হজের তাৎপর্য : ড. আবদুল আলীম তালুকদার

Printed Edition

আল্লাহ তায়ালা যখন বেহেশত থেকে হজরত আদম আ: ও হাওয়া আ:-কে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন, এতে তারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে উভয়ে আরাফাত ময়দানে এসে মিলিত হন। এ ঘটনার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ হজের একটি অংশ হিসেবে মুসলিমরা আরাফাতের ময়দানে এসে উপস্থিত হয়ে মহান আল্লাহ পাকের কাছে কান্নাকাটি করে ইবাদতে মনোনিবেশ করেন

হজ বিশ্ব মুসলিমের বার্ষিক মহাসম্মেলন এবং ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম। ‘হজ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো- সংকল্প করা, কোনো স্থানে যাওয়ার ইচ্ছে করা, গমন করা, চক্রাকারে প্রদক্ষিণ করা, প্রতিজ্ঞা করা ইত্যাদি। আর ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় মহান আল্লাহ জাল্লা শানুহুর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কুরআন ও হাদিসের নিয়মানুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট পন্থায় কাবা শরিফ এবং তার আশেপাশের নির্দিষ্ট স্থানগুলোতে অবস্থান, তাওয়াফ ও জিয়ারত করাকে হজ বলা হয়। আবার কোনো কোনো ওলামায়ে কেরামের মতে, জিলহজ মাসের ৯ তারিখে ইহরাম বেঁধে আরাফাতের ময়দানে অবস্থানসহ কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থানে নির্ধারিত কয়েকটি আমল যথাযথভাবে আদায় করে কাবাগৃহ তাওয়াফ করাকে হজ বলে।

পবিত্র কুরআনুল কারিমে উল্লিখিত হয়েছে, পৃথিবীতে আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের জন্য নির্মিত প্রথম ইমারত (স্থাপনা) হচ্ছে মক্কাস্থ পবিত্র কাবাগৃহ যা ‘বায়তুল্লাহ’ বা আল্লাহর ঘর নামে অভিহিত। আল্লাহ তায়ালা হজরত ইবরাহিম আ:-কে আদেশ দেন- ‘আমার গৃহকে পবিত্র রেখো তাদের জন্য, যারা তাওয়াফ করে এবং যারা সালাতে দাঁড়ায়, রুকু করে ও সিজদা আদায় করে। আর মানুষের নিকট হজের ঘোষণা করে দাও, তারা তোমার নিকট আসবে পদব্রজে ও সর্বপ্রকার দ্রুতগামী উটের পিঠে আরোহণ করে, তারা আসবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে।’ (সূরা হজ : ২৬-২৭) এই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে হজরত ইবরাহিম আ: সর্বপ্রথম কাবাকে কেন্দ্র করে হজের প্রবর্তন করেন। তার আহ্বানে লোকেরা মক্কায় হজ সম্পাদন করার জন্য আসতে থাকে। তিনি ও পুত্র হজরত ইসমাইল আ: কাবাঘর পুনর্নির্মাণ করেন। তখন থেকে প্রতি বছর বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজীগণ কাবা শরিফে হজ নিমিত্ত সমবেত হতে থাকে।

হজরত ইবনে আব্বাস রা: বর্ণনা করেন, রাসূল সা: ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি হজ করার ইচ্ছে করে, সে যেন তাড়াতাড়ি তা আদায় করে নেয়। কারণ যেকোনো সময় সে অসুস্থ হয়ে যেতে পারে বা বাহনের ব্যবস্থাও না থাকতে পারে অথবা অন্য কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ-২৮৮৩) অন্য এক হাদিসে ইবনে আব্বাস রা: বলেন, নবী করিম সা: ইরশাদ করেছেন, ফরজ হজ আদায়ের ব্যাপারে তোমরা মোটেও বিলম্ব করো না। কারণ তোমাদের কারো জানা নেই তোমাদের পরবর্তী জীবনে কী ঘটবে। (মুসনাদে আহমাদ-২৮৬৭) শুধু তাই নয়, এক সময় বায়তুল্লাহ উঠিয়ে নেয়া হলে মানুষ হজ করতে পারবে না এই আশঙ্কার কারণেও আল্লাহর রাসূল উম্মতকে তাড়াতাড়ি হজ আদায় করার হুকুম দিয়েছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা: থেকে বর্ণিত- রাসূল সা: বলেছেন, তোমরা হজ ও ওমরার মাধ্যমে এই (বায়তুল্লাহ) গৃহের উপকার গ্রহণ করো। কেননা, তা ইতঃপূর্বে দুইবার ধ্বংস হয়েছে। তৃতীয়বারের পর উঠিয়ে নেয়া হবে। (ইবনে খুজাইমা-২৫০৬)

হজ আদায় করার শক্তি-সামর্থ্য ও অর্থ-বিত্ত থাকার পরও যে ব্যক্তি হজ আদায় করে না তার সম্পর্কে হাদিস শরিফে কঠোর হুমকি প্রদান করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রা: বলেন, যে ব্যক্তি হজ করার সামর্থ্য রাখে, তবুও হজ আদায় করে না সে ইহুদি হয়ে মৃত্যুবরণ করল কি খ্রিষ্টান হয়ে তার কোনো পরোয়া আল্লাহর নেই। তিনি আরো বলেন, আমার ইচ্ছে হয় কিছু লোককে বিভিন্ন শহরাঞ্চল ও লোকালয়ে পাঠিয়ে দিই, তারা সেখানে দেখবে, কারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ পালন করছে না। তারা তাদের ওপর কর আরোপ করবে। তারা মুসলমান নয়, তারা মুসলমান নয়।

হজ মুসলমানদের জন্য ফরজ ইবাদত যা আগেই বলা হয়েছে। ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জীবনে অন্তত একবার হজ পালন করা অবশ্য কর্তব্য, যদি তার পক্ষে সম্ভব হয়। হজ পালনের শর্ত হলো- প্রাপ্ত বয়স, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা, আর্থিক সচ্ছলতা, পথের নিরাপত্তা এবং ফিরে আসা পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের ভরণ-পোষণের নিশ্চয়তা। মহিলাদের ক্ষেত্রে স্বামী অথবা মুহরিম বা অবিবাহযোগ্য কোনো আত্মীয়কে সহযাত্রী করা আবশ্যক।

জীবদ্দশায় হজ করতে পারেনি এমন ব্যক্তি বদলি হজের ওয়াসিয়াত করতে পারে। সে মারা গেলে তার সম্পত্তি থেকে কাফন-দাফনের খরচ ও তার ঋণ থাকলে তা পরিশোধের পর যা অবশিষ্ট থাকে তার এক-তৃতীয়াংশ দ্বারা হজের ব্যয় নির্বাহ সম্ভব হলে ওয়ারিশদের ওপর তার পক্ষে হজ পালন করা ওয়াজিব হয়।

প্রকাশ থাকে যে, পবিত্র কাবাগৃহে সর্বপ্রথম হজ আদায় করেন ইসলামের প্রথম নবী প্রথম মানব হজরত আদম আ:, তারপর হজরত নূহ আ:সহ ইসলামের অন্যান্য নবী-রাসূল এ দায়িত্ব পালন করেন। হজরত ইবরাহিম আ:-এর সময় থেকে হজ ফরজ বা আবশ্যকীয় ইবাদত হিসেবে নির্ধারিত করা হয়। হজের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান হজরত ইবরাহিম আ:-এর জীবনের সাথে সম্পর্কিত। যেমন- হজরত ইবরাহিম আ: আল্লাহ পাকের নির্দেশে তার স্ত্রী বিবি হাজেরাকে নির্জন মরুভূমিতে রেখে এসেছিলেন। সেখানে, কাবা শরিফের অদূরে বিবি হাজেরা নবজাত শিশু ইসমাইল আ:-কে নিয়ে পানির অভাবে পড়েছিলেন। সাহায্যের জন্য কাউকে না পেয়ে তিনি পানির খোঁজে সাফা-মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন। এই ঘটনাকে স্মরণ করেই হজের সময় মুসলিমদের জন্য সাফা-মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সায়ি বা হাঁটা-চলার বিধান রয়েছে। এ ছাড়াও আল্লাহ তায়ালা যখন বেহেশত থেকে হজরত আদম আ: ও হাওয়া আ:-কে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন, এতে তারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে উভয়ে আরাফাত ময়দানে এসে মিলিত হন। এ ঘটনার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ হজের একটি অংশ হিসেবে মুসলিমরা আরাফাতের ময়দানে এসে উপস্থিত হয়ে মহান আল্লাহ পাকের কাছে কান্নাকাটি করে ইবাদতে মনোনিবেশ করেন।

অনুমান করা হয় যে, বাংলাদেশ তথা এই ভারতীয় উপমহাদেশে ১২০৪ সালে মুসলিম বিজয় ও ইসলাম প্রচারের পর থেকেই ধর্মপ্রাণ মুমিন-মুসল্লিগণ হজ পালন করে আসছেন। পঞ্চদশ শতকে বিশিষ্ট ওলিয়ে কামেল নূর কুতুবুল আলম বেশ কয়েকবার হজব্রত পালন করেছিলেন। বাগেরহাটের পীর খান জাহান আলী রহ.ও পবিত্র হজব্রত পালনার্থে মক্কা গমন করেন। শাহ সুজা মিয়ানমারের আরাকান হয়ে হজের সময় মক্কা নগরীতে গমন করবেন এরূপ ইচ্ছে বুকে ধারণ করে সপরিবারে ঢাকা ত্যাগ করেন। দানবীর হাজী মুহম্মদ মুহসিন ও মর্দে মুজাহিদ হাজী শরিয়তুল্লাহ মক্কায় হজ পালন করেন। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশের মুসলিমরা চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর দিয়ে ভারতের বোম্বে (মুম্বাই) হয়ে জাহাজযোগে হজ পালন করতে মক্কায় যেতেন। বর্তমানে অবশ্য বিমানযোগেই বাংলাদেশের সব হাজী হজব্রত পালন করছেন।

হজ সম্পর্কে নবী করিম সা:-এর একটি হাদিস বর্ণনা করেই আলোচনার ইতি টানব। হজরত আবু হুরায়রা রা: হতে হাদিসটি বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল সা:-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহকে সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হজ পালন করল এবং সব প্রকার অশ্লীল কথাবার্তা ও গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকল, সে ওই দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে হজ থেকে ফিরে আসবে যেদিন মায়ের গর্ভ থেকে নিষ্পাপ অবস্থায় ভূমিষ্ট হয়েছিল। (বুখারি-১৫২১)