নিজস্ব প্রতিবেদক
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়ায় তাদের অর্থবহ অংশগ্রহণ, নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন দেশী-বিদেশী শিক্ষাবিদ, কূটনীতিক ও রোহিঙ্গা অধিকারকর্মীরা। তাদের মতে, রোহিঙ্গাদের মতামত উপেক্ষা করে কোনো প্রত্যাবাসন উদ্যোগ টেকসই বা ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না।
‘আমাদের ছাড়া আমাদের বিষয়ে কিছু নয়: প্রত্যাবাসনের সন্ধানে রোহিঙ্গাদের কণ্ঠস্বর’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। রোহিঙ্গা গণহত্যার নবম বার্ষিকী উপলক্ষে ২৫ আগস্ট নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ (সিপিএস) এ ওয়েবিনারের আয়োজন করে।
সিপিএসের পরিচালক অধ্যাপক ড. এম জসিম উদ্দিন উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, রোহিঙ্গাদের অর্থবহ অংশগ্রহণ ছাড়া সঙ্কটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। সম্ভাব্য প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় তিনি পাঁচটি বিষয়কে গুরুত্ব দেন। এগুলো হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের কণ্ঠস্বরকে প্রাধান্য দেয়া, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা, পছন্দের ভিত্তিতে স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের সুযোগ সৃষ্টি, বিশ্বাসযোগ্য যাচাইব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরো গুরুত্বের সাথে নিতে হবে। একই সাথে রাখাইন রাজ্যের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণকারী আরাকান আর্মির সাথে অনানুষ্ঠানিক সংলাপসহ ট্র্যাক ওয়ান ও ট্র্যাক টু কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
২০১৭ সালের নভেম্বরে সম্পাদিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তির সমালোচনা করে অধ্যাপক জসিম বলেন, ওই চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের আত্মপরিচয়, নাগরিকত্ব ও অন্যান্য মানবিক অধিকার যথাযথভাবে সুরক্ষিত হয়নি।
ওয়েবিনারে রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী মোহাম্মদ তোফায়েল বলেন, নির্বাসনে জন্ম নেয়া একটি প্রজন্ম এখন বেড়ে উঠছে। মানবিক সহায়তা প্রয়োজনীয় হলেও তা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিকল্প হতে পারে না।
ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার (ইউসিআর) প্রেসিডেন্ট প্যানেলের সদস্য সৈয়দ উল্লাহ ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের যথাযথ পরামর্শ ছাড়াই এসব নথি তৈরি করা হয়েছিল। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সাথে বর্তমান যাচাইপ্রক্রিয়া এবং তথাকথিত মডেল ভিলেজে পুনর্বাসনের উদ্যোগ সঙ্কটের সমাধান করবে না; বরং রোহিঙ্গাদের সীমাবদ্ধ অবস্থান দীর্ঘায়িত করতে পারে।
ইউসিআরের আরেক সদস্য খিন মং বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর কয়েক দশক ধরে চলা নিপীড়নের মধ্যেই বর্তমান সঙ্কটের শিকড় রয়েছে। রোহিঙ্গাদের প্রকৃত অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো প্রত্যাবাসন কাঠামো পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।
সাংবাদিক ও গবেষক আদিল সাখাওয়াত বলেন, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের পরিচয় অস্বীকারের প্রবণতা এখনো অব্যাহত রয়েছে। ২০২৪ সালে বুথিডংয়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য এখনো অনুকূল নয়।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির রোহিঙ্গাদের ইতিহাস ও স্মৃতি সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন। রোহিঙ্গা বিভিন্ন সংগঠনকে একটি অভিন্ন অবস্থান তৈরি করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি। একই সাথে বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে বাংলাদেশের প্রভাব কাজে লাগিয়ে টেকসই সমাধানের পথ তৈরির ওপর জোর দেন।
অধ্যাপক আমেনা মহসিন রোহিঙ্গা সঙ্কটের মূল কারণ হিসেবে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নীতিকে চিহ্নিত করেন। তিনি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা নারীদের মাতৃভূমির সাথে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক এবং ডিজিটাল প্রজন্মের রোহিঙ্গা তরুণদের প্রয়োজনের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনার আহ্বান জানান।
অধ্যাপক জসিম উদ্দিন বলেন, অতীতের প্রত্যাবাসন উদ্যোগগুলোর ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেয়া জরুরি। রোহিঙ্গা নেতা মুহিব উল্লাহ হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের আস্থায় না নেয়ার বিষয়টি এ ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে সামনে এসেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব বর্তমান নির্বাচিত রোহিঙ্গা সংগঠনগুলো করতে পারছে কি না- এ প্রশ্নও তোলেন তিনি। তার মতে, আলোচনার টেবিলে প্রকৃত রোহিঙ্গা প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না হলে ন্যায়সঙ্গত প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়।
এনএসইউর রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং সিপিএসের সদস্য ড. আনাস আনসার ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা করেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুতি দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কটে পরিণত হয়েছে। এ সঙ্কট মোকাবেলায় অব্যাহত আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।
সমাপনী বক্তব্যে এনএসইউর উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক আলোচনায় রোহিঙ্গাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি রোহিঙ্গা তরুণদের শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন ও কমিউনিটি গঠনে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও সামাজিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানান।



