রক্তরঞ্জিত জুলাই-২২

আরো কঠোর অ্যাকশন নেয়ার নির্দেশ হাসিনার

এ দিন সারা দেশে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীসহ এক হাজার ২০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

আমিনুল ইসলাম
Printed Edition

২০২৪ সালের ২২ জুলাই সোমবার। ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে কমপ্লিট শাটডাইন শিথিলের ঘোষণা দেন নাহিদ ইসলাম। আর ওই সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ‘আরো কঠোর অ্যাকশন’ এ যেতে বলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুরু হয় দেশব্যাপী চিরুনি অভিযান। এ দিন সারা দেশে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীসহ এক হাজার ২০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। রোববার রাত ১২টা থেকে সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টায় শুধু রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে ৫১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ছয় দিনে (১৭ থেকে ২২ জুলাই) সারা দেশে গ্রেফতারের সংখ্যা দুই হাজারের ওপরে।

এ দিন নতুন করে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর ঘটনা না ঘটলেও হাসপাতালে মারা যান গুলিবিদ্ধ ৬ জন। মাতুয়াইলের রাস্তার সাইড ও ঝোপ ঝাড়ের মধ্যে পড়ে থাকা তিনটি গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়। যারা আগে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত অবস্থায় পড়েছিলেন। সেদিও কারফিউ থাকায় খোলেনি সরকারি বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান। বন্ধ থাকে ইন্টারনেট সেবা। রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা ধংসস্তূপ সরাতে থাকেন নিরাপত্তা বাহিনী ও অন্যান্য সংস্থার সদস্যরা। আতঙ্ক নিয়েই খুলতে শুরু করে গলির ভেতরের কিছু দোকান।

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সারা দেশে সোমবার পর্যন্ত ১৬৪টি মামলা করা হয়। এর মধ্যে ডিএমপিতে ৭১টি, চট্টগ্রাম মহানগরে ১৪টি এবং অন্যান্য জেলায় ৭৯টি মামলা করা হয়। চিরুনি অভিযানে গ্রেফতার ব্যক্তিদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। র‌্যাবের বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন সোমবার সারা দেশে অভিযান চালিয়ে ৪০ জনকে গ্রেফতার করে। আগের দিন রোববার নাশকতায় জড়িত থাকার অভিযোগে সারা দেশে ৩৯ জনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।

২২ জুলাই কোটা সংস্কারসংক্রান্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সারসংক্ষেপে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদিন রাত ৯টায় তিনি এই সারসংক্ষেপে স্বাক্ষর করেন। এর আগে দুপুরে শেখ হাসিনা কিছু ব্যবসায়ীর সাথে গণভবনে বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও সহিংসতার জন্য বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরকে দায়ী করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে ‘আরো শক্ত অ্যাকশন’ নেয়ার কথা জানান। সেদিন ২২ জুলাই পঞ্চম দিনের মতো পুরো দেশকে ইন্টারনেটবিহীন রাখে সরকার। এক নির্বাহী আদেশে সাধারণ ছুটি আরো এক দিন (২৩ জুলাই) বাড়ানো হয়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম চার দফা দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি স্থগিত করেন। কোটা সংস্কার আন্দোলন ব্যাপক সহিংসতায় রূপ নিলে শুক্রবার (১৯ জুলাই) মধ্যরাত থেকে কারফিউ জারি করা হয়। সোমবার কারফিউর তৃতীয় দিন ছিল। এ দিন দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল রাখা হয়।

রাজধানীর অন্যান্য এলাকায় আন্দোলনকারীদের তেমন তৎপরতা না থাকলেও পথে পথে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র‌্যাবের ব্যাপক অবস্থান দেখা যায়। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান মোতায়েন ছিল। আকাশে ছিল পুলিশ-র‌্যাবের হেলিকপ্টার টহল। এ দিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুইজন আন্দোলনকারীর মৃত্যু হয়। সোমবার পর্যন্ত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে আন্দোলনে নিহত ৬৮টি লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

২২ জুলাই সেনাপ্রধান যাত্রাবাড়ীসহ ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মোতায়েন করা সেনা সদস্যদের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। এ সময় সেনাপ্রধান বলেন, ‘জনগণের স্বার্থে এবং রাষ্ট্রের যেকোনো প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর সদস্যরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশব্যাপী কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়া এদিন যাত্রাবাড়ী এলাকা পরিদর্শন করেন তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, র‌্যাবের মহাপরিচালক মো: হারুন অর রশিদ ও ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান। এ সময় আইজিপি সাংবাদিকদের বলেন, প্রতিটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য পাই পাই করে হিসাব দিতে হবে।

তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, পরিস্থিতির আরো উন্নতির জন্য কারফিউ অব্যাহত থাকবে। মঙ্গলবার বেলা ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল থাকবে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে আস্তে ধীরে কারফিউ শিথিলের সময় পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে।

রোববার রাত থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে চট্টগ্রাম মহানগরে ৪৬ জন, নারায়ণগঞ্জে ১১০ জন, গাজীপুরে ২৫ মামলায় ১৫৬ জন, বগুড়ায় ১০ মামলায় ৯৪ জন, ঠাকুরগাঁওয়ে ২৫ জন, লালমনিরহাটে দুইজন, টাঙ্গাইলে ৩৯ জন, রংপুরে ১৮ জন, জয়পুরহাটে ৩৬ জন, কক্সবাজারে তিন মামলায় ২৪ জন, বরগুনায় ২৫ জন, বরিশালে ১৩ জন, দিনাজপুরে ৩১ জন, জামালপুরে আটটি মামলায় ১৮ জন, ঝিনাইদহে ১৩ জন, কুমিল্লায় ৯১ জন, নাটোরে চারজন, ফেনীতে আটজন, গাইবান্ধায় দুই নাশকতার মামলায় ৪৫ জন, ফরিদপুরে ১৭ জন, পঞ্চগড়ে চারজন, কিশোরগঞ্জে ২৬ জন, লক্ষ্মীপুরে ১৪ জন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৫ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।