আস্থার প্রতিফলনেই বাজেট পরবর্তী সপ্তাহ পার পুঁজিবাজারে

ডিএসইর সতর্কতাও গায়ে মাখছেন না বিনিয়োগকারীরা

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

তাৎক্ষণিক কোনো ধরনের প্রণোদনা ছাড়াও শুধু ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর ভর করে পুঁজিবাজার যে ভালো আচরণে ফিরতে পারে বাজেট পরবর্তী সপ্তাহটিতে তাই প্রমাণ করলেন বিনিয়োগকারীরা। এক প্রকার খুঁড়িয়ে চলা পুঁজিবাজার বাজেটের পর যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। আগামী দিনগুলো ভালো কাটবে এমন সম্ভাবনার ওপর ভর করে বাজারে অংশ নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। এর ফলে বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ যেমন বাড়ছে তেমনি ঘটছে সূচকের উন্নতিও, যা দেশের পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল।

গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পর পুঁজিবাজারের প্রথম কর্মদিবস ছিল ১৪ জুন। ওই দিন দেশের দুই পুঁজিবাজারেই সবগুলো সূচকের সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ উন্নতি ঘটতে দেখা যায়। একই সাথে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও ছিল চোখে পড়ার মতো। পরবর্তীতে বাজারে সাময়িক সংশোধন ঘটলেও পুরো সপ্তাহটি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা দেয় যাতে ছিল বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ মুহূর্তে পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বেশি দরকার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা যাতে প্রকৃত বিনিয়োগকারীরা তাদের আস্থার জায়গা হিসেবে বিনিয়োগে উৎসাহ পান।

বিদায়ী সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৪০ দশমিক ৯৮ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। রোববার ৫ হাজার ৫২০ দশমিক ৪০ পয়েন্ট থেকে সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার সপ্তাহান্তে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৬৬১ দশমিক ৩৮ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৭০ দশমিক ২১ ও ৩৫ দশমিক ৮২ পয়েন্ট। সপ্তাহের প্রথম দু’টি কর্মদিবসে সূচকের উন্নতির পর তৃতীয় কর্মদিবসে যথারীতি সংশোধন ঘটে বাজারে। চতুর্থ কর্মদিবসেও পুঁজিবাজার কিছুটা সংশোধনের মধ্য দিয়ে গেলেও শেষদিন ফের ঘুরে দাঁড়ায় যা বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রত্যাশিত ছিল।

গত সপ্তাহের বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, দীর্ঘ সময় ধরে পুঁজিবাজারগুলোতে হুজুগ ও গুজবের মাধ্যমে দুর্বল ও মৌলভিত্তিহীন কোম্পানিগুলোর দৌরাত্ম্য চললেও গত সপ্তাহে তার কিছুটা কমেছে।

এ সময় ভালো ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলো বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের তালিকায় জায়গা করে নিতে শুরু করেছে। ব্যাংকসহ অন্যান্য খাতের বেশ কয়েকটি ভালো কোম্পানি বাজারের লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় জায়গা করে নেয়, যা দীর্ঘ সময় ধরে ছিল অনুপস্থিত। ৪ জুন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পুনর্গঠনের পর নতুন কমিশনের চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে দেয়া বার্তায় পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ঘোষণার কারণে তা ঘটছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে তাদের মতে, এর জন্য আরো সময় দরকার হবে।

এ দিকে প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সেেচঞ্জর পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার তালিকাভুক্ত বেশ কিছু কোম্পানিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রদর্শন করা হলেও তা বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ গায়ে মাখছেন না। বাজারের অপেক্ষাকৃত কম মূল্যস্তর ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল কোম্পানিগুলো নিয়ে এখনো বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ কারসাজিতে লিপ্ত রয়েছেন। এ ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী বিনিয়োগকারীদের জন্য বাজারে তালিকাভুক্ত ৬২টি কোম্পানি সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। এর মধ্যে ৩২টি কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে এবং আরো ৩০টি কোম্পানি আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ডিএসই সম্প্রতি তাদের ওয়েবসাইটে পৃথক দু’টি তালিকা প্রকাশ করেছে।

ডিএসই সূত্র জানিয়েছে, আর্থিকভাবে দুর্বল এবং কার্যক্রম বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বিনিয়োগ করে যাতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে লক্ষ্যেই এই সতর্কতামূলক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মূলত এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করে বিনিয়োগকারীদের সচেতন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে বন্ধ ও দুর্বল কোম্পানিগুলোর কিছু শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে। এরই মধ্যে শ্যামপুর সুগার মিলস এবং সোনারগাঁও টেক্সটাইলসের শেয়ার লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানিগুলোর বিষয়ে প্রকাশ্যে সতর্কবার্তা দেয়া হলো।

ডিএসইর প্রকাশিত তালিকায় বন্ধ কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যাপোলো ইস্পাত, আরামিট সিমেন্ট, আজিজ পাইপস, বারাকা পাওয়ার, এমারেল্ড অয়েল, খুলনা পাওয়ার, মেঘনা পিইটি, নিউলাইন ক্লথিংস, নর্দার্ন জুট, প্রাইম টেক্সটাইলস, রহিমা ফুড, আরএসআরএম স্টিল, শ্যামপুর সুগার মিলস, উসমানিয়া প্লাস শিট ফ্যাক্টরিসহ মোট ৩২টি প্রতিষ্ঠান।

তবে বিস্ময়করভাবে সতর্কসঙ্কেত জারির পরও এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর শেয়ারদর বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ লেনদেনে ৩২টি বন্ধ কোম্পানির মধ্যে ২২টির শেয়ারদর বেড়েছে, ৬টির কমেছে এবং ৪টির দর অপরিবর্তিত ছিল। হামিদ ফেব্রিকস, প্রাইম টেক্সটাইলস ও নিউলাইন ক্লথিংসের শেয়ারদর সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এ ছাড়া এখনো ডিএসইর লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছে ডিএসইর ঝুঁকিপুর্ণ কোম্পানির তালিকা বেশ কিছু কোম্পানি।

নতুন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর বাজার কারসাজি দমনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। বিএসইসির নির্দেশনার পর ডিএসই দুর্বল কোম্পানিগুলোর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। প্রয়োজনে লেনদেন স্থগিত করে মূল্যবৃদ্ধির কারণ তদন্ত করারও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। অন্য দিকে নিরীক্ষকদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ৪২টি কোম্পানিকে ব্যবসা পরিচালনায় অনিশ্চয়তার ঝুঁকিতে থাকা প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি কোম্পানি বন্ধ প্রতিষ্ঠানের তালিকাতেও রয়েছে। ফলে কার্যত ৩০টি সক্রিয় কোম্পানিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ডিএসই।

ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় থাকা কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে অলটেক্স, আনলিমা ইয়ার্ন, বিডি সার্ভিসেস, বিডিথাই ফুড, বিআইএফসি, সেন্ট্রাল ফার্মা, ঢাকা ডায়িং, ডরিন পাওয়ার, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, ফার্স্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, মেঘনা সিমেন্ট, প্রাইম ফাইন্যান্স, সানলাইফ ইনস্যুরেন্স, তাল্লু স্পিনিং এবং ঝিল বাংলা সুগার মিলস।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ডিএসইর এই উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে। বিশেষ করে মৌলভিত্তি দুর্বল বা দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের আগে বিনিয়োগকারীদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।