নিজস্ব প্রতিবেদক
পবিত্র ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটির পর প্রথম কার্যদিবসেই দেশের পুঁজিবাজারে বড় ধরনের দরপতন দেখা গেছে। প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) এ সূচকের উল্লেখযোগ্য পতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। যদিও দুই বাজারেই লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে, তবুও বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ারদর কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা নেমে এসেছে।
বাজার বিশ্লেষনে দেখা যায়, ঈদের আগে টানা কয়েক কার্যদিবস সূচকের কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা আশাবাদী ছিলেন। অনেকেই মনে করেছিলেন, ঈদের পর বাজারে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো চিত্র দেখা গেছে। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসেই ব্যাপক বিক্রির চাপে সূচক বড় ধরনের পতনের মুখে পড়ে।
এদিকে গতকাল দিনের শুরু থেকেই ডিএসইতে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমার প্রবণতা দেখা যায়। লেনদেনের শুরুতেই সূচক ঋণাত্মক অবস্থানে চলে যায় এবং পুরো লেনদেন জুড়েই সেই নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত থাকে। যদিও মাঝপথে কিছু মিউচ্যুয়াল ফান্ডে ক্রয়চাপ তৈরি হয়, তবুও তা সামগ্রিক বাজারকে ইতিবাচক ধারায় ফেরাতে পারেনি।
লেনদেন শেষে দেখা যায়, ডিএসইতে মোট ৩৯১টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিট লেনদেনে অংশ নেয়। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ১২১টির, কমেছে ২৪৩টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২৭টির। অর্থাৎ বাজারে স্পষ্টভাবে বিক্রেতার আধিক্য ছিল, যা সূচকের বড় পতনের অন্যতম কারণ। বিভিন্ন শ্রেণীর কোম্পানির মধ্যে ভালো মৌল ভিত্তির কোম্পানিও দরপতন থেকে রেহাই পায়নি। ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দেয়া ৬৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বাড়লেও ১২২টির দাম কমেছে। একইভাবে মাঝারি মানের কোম্পানিগুলোর মধ্যেও পতনের প্রাধান্য দেখা গেছে। এমনকি ‘জেড’ ক্যাটাগরির বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ারদরও কমেছে।
তবে ব্যতিক্রম ছিল মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাত। এদিন তালিকাভুক্ত ৩৪টি মিউচ্যুয়াল ফান্ডের সবগুলোরই ইউনিটদর বেড়েছে। অনেক ফান্ডে ক্রেতার চাপ এতটাই বেশি ছিল যে বিক্রেতা সঙ্কটে ২৬টি প্রতিষ্ঠান ‘হল্টেড’ অবস্থায় চলে যায়। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সর্বোচ্চ দর বৃদ্ধি হওয়ায় ওইসব প্রতিষ্ঠানের লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করতে হয়।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে অবমূল্যায়িত অবস্থায় থাকা মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ার ফলেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে এটি সামগ্রিক বাজারের দুর্বলতা ঢাকতে পারেনি।
সূচকের হিসাবে দেখা যায়, ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় প্রায় ৬৯ পয়েন্ট কমে পাঁচ হাজার ২৮৫ পয়েন্টে নেমে এসেছে। ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৭ পয়েন্ট কমে এক হাজার ৭২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ডিএসই-৩০ সূচক ৩৯ পয়েন্ট কমে দুই হাজার ১১ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
সূচকের পতন হলেও ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে। এদিন মোট লেনদেন হয়েছে ৪৯২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, যা আগের কার্যদিবসের ৪৬০ কোটি ৩০ লাখ টাকার তুলনায় প্রায় ৩২ কোটি টাকা বেশি। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দরপতনের মধ্যেও কিছু বিনিয়োগকারী কম দামে শেয়ার সংগ্রহের চেষ্টা করায় লেনদেন বেড়েছে।
লেনদেনের শীর্ষে থাকা কোম্পানিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল একমি পেস্টিসাইড, ব্র্যাক ব্যাংক এবং রবি। এ ছাড়া সিটি ব্যাংক, সি পার্ল বিচ রিসোর্ট, সামিট এলায়েন্স পোর্ট, ইনটেক লিমিটেড, শাইনপুকুর সিরামিক, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ এবং ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিংও লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় ছিল।
অন্য দিকে সিএসইতেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। যদিও সেখানে দাম বাড়ার তালিকায় থাকা কোম্পানির সংখ্যা বেশি ছিল, তবুও সার্বিক সূচক কমেছে। সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই প্রায় ৭৫ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৯৫৪ পয়েন্টে। এছাড়া সিএসইএক্স, সিএসই-৩০ এবং শরিয়াহ সূচকেও পতন হয়েছে।
এদিকে সিএসইতে মোট ১৬৭টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নেয়। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ৭৯টির, কমেছে ৬৫টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২৩টির। এদিন সিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে ১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, যা আগের কার্যদিবসের তুলনায় অনেক বেশি।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ঈদের পর বাজারে এমন পতনের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সীমিত অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা বাড়িয়েছে। ফলে অনেকেই নতুন করে বিনিয়োগ না করে বিদ্যমান শেয়ার বিক্রির দিকে ঝুঁকছেন।
এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে বাজারে তারল্য সঙ্কট ও আস্থার ঘাটতি থাকায় ইতিবাচক কোনো খবরেও বাজার স্থিতিশীল হতে পারছে না। ঈদের আগে সাময়িক ঊর্ধ্বমুখিতা দেখা গেলেও তা ছিল অস্থায়ী এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বাজারকে স্থিতিশীল করতে হলে নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো, বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ জরুরি।
সামগ্রিকভাবে ঈদের পর প্রথম কার্যদিবসেই বড় দরপতনের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে যে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেল, তা বিনিয়োগকারীদের জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করছে। তবে লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি কিছুটা ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী কার্যদিবসগুলোতে বাজার এই নিম্নমুখী ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে কি না, নাকি পতনের এই প্রবণতা আরো দীর্ঘায়িত হয়।



