সংবিধান সংস্কার না সংশোধন

জন-অভিপ্রায় আমলে নিন

Printed Edition

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে যে গণবিরোধী চরিত্রে রূপ দিয়েছিলেন; জুলাই বিপ্লবের পর নাগরিকরা প্রবলভাবে এর আমূল পরিবর্তন চেয়েছিলেন। এর প্রতিফলন ঘটে গণভোটেও। বর্তমান সংবিধানের সংস্কার করে গণভোটের আলোকে জন-অভিপ্রায় পূর্ণ করাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অন্যতম কর্তব্য। কিন্তু বর্তমান সরকার তা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে বলে বিরোধী দলের অভিযোগ। বিরোধীদের মতে, এ জন্য সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি।

এখন সরকারি দলের চাওয়া অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনে জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু ‘সংবিধান সংশোধন পরিষদ’ গঠনের দাবির পাশাপাশি বিরোধী দল এ কমিটিতে অংশ না নেয়ার ঘোষণা দিয়ে ওয়াকআউট করে। বিরোধী দল প্রথম থেকে বলে আসছে; গণভোটের মাধ্যমে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার মতো দিয়েছেন, সংবিধানের সংশোধন নয়, সংস্কার চান তারা। কিন্তু সরকারি দল সেই জনরায় পাশ কাটিয়ে এখন সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদীয় কমিটি গঠন করল। বিরোধী দল এই কমিটি গঠনের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে এখনো অটল।

সংবিধান একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। জাতির রাজনৈতিক, সামাজিক অঙ্গীকারের প্রতীক। সঙ্গতকারণে সংবিধান নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, জনআস্থা এবং সর্বোপরি জাতীয় ঐকমত্য অপরিহার্য। সংসদে সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে যে বিরোধ, তা দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দেবে। রাজনৈতিক পরিবেশ অস্থির হয়ে উঠতে পারে; এটি সহজে অনুমেয়।

ফ্যাসিবাদের আমলে কেটেছিঁড়ে সংবিধানের করুণ অবস্থা করা হয়েছে। তাই সংশোধন নাকি আমূল সংস্কার, এই প্রশ্ন সামনে এসেছে। শেখ হাসিনা যেভাবে নিজের ও দলীয় স্বার্থে সংবিধানে পরিবর্তন এনেছেন, এই পরিপ্রেক্ষিতে এর সংশোধন নয়, সংস্কারের অপরিহার্যতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গণভোটে ভোটাররা তাদের মতামত জানিয়েছেন। যাতে জাতীয় স্বার্থের প্রতিফলন ঘটানো যায় সংবিধানে।

গণতন্ত্রে শুধু সাংবিধানিক বৈধতা নয়, রাজনৈতিক ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও অত্যন্ত মূল্যবান। এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন সংলাপ ও পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ। এ ক্ষেত্রে সরকারি দলের সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব সংলাপের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা। এতে জনআস্থার প্রতি সম্মান দেখানো হবে। কারণ সংবিধান কোনো একটি সরকারের নয়; এটি সমগ্র জাতির। তাই সংবিধান হওয়া উচিত দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে।

মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য, কিন্তু সেই মতপার্থক্য যদি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে না এগোয়, তবে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতএব, সংবিধান সংশোধন কমিটি বা সংস্কার পরিষদ নিয়ে বর্তমান বিরোধকে সঙ্ঘাতের নয়; বরং সমঝোতা ও সহযোগিতার সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। একটি গ্রহণযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়াই পারে জনগণের আস্থা অর্জন করতে। দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে আরো শক্তিশালী করতে একটি প্রতিনিধিত্বশীল সংবিধান প্রণয়ন এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।