হাবিবুল বাশার
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলছে। ২০২৬ সালেও সঙ্কটের এই ধারাবাহিকতা আরো ঘনীভূত হয়েছে। পুষ্টিবিদদের মতে, খাদ্যের তালিকা থেকে প্রোটিন বাদ পড়ায় বস্তি এলাকার শিশু ও গর্ভবতী মায়েরা চরম অপুষ্টির শিকার হচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করছে। অন্য দিকে, জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে না পেরে অনেক দরিদ্র পরিবার সন্তানদের স্কুল থেকে ছাড়িয়ে কাজে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে, ফলে আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে শিশুশ্রম।
বৈশ্বিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চাপ
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতার মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে তেলের সরবরাহ বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম হঠাৎ লাফিয়ে বাড়তে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মানেই পরিবহন ব্যয় ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির নতুন এক ধাক্কা।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতি কেবল অর্থনৈতিক সঙ্কট নয়, বরং সাধারণ মানুষের সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার অধিকারের ওপর এক বড় চ্যালেঞ্জ। রাজধানীর একটি বাজারে ক্ষোভ ও অসহায়ত্বের কথা জানান ফার্নিচার শ্রমিক রিয়াজ।
তিনি বলেন, ‘গত মাসে যে গ্যাস সিলিন্ডার ১৬৫০ টাকায় কিনেছিলাম, তা এখন ১৯৫০ টাকা। করলা, বেগুন বা টমেটো সবজিভেদে কেজিপ্রতি ২০-৩০ টাকা বাড়তি দিতে হচ্ছে। মাছের বাজারে গিয়ে ৭০-৮০ টাকা বেশি দিয়ে পাঙ্গাস কিনেছি। আয়ের তুলনায় ব্যয়ের এই অসম দৌড়ে সন্তানদের পড়াশোনা চালানো এখন দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
একই চিত্র দেখা গেল অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেনের চোখেও। হাতে এক আঁটি পুঁইশাক নিয়ে এক পাও চিংড়ির জন্য ১০০০ টাকা কেজি দরে ২৫০ গ্রাম মাছ কিনলেন তিনি। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘১৫ টাকার ওষুধ এখন ২৫ টাকা। আগে যে টাকায় দুজনের সংসার স্বচ্ছন্দে চলত, এখন সেই টাকায় একা চলাই কঠিন।’
ঋণের দুষ্টচক্রে জীবন যেখানে থমকে আছে
দ্রব্যমূল্যের এই লাগামহীন দৌড়ে সবচেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন নিম্ন আয়ের মানুষ ও বস্তিবাসীরা। একজন দিনমজুর বা রিকশাচালকের দৈনিক গড় আয় যেখানে ৫০০-৭০০ টাকা, সেখানে আয়ের সিংহভাগই চলে যাচ্ছে চাল আর ভোজ্যতেলের পেছনে। ক্রয়ক্ষমতা এতটাই কমেছে যে, নিম্নবিত্তরা এখন কেজিতে পণ্য না কিনে ‘গ্রাম’ বা ‘হালি’ হিসেবে পণ্য কিনছেন। ঘরভাড়া ও খাবারের খরচ মেটাতে গৃহপরিচারিকা ও শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের ঠেলে দিচ্ছে এক অন্তহীন ঋণের দুষ্টচক্রে।
রাজধানীর কদমতলীর বউবাজার এলাকার অটোচালক মঞ্জুর জীবনযুদ্ধ আরো করুণ। প্রতিদিনের ১০০০ টাকা আয়ের মধ্যে ৪০০ টাকাই চলে যায় গ্যারেজ মালিকের পকেটে। হাতে থাকা ৫০০-৬০০ টাকা দিয়ে স্ত্রী, সন্তান ও বৃদ্ধা মায়ের ভরণপোষণ করা যেন অসাধ্য সাধন।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে মঞ্জু বলেন, “এক কেজি চাল ৬০ টাকা, ডিমের হালি ৪০ আর গরুর মাংস ৮০০ টাকা। বছরে চারবারের বেশি গরুর গোশত আমাদের ভাগ্যে জোটে না। ঢাকা শহরে টিকে থাকা এখন অসম্ভব, আবার গ্রামে ফিরে যাওয়ারও কোনো পথ নেই।”
তবে আশার কথা শোনালেন সবজি বিক্রেতা সুমন। তার মতে, বৈশাখ মাসের কারণে সবজির সরবরাহ কিছুটা কম ও দাম চড়া। মৌসুম পরিবর্তনের সাথে সাথে কিছুদিন পর সবজির দাম কিছুটা কমতে পারে বলে তিনি ধারণা করছেন। তবে আলুর দামটা একটু কম। সেটিই তার জন্য ভরসা।



