নিজস্ব প্রতিবেদক
২০১৩ সালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে চালানো অভিযানের তদন্ত প্রতিবেদন আগামী ৭ জুনের মধ্যে জমা দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম।
গতকাল মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, এই মামলার তদন্ত কাজ ইতোমধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে চট্টগ্রামের কিছু অংশে শেষ পর্যায়ের কাজ চলছে। প্রসিকিউশন এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৫৮ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এই মামলার প্রধান আসামি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
আমিনুল ইসলাম বলেন, তদন্তে দেখা গেছে এই অভিযানটি ছিল একটি ‘পরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল আক্রমণ’, যার মূল রূপকার ছিলেন তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা।
তদন্ত সংস্থা এখন পর্যন্ত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা মিলিয়ে মোট ৫৮ জন নিহতের পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে, যার মধ্যে শাপলা চত্বরে ও ঢাকার অভ্যন্তরে ৩২ জন, নারায়ণগঞ্জে ২০ জন, চট্টগ্রামে পাঁচজন এবং কুমিল্লায় একজন নিহত হন। রাজনৈতিক অঙ্গনে নিহতের সংখ্যা নিয়ে নানা দাবি থাকলেও প্রসিকিউশন জানিয়েছে যে, নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরই এই সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই মামলায় আসামির সংখ্যা অন্তত ৩০ জন হবে উল্লেখ করে চিফ প্রসিকিউটর জানান যে, তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। বিশেষ করে সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানসহ আরো অনেক বাহিনী প্রধান ও পুলিশ কর্মকর্তাদের নাম তদন্তে উঠে এসেছে, যাদের মধ্যে ছয়জন ইতোমধ্যে গ্রেফতার রয়েছেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ৫ মে ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে হেফাজতের অবস্থান কর্মসূচি ছিল। পরে তারা শাপলা চত্বরে সমাবেশের অনুমতি পায়। কিন্তু তারা যখন গুলিস্তানে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে আসে, তখন হামলা ও নিহতের ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, সব উপেক্ষা করে তারা সন্ধ্যায় শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয়। ২টা ৩০ মিনিটের (মধ্যরাত) আগেই প্রায় ১৮ থেকে ২০ জন হতাহত হন। এরপর মধ্যরাতে ওই সমাবেশের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হলে আরো হতাহতের ঘটনা ঘটে। যাকে তিনি ‘টার্গেটেড কিলিং’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তার মতে, তৎকালীন সরকারের উদ্দেশ্য ছিল এই সংগঠনটিকে সমূলে নির্মূল করা। ওই সময়ের হত্যাকাণ্ডের পর হেফাজতে ইসলামের সাথে তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক সমঝোতা কিংবা কওমি জননী উপাধি দেয়ার মতো বিষয়গুলো এই বিচারে কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে তিনি স্পষ্ট করেন। তিনি জানান, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বিচারিক প্রক্রিয়া দু’টি ভিন্ন বিষয় এবং ট্রাইব্যুনাল শুধু সংঘটিত অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করবে। আগামী ৭ জুনের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল এবং নিয়মিত বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অধিকারের চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন
২০১৩ সালের ৫ মে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হতাহতদের নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে অন্তত ৬১ জন নিহতের তথ্য জানিয়েছিল অধিকার। প্রতিবেদনে ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’ নিয়ে চালানো হত্যাযজ্ঞটি তৎকালীন সরকারের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়। দোষীদের শাস্তিসহ ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানায় অধিকার।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, তৎকালীন হাসিনা সরকারের নির্দেশে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি যৌথভাবে এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল। তাদের সুপারিশে এই ঘটনার সঠিক তদন্ত, জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং এই ঘটনায় দায়ের করা মিথ্যা মামলাগুলো প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছিল। চাঞ্চল্যকর ওই প্রতিবেদনে আহত ও নিহতদের তালিকার পাশাপাশি ওই রাতে কিভাবে গুলি চালানো হয়েছে, তার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছিল।
