কম্পিউটার ল্যাব তালাবদ্ধ

মানিকছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৩৬ বছর জনবল সঙ্কট

ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ভর্তি বন্ধ

Printed Edition

আবদুল মান্নান মানিকছড়ি (খাগড়াছড়ি)

খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার প্রাচীন ও প্রথম উচ্চ বিদ্যালয় ‘রাণী নীহার দেবী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়’। ১৯৮১ সালে তৎকালীন মং রাজা মংপ্রুসাইন বাহাদুর তার স্ত্রী রাণী নীহার দেবীর নামানুসারে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৮ সালে বিদ্যালয়টি ১৪টি সৃষ্টপদে সরকারিকরণ করা হয়। কিন্তু তিন যুগ পেরিয়ে গেলেও এখনো সব পদে জনবল পূরণ হয়নি। এমনকি এই দীর্ঘ সময়ে একজন পূর্ণাঙ্গ প্রধান শিক্ষকও পায়নি প্রতিষ্ঠানটি, ভারপ্রাপ্ত দিয়েই চলছে পাঠদান।

বিদ্যালয়ের বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৪০১ জন, আর শিক্ষক মাত্র সাতজন। রসায়ন, পদার্থ, জীববিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও অফিস সহকারীসহ একাধিক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। ফলে শিক্ষক সঙ্কটে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি কম্পিউটার ল্যাব ও লাইব্রেরি বছরের পর বছর তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। অথচ আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন তিনতলা একাধিক ভবন, লিফট সুবিধা ও ছাত্রী হোস্টেলসহ দৃষ্টিনন্দন এই বিদ্যালয়টির অবকাঠামো জেলার মধ্যে অন্যতম উন্নত।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সরকারিকরণের সময় বিদ্যালয়ের জন্য প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, ৯জন সহকারী শিক্ষক, অফিস সহকারী, দফতরী ও আয়ার পদ অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু এ পর্যন্ত প্রধান শিক্ষক পদসহ অনেকগুলো পদ শূন্যই রয়ে গেছে।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো: আতাউল্লাহ বলেন, শূন্যপদে শিক্ষক না থাকায় তিন যুগ ধরে ভারপ্রাপ্ত দিয়েই বিদ্যালয়টি চলছে। বর্তমানে ৪০১ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে সাতজন শিক্ষক দায়িত্ব পালন করছেন। রসায়ন, পদার্থ, জীববিজ্ঞান ও কম্পিউটারে শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে। এমনকি শিক্ষক না থাকায় ব্যবসায় শিক্ষা শাখাটিও বন্ধ করতে হয়েছে।

তিনি আরো জানান, অভিভাবকদের অর্থায়নে চারজন অতিথি শিক্ষক ও তিনজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। প্রতি শিক্ষার্থীকে মাসে ১০০ টাকা অতিরিক্ত ফি দিতে হয়। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা বেতনে ওই অতিথি শিক্ষকরা কাজ করছেন।

এসএসসি পরীক্ষার্থী তাথৈই পাল ও নুসরাত জাহান বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানের শিক্ষক নেই। হেডস্যার নিজে পড়ান ও প্র্যাকটিক্যাল করান। কম্পিউটার ল্যাবে কখনো ঢোকা হয়নি। নবম শ্রেণীর ছাত্রী সাদিকুন নাহার পাপিয়া বলেন, বিজ্ঞানের শিক্ষক না থাকলে সাইন্স বিভাগে ভর্তি হওয়ার মানেই নেই। বই পড়ে পরীক্ষায় পাস করা যায়, কিন্তু শেখা যায় না।

অভিভাবক নজরুল ইসলাম বলেন, অবকাঠামো ভালো হলেও শিক্ষকের অভাবে শিক্ষার মান দিন দিন কমছে। সন্তানদের অন্যত্র পাঠানোর সামর্থ্য নেই।

বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষকরা জানান, বিদ্যালয়টি একসময় উপজেলার সেরা প্রতিষ্ঠান ছিল। এখনো ফলাফলে এগিয়ে থাকলেও মানসম্পন্ন পাঠদান ও আধুনিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি তাহমিনা আফরোজ ভূঁইয়া বলেন, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শিক্ষক সঙ্কটে ভুগছে। মাঝে মাঝে শিক্ষক পদায়ন দেয়া হলেও অল্প সময়েই তারা বদলি হয়ে যান। একজন শিক্ষক যদি দুই বছরও টেকে না, তাহলে শিক্ষার মান কীভাবে উন্নত হবে? শূন্যপদে দ্রুত নিয়োগ ও নতুন পদ সৃষ্টির জন্য সুপারিশ পাঠানো হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, রাণী নীহার দেবী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মানিকছড়ির শিক্ষার ইতিহাসের অংশ। আধুনিক অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও জনবল সঙ্কটে এর ঐতিহ্য ম্লান হয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই, মন্ত্রণালয় দ্রুত শিক্ষক ও কর্মচারী পদায়ন করুক, যাতে এ প্রতিষ্ঠান আবারো মানিকছড়ির শিক্ষার আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে পারে।

তিন দশকের জনবল সঙ্কটে টিকে থাকা এই বিদ্যালয় এখন এক অনন্য উদাহরণ, অভাবের মাঝেও স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার লড়াই করে যাচ্ছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও প্রশাসনিক সহায়তা না মিললে জেলার এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি একদিন হয়তো তার আলো হারিয়ে ফেলবে।