সাংবাদিক এ টি এম তুরাব হত্যা মামলা তদন্তেই আটকে আছে

মামলার মাত্র দু’জন আসামি গ্রেফতার হলেও পুলিশের তৎকালীন ডিসি আজবাহার আলী শেখ, কোতোয়ালি থানার তৎকালীন ওসি মঈন উদ্দিন, এসএমপির এসি মিজানুর রহমানসহ বাকি সব আসামিই এখনো গ্রেফতার হয়নি।

আবদুল কাদের তাপাদার, সিলেট ব্যুরো
Printed Edition
সাংবাদিক এ টি এম তুরাব হত্যার দিন তাকে লক্ষ করে গুলি ছোড়ে পুলিশ (ইনসেটে) এ টি এম তুরাব
সাংবাদিক এ টি এম তুরাব হত্যার দিন তাকে লক্ষ করে গুলি ছোড়ে পুলিশ (ইনসেটে) এ টি এম তুরাব |ফাইল ফটো
  • পুলিশের একজন কর্মকর্তাসহ দু’জন গ্রেফতার হলেও মামলার অধিকাংশ আসামি পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতারা বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার গুঞ্জন।
  • আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলাটি এখন তদন্তাধীন। আগস্টের শেষ দিকে তদন্ত রিপোর্ট জমা হতে পারে
  • মরার আগে আমার তুরাবের হত্যাকারীদের বিচার দেখে যেতে পারব কি- প্রশ্ন হতভাগা বয়োবৃদ্ধ মায়ের

চব্বিশের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী উত্তাল আন্দোলনে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সিলেটে পুলিশের টার্গেট কিলিংয়ের শিকার দৈনিক নয়া দিগন্ত ও দৈনিক জালালাবাদের রিপোর্টার এ টি এম তুরাব হত্যা মামলার তদন্ত এক বছরেও শেষ হয়নি। মামলার মাত্র দু’জন আসামি গ্রেফতার হলেও অন্যতম প্রধান আসামি পুলিশের তৎকালীন ডিসি আজবাহার আলী শেখ, কোতোয়ালি থানার তৎকালীন ওসি মঈন উদ্দিন,এসএমপির এসি মিজানুর রহমানসহ বাকি সব আসামিই এখনো গ্রেফতার হয়নি। ডিসি আজবাহার আলী শেখ সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তাকে এখনো গ্রেফতার না করায় জনমনে ক্ষোভ দানা বাঁধছে। আর ওসি মঈন উদ্দিন সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেফতার হলেও মাধবপুরের ওসি আবদুল্লাহ আল মামুন হবিগঞ্জের এসপির নির্দেশে ছেড়ে দেন।

তিনি এখন পলাতক হয়ে দেশে না বিদেশে আছেন তা জানা যায়নি।

সিলেট মেট্রোপলিটান পুলিশ এসএমপি থেকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআইয়ের হাত বদল হয়ে মামলাটি এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইসিটিতে তদন্তাধীন। এ টি এম তুরাব ১৯ জুলাই পুলিশের গুলিতে নিহত হন। ২৪ জুলাই কোতোয়ালি থানায় মামলা করতে গেলে তৎকালীন ওসি মঈন উদ্দিন মামলা এফআইআর করেননি। তিনি এসময় তুরাবের সহকর্মী সাংবাদিকদের সাথে দুর্ব্যবহার করেন। আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী ১৯ আগস্ট সিলেটের আদালতে তুরাব হত্যা মামলা রুজু করা হয়। আদালতের নির্দেশে কোতোয়ালি থানায় মামলা এফআইআরভুক্ত করা হয়। কিন্তু সেখানে তেমন কোনো তদন্ত এগোয়নি। পরবর্তীতে মামলাটি সিলেট পিবিআইতে স্থানান্তর করা হয়। পিবিআইতে পুলিশ পরিদর্শক মুহাম্মদ মুরসালিন মামলার তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়ার কয়দিন আগে এই চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্তে নামে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-আইসিটি। আইসিটির প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহর নেতৃত্বে মোহাম্মদ শাহ আলমসহ আইসিটি তদন্ত টিম সিলেটে দুই দফায় তদন্ত কাজ চালান। এ সময় তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে কথা বলেন। দুই দফা তদন্তকালে তারা মামলার কয়েকজন সাক্ষীর সাথেও বিস্তারিত কথা বলেন।

মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মুরসালিন নয়া দিগন্তকে জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ টি এম তুরাব হত্যা মামলার জোর তদন্ত চলছে। এ মাসেই তদন্ত শেষ করে তদন্ত টিম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রিপোর্ট জমা দিতে পারেন।

