সংশোধন সত্ত্বে সূচকের উন্নতি ধরে রাখল পুঁজিবাজার

সানলাইফের অস্বাভাবিক লেনদেন তদন্তের নির্দেশ বিএসইসির

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

এক দিকে আগে থেকে মূল্যস্তর বাড়া কোম্পানিতে সংশোধন, অন্য দিকে নতুন কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম বাড়ায় গতকাল দিনশেষে সূচকের উন্নতি ধরে রেখেছে দেশের দুই পুঁজিবাজার। এ দিন উভয় বাজারেই মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় জায়গা করে নেয় বিভিন্ন খাতের বেশ কিছু কোম্পানি। অন্য দিকে গত কয়েক দিন টানা দাম বাড়া কোম্পানিগুলো মুনাফা তুলে নেয়ার কারণে ভুগছে বিক্রয়চাপে। আর এ সংশোধনের ফলে ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনের কিছুটা অবনতি ঘটলেও বেড়েছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের আচরণ পুঁজিবাজারে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা নিজেদের বিনিয়োগকে বহুমুখী করার সুযোগ পান।

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১৭ দশমিক ৩৩ পয়েন্ট বেড়েছে। পাঁচ হাজার ৮৪৯ দশমিক ২১ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি সোমবার দিনশেষে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৮৬ দশমিক ৫৪ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির বিশেষায়িত দুই সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ২ দশমিক ৩৫ ও ৪ দশমিক ৩১ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকল ১০৯ দশমিক ৫৪ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। সিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ১১৪ দশমিক ০৭ ও ৬৯ দশমিক ১৩ পয়েন্ট।

গতকাল দুই পুঁজিবাজারই লেনদেন শুরু করে সূচকের বড় ধরনের উন্নতি দিয়ে। প্রথম দুই ঘণ্টা সূচকের এ অবস্থান ধরে রাখে বাজারগুলো। কিন্তু দুপুর ১২টার পর ঢাকার বাজারে বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হয়। এ সময় আগের কয়দিন মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় থাকা বিভিন্ন খাতের কোম্পানিগুলো থেকে মুনাফা তুলে নেয়ার সুযোগ কাজে লাগান বিনিয়োগকারীরা। দিনের বাকি সময় কোম্পানিগুলোতে সংশোধন ঘটে। তবে একই সময় নতুন কিছু কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি সূচকের পতন রোধ করলে ডিএসইর সবগুলো সূচকই কমবেশি উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। একই সময় চট্টগ্রাম শেয়ারবাজার ছিল অনেকটা বিক্রয়চাপমুক্ত। দিনশেষে বাজারটির সব কয়টি সূচকই ভালো অবস্থানে থেকে লেনদেন শেষ করে।

এ দিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের প্রতিষ্ঠান সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের শেয়ারের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি ও সন্দেহজনক লেনদেনের কারণ অনুসন্ধানে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

গতকাল বিএসইসির সার্ভেইল্যান্স বিভাগ থেকে ডিএসইর প্রধান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তার (সিআরও) কাছে এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠানো হয়। কমিশন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বিএসইসির চিঠিতে বলা হয়েছে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারে সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং সন্দেহজনক লেনদেনের প্রবণতা কমিশনের নজরে এসেছে। এ কারণে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তদন্তের জন্য কমিশন কয়েকটি নির্দিষ্ট শর্ত বা টার্মস অব রেফারেন্স নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে কোনো সমন্বিত, কারসাজিমূলক বা কৃত্রিম লেনদেন হয়েছে কি না তা শনাক্ত করা। পাশাপাশি অপ্রকাশিত মূল্যসংবেদনশীল তথ্য ব্যবহার করে ইনসাইডার ট্রেডিং বা ভেতরের কেউ অবৈধ সুবিধা নিয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট স্টক ব্রোকার, স্টক ডিলার ও তাদের অনুমোদিত প্রতিনিধিরা মার্জিন রুলস এবং কমিশনের বিভিন্ন নির্দেশনা ও বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করেছেন কি না, তা যাচাই করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সাথে সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট ব্রোকার হাউজ ও তাদের প্রতিনিধিদের ভূমিকা মূল্যায়ন এবং সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের অন্য কোনো অনিয়ম ঘটেছে কি না, তাও তদন্তের আওতায় আনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

জানা গেছে ডিএসইতে গত ২২ জুন সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারদর ছিল ৬৫ টাকা ৮০ পয়সা। কিন্তু সর্বশেষ গতকাল শেয়ারটির দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৯ টাকা ১০ পয়সা। অর্থাৎ এই সময়ে শেয়ারটির দর প্রায় ২২ শতাংশ বেড়েছে। একই সাথে লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

চিঠিতে বিএসইসি আরো উল্লেখ করেছে, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক ডিলার, স্টক ব্রোকার ও অনুমোদিত প্রতিনিধি) বিধিমালা, ২০০০-এর দ্বিতীয় তফসিলের আচরণবিধি ৬ ও ৮ এবং বিধি ১১-এর সম্ভাব্য লঙ্ঘন প্রতিরোধে ব্রোকার হাউজের প্রধান নির্বাহী, কমপ্লায়েন্স অফিসার ও অনুমোদিত প্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় সচেতন করতে হবে।

তদন্তে প্রয়োজনীয় লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ এবং সার্বিক সহযোগিতার জন্য চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) প্রধান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তাকেও চিঠির অনুলিপি পাঠিয়েছে বিএসইসি।

গতকাল ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে টেক্সটাইল খাতের কোম্পানি মালেক স্পিনিং। ৫৩ কোটি ১৯ লাখ টাকায় কোম্পানিটির এক কোটি ১৮ লাখ ৯৭ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় এ দিন। ৩০ কোটি ২৪ লাখ টাকায় ৪৭ লাখ ৪৪ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে দিনের দ্বিতীয় স্থানে ছিল ব্র্যাক ব্যাংক। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ইস্টার্ন হাউজিং, লাভেলো আইসক্রিম, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, ফার ইস্ট নিটিং, মেঘনা ইন্স্যুরেন্স, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ ও রংপুর ডেইরি ফুডস।

ডিএসইতে গতকাল মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল দেশ গার্মেন্টস। কোম্পানিটির ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে গতকাল। ৮ দশমিক ৯১ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল সমতা লেদার। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ দশ সিকিউরিটিজের অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে আইসিবি অগ্রণী মিউচুয়াল ফান্ড, মেঘনা ইন্স্যুরেন্স, এনসিসিবি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, মিডল্যান্ড ব্যাংক, ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স ও আরামিট লিমিটেড।