ক্রীড়া প্রতিবেদক
ফিফা বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালের মহারণ। ল্যাতিন আমেরিকার প্রতিপক্ষ ইউরোপ। বিশ্ব ফুটবলে ফাইনালে ওঠার আকর্ষণীয় লড়াইয়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মোকাবেলা করবে ১৯৬৬ আসরের শিরোপাজয়ী ইংল্যান্ড। তবে এই ম্যাচকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় দুই দলের দুই সেরা তারকা ও অধিনায়ক লিওনেল মেসি ও হ্যারি কেন। এক দিকে বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি মেসি, অন্য দিকে ইংল্যান্ডের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা কেন। দুই তারকার নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা ও গোল করার সামর্থ্যই ম্যাচে যোগ হয়েছে উত্তেজনার অন্যরকম মাত্রা।
বয়সের ভারকে উপেক্ষা করে এখনো আর্জেন্টিনার আক্রমণের মূল চালিকাশক্তি মেসি। বল পায়ে তার অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ, নিখুঁত পাস এবং ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়ার ক্ষমতা প্রতিপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। চলমান বিশ্বকাপেও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল ও অ্যাসিস্ট করে তিনি দলকে সেমিফাইনালে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এখন পর্যন্ত ৮ গোল ও ৩টিতে সহায়তা করে গোল্ডেন বুট জয়ের অন্যতম দাবিদার ইন্টার মিয়ামির এই অধিনায়ক।
অন্য দিকে ইংল্যান্ডের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ধরা হয় হ্যারি কেনকে। গোল করার পাশাপাশি তিনি সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করেন এবং ব্যস্ত রাখেন প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে। অধিনায়ক হিসেবে তার নেতৃত্বও প্রশংসিত। বড় ম্যাচে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়ার মানসিকতা এবং চাপের মুহূর্তে ঠাণ্ডা মাথায় তার খেলার সক্ষমতা আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে ইংল্যান্ডকে। ইতোমধ্যে টুর্নামেন্টে ৬ গোলের পাশাপাশি একটি অ্যাসিস্ট নিয়ে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে আছেন কেনও।
বিশ্বকাপ মঞ্চে এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনার বিপক্ষে পাঁচবার লড়াই হয়েছে ইংল্যান্ডের। এই পাঁচবারের সাক্ষাতে ইংল্যান্ডের জয় ৩টি ম্যাচে এবং আর্জেন্টিনার জয় ১টিতে। বাকি একটি ম্যাচ ড্র হলেও টাইব্রেকারে জয় পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। চিলিতে প্রথম মোকাবেলায় ১৯৬২ সালে গ্রুপ পর্বে ইংল্যান্ড ৩-১ গোলে হারায় আর্জেন্টিনাকে। স্বাগতিক হিসেবে ১৯৬৬ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড ১-০ ব্যবধানে হারিয়েছিল ল্যাটিন দেশটিকে। এরপর মেক্সিকো বিশ্বকাপে ১৯৮৬ সালে শেষ আটে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে জয় পেয়েছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সে শেষ ষোলোর ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হওয়ার পর টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে জিতেছিল আর্জেন্টিনা। ২০০২ সালে জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ১-০তে আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছিল ইংল্যান্ড। এই দুই ফুটবল পরাশক্তির ঐতিহাসিক দ্বৈরথে এবার যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। এক দিকে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক মেসি। অন্য দিকে ইংলিশদের হয়ে ৯৯ ম্যাচে ৬৬ গোল ও চলতি মৌসুমে জার্মান ক্লাব বায়ার্নের হয়ে ৪৬টি গোল করে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা কেন।
বিশ্বকাপে দুই দলের পাঁচবার মোকাবেলা হলেও এখন পর্যন্ত মেসির দীর্ঘ দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে কখনোই ইংল্যান্ডে বিপক্ষে মাঠে নামেননি। ২০০৫ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রীতিম্যাচে মেসি দলে থাকলেও মাঠে নামার সুযোগ পাননি। অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হচ্ছে এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা। এই দ্বৈরথের মধ্য দিয়ে অপেক্ষার অবসান হবে হ্যারি কেনেরও।
দুই অধিনায়কের খেলার ধরনে রয়েছে স্পষ্ট পার্থক্য। মেসি সাধারণত নিচে নেমে বল গ্রহণ করেন, মিডফিল্ডের সাথে আক্রমণের সংযোগ তৈরি করেন এবং ড্রিবলিংয়ের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে দেন। অন্যদিকে কেন একজন পরিপূর্ণ স্ট্রাইকার হলেও প্রয়োজন অনুযায়ী নিচে নেমে খেলা গড়েন এবং আক্রমণে ভারসাম্য আনেন। ম্যাচটিকে আরো কৌশলগত করে তুলবে এই ভিন্নতায়।
আর্জেন্টিনার প্রাণভ্রমরা অভিজ্ঞ মেসি
বিশ্বকাপে বয়স যেন কেবলই একটি সংখ্যা, ৩৯ বছরে পা রাখা তা আবার প্রমাণ করেছেন লিওনেল মেসি। বড় মঞ্চে এখনো অটুট রয়েছে তার প্রভাব। গোল, অ্যাসিস্ট, ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ এবং নেতৃত্ব- সব মিলে আর্জেন্টিনার সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারিগর বিশ্বকাপজয়ী এই তারকা। ল্যাতিন দেশটির সেমিফাইনালে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদানও মেসির।
গ্রুপ পর্ব থেকেই দুর্দান্ত ছন্দে ছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভাঙতে তার নিখুঁত পাস, আক্রমণ সাজানোর দক্ষতা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল করার ক্ষমতা এগিয়ে নিয়েছে আর্জেন্টিনাকে। নকআউট পর্বেও ছিলেন ভরসার প্রতীক। টুর্নামেন্টে একাধিক গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের জন্যও গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন মেসি। জুলিয়ান আলভারেজ, লাউতারো মার্টিনেজ এবং মিডফিল্ডের খেলোয়াড়দের সমন্বয় আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগকে করেছে আরো ভয়ঙ্কর করেছেন রেকর্ড আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই তারকা।
চলমান বিশ্বকাপে ইতোমধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য রেকর্ডও গড়েছেন মেসি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার হিসেবে নিজের অবস্থান আরো শক্ত করেছেন তিনি। একই সাথে গোল ও অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যানেও নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। মাঠে তার নেতৃত্বও আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি। তরুণ ফুটবলারদের আত্মবিশ্বাস জোগানো, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয়ার প্রবণতা দলকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। সেমিফাইনালের ম্যাচের আগে আবারো আলোচনার কেন্দ্রে মেসি। শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্যে এগিয়ে চলা আর্জেন্টিনার গুরুদায়িত্ব তারই কাঁধে। ফুটবলপ্রেমীদের বিশ্বাস, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং জয়ের মানসিকতা দিয়ে আরো একবার দলকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলতে সক্ষম হবেন মেসি।
ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি হ্যারি কেন
বিশ্বকাপে শিরোপা জয়ের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছে ইংল্যান্ড। সেই স্বপ্নের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম হ্যারি কেন। অধিনায়ক হিসেবে নেতৃত্ব, গোল করার অসাধারণ ক্ষমতা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলকে সামনে থেকে টেনে নেয়ার দক্ষতায় ইংল্যান্ডের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ফুটবলার হয়ে উঠেছেন তিনি। সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মহারণের আগে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবেই দেখা হচ্ছে অভিজ্ঞ এই স্ট্রাইকারকে।
পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই শুধু গোল করেই দায়িত্ব পালন করেননি হ্যারি কেন, বরং দলের আক্রমণভাগের মূল সংগঠক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রেখে সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করা এবং আক্রমণের গতি নিয়ন্ত্রণে তার অবদান ছিল চোখে পড়ার মতো। নকআউট পর্বেও দলের সাফল্যে তার অবদান উল্লেখযোগ্য। কঠিন ম্যাচগুলোতে মনোবল ধরে রেখে অধিনায়ক হিসেবে খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছেন। তরুণ ফুটবলারদের সাথে তার বোঝাপড়াও ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলেছে দলকে।
এই আসরে দুর্দান্ত ছন্দে আছেন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার জুড বেলিংহাম। তবে এখনো ইংল্যান্ডের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু হ্যারি কেনই। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের নজর থাকে তার ওপর, আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আক্রমণভাগের অন্য খেলোয়াড়রা জায়গা তৈরি করেন। ফলে কেনের অবদান শুধু গোলে সীমাবদ্ধ নয়; পুরো আক্রমণভাগকে আরো কার্যকর করে তুলছে তার উপস্থিতি।
ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসেও একটি বিশেষ নাম হ্যারি কেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের জার্সিতে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে ইতোমধ্যেই নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন তিনি। চলমান বিশ্বকাপেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে নিজেকে রেখেছেন আলোচনায়। সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে লড়াইটি বড় পরীক্ষা হবে কেনের। একদিকে থাকবেন লিওনেল মেসি, অন্যদিকে ইংল্যান্ডের নেতৃত্বে হ্যারি কেন।