তিনি জানান, আমাকে গত সোমবার ঢাকায় ডেকে নেয়া হয়েছিল। আমার কাছ থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নথিপত্র বুঝে নিয়েছেন। আগামী ২০ আগস্ট কারাগারে থাকা আসামি পুলিশের তৎকালীন এডিসি সাদেক কাওছার দস্তগীর ও পুলিশ কনস্টেবল উজ্জ্বলকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হবে। তাদের হাজিরার পরই তদন্ত রিপোর্ট ট্রাইব্যুনালে জমা দেয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে আমাকে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

এ টি এম তুরাবের মামলার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহ আলম নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে জানান, এ টি এম তুরাবের মামলার জোরদার তদন্ত চলছে। আগামী ২০ আগস্ট মামলার একটি ধার্য তারিখ রয়েছে। সেখানে গ্রেফতারকৃত পুলিশ কর্মকর্তা বরখাস্তকৃত আবু সাদেক দস্তগীর হাজির হবেন। আমরা এই তারিখ এগিয়ে আনার জন্য আবেদন করেছি। তারিখ এগিয়ে এলে আগস্টের প্রথমার্ধে আমরা রিপোর্ট জমা দিতে পারব ইনশা আল্লাহ।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ নয়া দিগন্তকে জানান, এক মাসের মধ্যে এ টি এম তুরাব হত্যা মামলার তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়ার প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু মনে হচ্ছে, এই মামলায় আরো কিছু অ্যাভিডেন্স দরকার। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় পর্যাপ্ত ও সঠিক তথ্য প্রমাণ থাকতে হয়। তাহলে মামলা এগিয়ে নেয়া সহজ হয়।

অনুদান প্রদান আর তুরাব বন্দনায় রাষ্ট্র ও প্রশাসনের বক্তব্য, ভাষণ দৃষ্টি কাড়লেও বিচার নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই!

তুরাবের পরিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বসুন্ধরা গ্রুপের বড় অঙ্কের অনুদানসহ সরকারি-বেসরকারি বিপুল অঙ্কের অনুদান পেয়েছেন। প্রতিনিয়ত সভা-সমাবেশে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের তুরাব বন্দনা, তুরাবের রক্তে জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সফলতার কথা আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে পড়লেও হত্যার বিচার নিয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। আসামি পুলিশ কর্মকর্তা জনতার হাতে আটক হলেও পুলিশ তাকে ছেড়ে দিয়েছে। এক বছরেও মামলার এখনো তদন্তই শেষ হয়নি। বিচার কবে শুরু হবে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বয়োবৃদ্ধ মায়ের কান্নার আওয়াজ আর তরুণী স্ত্রীর আহাজারিতে এখনো শোকাভিভূত পরিবার। সন্তানদের মধ্যে সবার ছোট ছেলে হিসেবে মায়ের বেশি আদর আহলাদের ছিলেন এ টি এম তুরাব। পিতৃহারা তুরাবকে তার বৃদ্ধ মা কাছে কাছে রাখতেন। নিজেদের বাড়ি বিয়ানীবাজার শহর থেকে সিলেট নগরী খুব দূরের না হলেও তুরাবের কারণে মা মমতাজ বেগমও চলে আসেন সিলেটে। পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার মাত্র দুই মাস আগে লন্ডন প্রবাসী তানিয়া ইসলামের সাথে যুগলবন্দী হন তুরাব। মৃত্যুর সময় এই দম্পতির হাতের মেহেদীও শুকায়নি। এখনো গভীর রাতে ‘তুরাব, তুরাব’ বলে কান্না আর চিৎকারে ঘুম ভেঙে যায় মায়ের। দিবানিশি বড় ছেলে মামলার বাদি জাবুরের কাছে জানতে চান, আসামিরা কেন গ্রেফতার হয় না। তিনি বেঁচে থাকতে তুরাবের বিচার দেখে যেতে পারবেন কি? এসব প্রশ্নে ক্লান্ত জাবুর মায়ের কথার কোনো জবাব দিতে পারেন না।

মামলার বাদি এ টি এম তুরাবের বড় ভাই আবুল আহসান মোহাম্মদ আজরফ (জাবুর) নয়া দিগন্তকে তার হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, এসএমপি থেকে পিবিআই, সেখান থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এখন তদন্তাধীন। এক বছরে তেমন কিছুই তো অগ্রগতি নেই ।

