চুয়াডাঙ্গায় মাদকের নতুন ছক টার্গেট নারী ও শিক্ষার্থী

Printed Edition
উদ্ধারকৃত মাদক ধ্বংস করা হচ্ছে : নয়া দিগন্ত
উদ্ধারকৃত মাদক ধ্বংস করা হচ্ছে : নয়া দিগন্ত

মনিরুজ্জামান সুমন দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা)

সীমান্তের জেলা চুয়াডাঙ্গায় মাদকের পুরনো চিত্রে ধীরে ধীরে যুক্ত হচ্ছে নতুন বাস্তবতা। একসময় ফেনসিডিল, গাজা ও ইয়াবাই ছিল আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর অভিযানের প্রধান ল্য। এখন সেই তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছে ট্যাপেন্টাডলসহ বিভিন্ন নেশাজাতীয় ট্যাবলেট, স্ক্রাফ সিরাপ ও বুপ্রেনরফাইন ইনজেকশন। মাদক সরবরাহের এই ধরন পরিবর্তনে তৈরি হয়েছে নতুন ঝুঁকি।

চুয়াডাঙ্গা-৬ বিজিবির অভিযানের তথ্য বিশ্লেষণ করলেও পরিবর্তনের চিত্রটি স্পষ্ট হয়। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত অভিযানে ১১ হাজারের বেশি নেশাজাতীয় ট্যাবলেট ও ইয়াবা উদ্ধার হয়। পরের এক বছরে (আগস্ট ২০২৪-জুলাই ২০২৫) উদ্ধার হয় ২৫ হাজার ৪৮৫ পিস ভায়াগ্রা, সেনেগ্রা ও ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট। একই সময় ১০ হাজার ৬১৭ বোতল ফেনসিডিল এবং ২৩৮ কেজির বেশি গাজা জব্দ করা হয়।

দামুড়হুদা, দর্শনা ও জীবননগরের বিস্তীর্ণ সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করা এসব মাদক কেবল সীমান্ত এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। গত বছরের সেপ্টেম্বরে চুয়াডাঙ্গা শহরের একটি কুরিয়ার সার্ভিসের সামনে থেকে পাঁচ হাজার ৭০০ পিস ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা প্রমাণ করে, সীমান্ত পেরিয়ে মাদক অভ্যন্তরীণ পরিবহন ও সরবরাহ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে।

মাদকের এই নতুন বিস্তারে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে কিশোর ও তরুণরা। সম্প্রতি জীবননগরে এক অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণির শিার্থীদের মাদক বহনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি উচ্চমাধ্যমিক ও অনার্স পর্যায়ের শিার্থীদের মধ্যেও আসক্তির প্রবণতা বাড়ছে।

অভিযোগ রয়েছে, মাদক কারবারের মূল নিয়ন্ত্রকরা নিজেদের আড়ালে রেখে আসক্ত শিার্থী, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও নারীদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করছে। শুরুতে যারা সেবনকারী ছিল, তাদেরই পরবর্তী সময়ে মাদক বহন, পৌঁছে দেয়া কিংবা নতুন সেবনকারী সংগ্রহের কাজে লাগানো হচ্ছে। ফলে মূল হোতারা অধরাই থেকে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বাহক বা খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেফতার করে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। নেপথ্যের অর্থদাতা, মূল সরবরাহকারী ও ডিলারদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। পাশাপাশি আসক্ত কিশোর-তরুণদের আইনি শাস্তির পাশাপাশি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দিতে হবে।

এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের প্রসিকিউটর আকুব্বার আলী জানান, নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত ও সামারি ট্রায়াল কার্যকর রয়েছে। তবে একে সামাজিক সমস্যা উল্লেখ করে তিনি পরিবার ও সমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। চুয়াডাঙ্গা-৬ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান জানান, সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি মাদক ও চোরাচালান ঠেকাতে বিজিবির নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

চুয়াডাঙ্গা জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মারুফ সরোয়ার বাবুও মনে করেন, সামারি ট্রায়াল দ্রুত সাজা নিশ্চিত করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখছে। পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবির খান বলেন, দ্রুত বিচার ও সাজা নিশ্চিত করায় অপরাধীদের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছে। আত্মসমর্পণের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি পুলিশ ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে।