ফ্রান্স থেকে প্রতিনিধি
অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে আরো কঠোর অবস্থান গ্রহণের লক্ষ্যে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার অনুমোদন করেছে। নতুন এই আইনের মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য রাষ্ট্রগুলো চাইলে ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলোতে বিশেষ প্রত্যাবাসন কেন্দ্র বা ‘রিটার্ন হাব’ স্থাপন করতে পারবে। এসব কেন্দ্রে আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়া এবং নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় থাকা অভিবাসীদের রাখা হবে।
ফরাসি গণমাধ্যম এএফপি ও ল্য মোঁদের সূত্র মতে, বুধবার (১৭ জুন) স্ট্রাসবুর্গে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় পার্লামেন্টের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে আইনটি ৪১৮ ভোটে পাস হয়। বিপক্ষে ভোট দেন ২১৮ সদস্য এবং ৩০ সদস্য ভোটদানে বিরত থাকেন। ভোটাভুটির সময় বামপন্থী সদস্যদের তীব্র প্রতিবাদ দেখা যায়। তাদের অভিযোগ, এই আইন ইউরোপের ডানপন্থী ও কট্টর-ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির অভিবাসনবিরোধী অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করবে এবং মানবাধিকার প্রশ্নে উদ্বেগ তৈরি করবে।
নতুন আইনটি ২০২৪ সালে গৃহীত ‘মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম প্যাক্ট’-এর পরিপূরক হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের মতে, আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরও বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি ইউরোপে থেকে যান, কারণ তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া প্রায়ই দীর্ঘ ও জটিল হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্যই প্রত্যাবাসন ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর ও দ্রুত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
আইনের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো ইউরোপের বাইরে ‘রিটার্ন হাব’ স্থাপনের সুযোগ। এর মাধ্যমে কোনো সদস্য রাষ্ট্র তৃতীয় কোনো দেশের সাথে চুক্তি করে সেখানে বিশেষ কেন্দ্র স্থাপন করতে পারবে। যেসব ব্যক্তির আশ্রয়ের আবেদন চূড়ান্তভাবে বাতিল হয়েছে এবং যাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে, তাদের এসব কেন্দ্রে স্থানান্তর করা যাবে। সমর্থকদের মতে, এই ব্যবস্থা অবৈধ অভিবাসন কমাতে এবং প্রত্যাবাসন কার্যক্রমকে আরো কার্যকর করতে সহায়তা করবে।
তবে মানবাধিকার সংগঠন ও সমালোচকদের আশঙ্কা, এসব কেন্দ্র অভিবাসীদের অধিকার ও নিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুকি তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে পরিচালিত কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষা, বিচারিক নজরদারি এবং মানবিক মানদণ্ড নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও শরণার্থী সুরক্ষার নীতিমালা নিয়ে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হতে পারে।
ফ্রান্স সরকার এই উদ্যোগের অন্যতম সমর্থক ছিল। দেশটির ইউরোপবিষয়ক মন্ত্রী বেনজাম্যাঁ আদাদ পার্লামেন্টে আইনটি পাস হওয়ার পর বলেন, এটি ইউরোপের সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার করা এবং অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তিনি মনে করেন, নতুন আইন ইউরোপকে অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ দেবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিবাসন প্রশ্নটি ইউরোপের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত অভিবাসীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বহু দেশে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের দাবিতে রাজনৈতিক চাপ বেড়েছে। এরই প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সীমান্ত সুরক্ষা, আশ্রয় প্রক্রিয়া এবং প্রত্যাবাসন নীতিতে ধারাবাহিকভাবে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় পার্লামেন্টে পাস হওয়া এই নতুন আইন অভিবাসন নীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। সমর্থকরা একে সীমান্ত নিরাপত্তা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। অন্য দিকে সমালোচকদের মতে, এটি ইউরোপের দীর্ঘদিনের মানবিক ও উদার অভিবাসন নীতির সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে। ফলে আইনটি বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপ আগামী দিনে ইউরোপজুড়ে রাজনৈতিক ও মানবাধিকার বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।