অধিকারের সরেজমিন প্রতিবেদনের পর বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালের ১০ আগস্ট রাতে ‘অধিকার’ সম্পাদক আদিলুর রহমান খানকে তার বাসার সামনে থেকে তুলে নেয় পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। তাকে সারা রাত গুম করে রাখা হয় এবং পরদিন আদালতে তোলা হয়। পরে ৫৪ ধারায় তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে নেয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে আদিলুর রহমান খান এবং অধিকারের পরিচালক এ এস এম নাসির উদ্দিন এলানের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০০৯)-এর আওতায় মামলা দেয়া হয়। এ মামলায় তারা যথাক্রমে ৬২ দিন এবং ২৫ দিন কারাগারে ছিলেন।
এরপর এ সংক্রান্ত মামলায় ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক জুলফিকার হায়াৎ পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই আদিলুর রহমান খান এবং এ এস এম নাসির উদ্দিন এলানকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেন।
সমবায় উপদেষ্টার উদ্যোগে নিহতদের ক্ষতিপূরণ
অন্তর্বর্তী সরকারের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার উদ্যোগে গত বছর ১৮ অক্টোবর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শাপলা চত্বরের শহীদ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আর্থিক সহায়তার চেক বিতরণ করা হয়।
শাপলা চত্বর হত্যাযজ্ঞের শিকার ৫৮ পরিবার এবং ২০২১ সালের মার্চে হত্যাকাণ্ডে নিহত ১৯টি পরিবারের সদস্যদের প্রত্যেককে পরিবারপ্রতি ১০ লাখ টাকা করে মোট সাত কোটি ৭০ লাখ টাকার চেক দেয়া হয়।
হেফাজতের তৎকালীন ১৩ দাবি
হেফাজতে ইসলাম তাদের ১৩ দাবি পূরণের দাবিতে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ ডেকেছিল। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে তাদের ১৩ দাবির মধ্যে ছিল সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন এবং কুরআন-সুন্নাহবিরোধী সব আইন বাতিল করা; আল্লাহ, রাসূল সা: ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস; কথিত শাহবাগী আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী স্বঘোষিত নাস্তিক-মুরতাদ এবং প্রিয় নবীর সা: শানে জঘন্য কুৎসা রটনাকারী ব্লগার ও ইসলামবিদ্বেষীদের সব অপপ্রচার বন্ধসহ কঠোর শাস্তিদানের ব্যবস্থা করা; সরকারিভাবে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা এবং তাদের প্রচারণা ও ষড়যন্ত্রমূলক সব অপতৎপরতা বন্ধ করা; মসজিদের নগর ঢাকাকে মূর্তির নগরে রূপান্তর এবং দেশব্যাপী রাস্তার মোড়ে ও কলেজ-ভার্সিটিতে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন বন্ধ করা; জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ দেশের সব মসজিদে মুসল্লিদের নির্বিঘেœ নামাজ আদায়ে বাধা-বিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং ওয়াজ-নসিহত ও ধর্মীয় কার্যকলাপে বাধাদান বন্ধ করা।
গণহত্যার বিচার নিশ্চিত দাবি হেফাজতের
এ দিকে শাপলা চত্বরে সংঘটিত গণহত্যার বিচার নিশ্চিতের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে দাবি জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব আল্লামা সাজেদুর রহমান।
হেফাজত নেতারা বিচার নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতের লাখো মানুষের জমায়েতের ওপর ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পরিকল্পিত নৃশংস গণহত্যায় অগণিত ধর্মপ্রাণ মানুষ শহীদ হন। হাজার হাজার আলেম, হাফেজ ও নবীপ্রেমিক জনতা আহত এবং পঙ্গুত্ববরণ করেন। আমরা ৫ মের মহান শহীদদের স্মরণে সারা দেশে দোয়া ও আলোচনা সভা আয়োজন করার জন্য হেফাজতের নেতাকর্মীসহ সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
হেফাজত নেতারা আরো বলেন, ৫ মের গণহত্যার দায়ে পতিত ফ্যাসিস্ট হাসিনাসহ ৫৪ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে করা মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের জোর দাবি, দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে শাপলার খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করুন।
তারা দুঃখের সাথে বলেন, ২০১৩ সালে ৫ মের গণহত্যার প্রতিবাদে সবাই মাঠে নামলে পরবর্তী সময়ে চব্বিশের জুলাই ম্যাসাকার দেখতে হতো না। তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা, ইসলামবিদ্বেষী সেক্যুলারদের উসকানি ও সুশীল সমাজের বড় অংশের নীরবতার মধ্য দিয়েই ফ্যাসিবাদের উত্থান হয়েছিল।
হেফাজত নেতারা আরো বলেন, ২০১৩ সালে ইসলামবিদ্বেষী ও আধিপত্যবাদীদের প্রজেক্ট গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে শাপলার চেতনা রুখে না দাঁড়ালে অচিরেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব লুণ্ঠিত হতো। তারা বলেন, শাপলার রক্তাক্ত চেতনা জাগ্রত রাখতে হবে। এ ছাড়া বর্তমান সরকার প্রত্যেক নাগরিকের মানবিক মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষায় ব্যর্থ হলে জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করবে- এটি সরকারকে মাথায় রাখতে হবে।



