাল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না করে কর আদায়ে বেশি গুরুত্ব দেয়ায় শিল্প চাপে পড়েছে। বিদেশী সুতা আমদানির ফলে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও দেশীয় স্পিনিং মিল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি কিছু উদ্যোক্তার স্বল্পমেয়াদি লাভের প্রবণতা এবং শিল্পবান্ধব নীতির অভাব সঙ্কটকে আরো গভীর করেছে।

ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. হোসনে আরা বেগম বলেন, গার্মেন্ট ও টেক্সটাইল খাত পিছিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ গ্যাস সঙ্কট। তিনি বলেন, “দেশে গ্যাসের মজুদ কমে যাচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নেমে গেছে। এ অবস্থায় শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে বিকল্প জ্বালানি ও পানির উৎসে যেতে হবে।” তার মতে, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকায় শিল্প সম্প্রসারণ এবং নদী ও সাগরের পানির ব্যবহার বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেয়া জরুরি।

টেক্সটাইল ম্যাটেরিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. শেখ মো: মামুন কবীর বলেন, বিপুলসংখ্যক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পের জন্য একটি গুরুতর সতর্কসঙ্কেত। এর ফলে রফতানি আয় হ্রাস, বৈদেশিক মুদ্রা সঙ্কট, উৎপাদন ব্যাঘাত এবং শ্রমবাজারে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, কমপ্লায়েন্স অডিট স্থগিত, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা ও বায়ারদের আস্থার ঘাটতি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে ভ্যালু-অ্যাডেড উৎপাদন, অবকাঠামোগত সংস্কার ও নীতিগত সহায়তা জোরদার করা প্রয়োজন।

ডাইস অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দীন বলেন, ডিজিটালাইজেশন, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তখনই কার্যকর হবে, যখন প্রকৌশলীরা কোর প্রসেস ও মেশিন ভালোভাবে বুঝবেন। শুধু সফটওয়্যার নির্ভরতা সমস্যার সমাধান আনবে না। তিনি নতুন গ্র্যাজুয়েটদের মৌলিক প্রকৌশল জ্ঞান, ডেটা স্কিল, সাসটেইনেবিলিটি ও গ্রিন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর জোর দেয়ার আহ্বান জানান।

সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্যাসসঙ্কট, পানি ঘাটতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার প্রভাব একসাথে টেক্সটাইল ও গার্মেন্ট শিল্পকে গভীর চাপে ফেলেছে। এর ফলে কারখানা বন্ধ, রফতানি আয় হ্রাস এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার সময়োপযোগী নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলে, শিল্পের ভৌগোলিক পুনর্বিন্যাস ঘটালে এবং টেকসই জ্বালানি ও ভ্যালু-অ্যাডেড উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে এই খাত আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।