ডেটলাইন ১৯ জুলাই ২০২৪ : সেদিন কী ঘটেছিল

১৯ জুলাই শুক্রবার জুমুয়ার নামাজ শেষ হতেই সিলেটে মিছিল বের করে বিএনপি ও সমমনা কয়েকটি দল। মিছিলে কোনো উত্তেজনা নেই। পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক। নিত্যদিনের মতো সাংবাদিকরা সেখানে উপস্থিত হন। নগরের প্রাণকেন্দ্র বন্দরবাজার এলাকায় অতিক্রম করছিল বিশাল মিছিল, পাশেই পুলিশের সশস্ত্র অবস্থান। হঠাৎই অতি উৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তা এসএমপির তৎকালীন এডিসি সাদেক কাউসার দস্তগীর ও ডিসি আজহাবার আলী শেখ এর মারমুখী আচরণে বদলে যায় পরিস্থিতি। উতপ্ত হয়ে উঠে সিলেটের বন্দরবাজার কোর্ট পয়েন্ট এলাকা। তখন পুলিশের কিলিং মিশনের টার্গেটে পড়ে যান সাংবাদিক এ টি এম তুরাব। দৈনিক নয়া দিগন্ত ও দৈনিক জালালাবাদের মাঠ কাঁপানো রিপোর্টার এ টি এম তুরাব মিছিলের সময় সড়কের রেলিংয়ে এক হাত দিয়ে ধরে অন্য হাতের মোবাইল ক্যামেরায় শরীরে প্রেস লেখা জ্যাকেট (ভেস্ট) হেলমেট পড়ে বিএনপির মিছিল ও পুলিশের অবস্থানের মাঝখানে ভিডিও ধারণ করছিলেন। এমন সময় হঠাৎই বিগড়ে যান ভয়ঙ্কর এডিসি দস্তগীর। একজন কনস্টেবলের হাত থেকে বন্দুক নিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি ছোঁড়া শুরু করেন তিনি। তার গুলির নিশানা সাংবাদিক তুরাব। এ সময় সেখানে ছিলেন এসএমপির আরেক ভয়ঙ্কর পুলিশ কর্মকর্তা ডিসি আজবাহার আলী শেখ। দস্তগীরের দেখাদেখি উপস্থিত সব পুলিশ সদস্য বৃষ্টির মতো গুলি ছোড়েন। তাদের গুলিতে গুরুতর জখম হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন সাংবাদিক এ টি এম তুরাব। কয়েকজন পথচারী আশঙ্কাজনক অবস্থায় তুরাবকে রিকশায় তুলে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। এ সময় খবর পান কয়েকজন সহকর্মী। নিত্যদিনের সহকর্মী দৈনিক জালালাবাদের ফটোগ্রাফার হুমায়ুন কবির লিটনসহ অন্যান্য সহকর্মীরা ছুটে যান ওসমানী হাসপাতালে। সেখানে তার শারীরিক অবনতি হলে তাকে জরুরি ভিত্তিতে সোবহানীঘাট ইবনে সিনা হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে আইসিইউতে থাকাবস্থায় সাংবাদিক তুরাব সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তুরাবের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ও সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা: শামসুল ইসলাম জানান, তুরাবের শরীরে ৯৮টি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। গুলিতে তার লিভার ও ফুসফুস মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হয়। মাথায়ও মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন ছিল। তুরাব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সেদিনে সিলেটসহ পুরো বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে উঠে। অনেক জায়গায় পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়, আহত হয় অনেকেই।

কোর্ট পয়েন্ট এখন শহীদ সাংবাদিক তুরাব চত্বর

তুরাব হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল সিলেট নগরীর কোর্ট পয়েন্ট এলাকাকে ‘শহীদ সাংবাদিক এ টি এম তুরাব চত্বর’ ঘোষণা করা হয়েছে। গত ১৬ আগস্ট বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সিলেটের প্রতিনিধিত্বশীল সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে ব্যানার টানিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তুরাব চত্বর নামকরণ করা হয়।

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে শহীদ তুরাব স্ট্যান্ড

সাংবাদিক এ টি এম তুরাবের নামে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে একটি গ্যালারির নামকরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচের আগে সেই গ্যালারিতে ‘শহীদ তুরাব স্ট্যান্ড’ নামফলক স্থাপন করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। গত ১৯ এপ্রিল শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে স্টেডিয়ামের পশ্চিম গ্যালারিতে তুরাবের নাম সংবলিত সাইনবোর্ড টাঙানো হয়।