নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশে জুলাই আগস্ট মাসে যে আন্দোলন হয়েছিল তা সম্পূর্ণভাবে ছিল জনগণের আন্দোলন। জনগণ পরিবর্তন চেয়েছে বলেই জুলাই আন্দোলন সফল হয়েছে। জনগণ যখন সম্পূর্ণভাবে এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছে, তখনই আন্দোলন সফল হয়েছে। গতকাল বিকেলে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশে (কেআইবি) ‘গণতন্ত্র আদায়ে ১৭ বছরের সংগ্রাম ও রক্তঝরা জুলাই জাগরণ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আমাদের অবস্থান থেকে পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছি এই জুলাই আন্দোলনের সফলতার ক্রেডিট এই দেশের সর্বস্তরের জনগণের। এর কৃতিত্ব কোনো একক ব্যক্তি রাজনৈতিক দলের নয়। বিগত ১৭ বছর এ দেশের মানুষ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতাকর্মী, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী আরো অনেকগুলো রাজনৈতিক দল সবাই ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে মাঠে ছিল। মাঠ ছেড়ে আমরা কখনো চলে যাইনি। আমরা কখনোই জনগণকে একা ফেলে মাঠ ছেড়ে চলে যাইনি।
সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, অনেক কথা হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে, সংগ্রামের কথা হয়েছে, তর্কবিতর্ক হয়েছে এখন সময় হচ্ছে দেশ পুনর্গঠন করার। এখন সময় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। এখন সময় হচ্ছে ধৈর্য সহকারে ঠাণ্ডা মাথায় যারা ষড়যন্ত্র করতে চায় তাদের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখার। জনগণকে সতর্ক করা এবং ঠিক একইভাবে আমরা যে পরিকল্পনা জনগণের সামনে দিয়েছি, তাদের জন্য যা করতে চাইছি, দেশকে পুনর্গঠনের জন্য আমরা যা করতে চাইছি- সেগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা। জনগণের প্রত্যাশাগুলো পূরণ করা।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাহ উদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় জুলাইয়ের যুগপৎ আন্দোলনের শরিক নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, গণসংহতি আন্দোলনের জুনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম ও ভাসানী জনশক্তি পার্টির সভাপতি শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
প্রধানমন্ত্রীর বাণী : আজ ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ এ উপলক্ষে দেয়া গতকাল এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক বিজয়। এই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্য যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে এবং বাংলাদেশে আর কখনো স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ, চরমপন্থা কিংবা উগ্রবাদের উত্থান হতে দেয়া যাবে না।
তিনি আরো বলেন, দেশের সব শ্রেণিপেশার মানুষ, বীর ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিক, রিকশাচালক, মুটে-মজুর, পোশাক শ্রমিক, হোটেল-রেস্তোরাঁ কর্মী, পরিবহন শ্রমিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, গৃহবধূ, নারী ও শিশুসহ সর্বস্তরের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। গণ-অভ্যুত্থান দমনে মরিয়া ফ্যাসিস্ট সরকার রাজপথে গণতন্ত্রকামী জনগণের বুকে গুলি করে পাখির মতো মানুষ হত্যা করেছে। এমনকি জনগণের ওপর হেলিকপ্টার থেকেও গুলি চালানো হয়েছিল। স্বৈরাচারের বেপরোয়া গুলি থেকে মায়ের কোলে থাকা শিশু পর্যন্ত রেহাই পায়নি।
হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। গণতন্ত্রকামী জনগণের সম্মিলিত আন্দোলনে ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট গণভবন ছেড়ে পালিয়েছে। হাজারো শহীদের রক্তে স্নাত রাজপথে অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছে। রক্তে অর্জিত এই জাতীয় ঐক্য যেকোনো মূল্যে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।
সৌদিকে বিনিয়োগের আহ্বান : বাংলাদেশে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে সৌদি আরবকে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে সৌদি আরবের উপপররাষ্ট্র মন্ত্রী ওয়ালিদ বিন আব্দুল করিম এল খুরাইজি সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি এই আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন।
উপপ্রেস সচিব আরো জানান, সৌদি উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী তারেক রহমানকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী আমন্ত্রণের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে সুবিধাজনক সময়ে সৌদি আরব সফরের আশা প্রকাশ করেছেন।
এ সময় সৌদি আরবের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল সুলাইমান বিন আবদুল আজিজ আল-ইয়াহইয়া, কনসুলার বিষয়ক উপমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-শাম্মারি, মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী মুহাম্মাদ বিন আহমেদ আল-ঈসা, বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন আবিয়াহ এবং দেশটির পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অপর দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন।
কৃষক কার্ডের তালিকার নির্দেশ : ডিসেম্বরের মধ্যে কৃষকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কৃষক কার্ড সম্পর্কিত এক পর্যালোচনা সভায় তিনি এই নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন উপপ্রেস সচিব হাসান শিপলু।
বৈঠকে জানানো হয়, চলতি অর্থবছরে ৪৩ লাখ কৃষক এই কার্ডের সুবিধা পাবেন। পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে দেশের কমবেশি দুই কোটি কৃষককে এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীসহ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ইউএস নৌকমান্ডারের সাক্ষাৎ : প্রধানমন্ত্রীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন সফররত মার্কিন প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের বর্তমান কমান্ডার অ্যাডমিরাল স্টিফেন টি কোহলার। গতকাল দুপুরে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে মানবিক সহায়তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের সক্ষমতা ও অবদান নিয়ে আলোচনা হয়। মার্কিন কমান্ডার বিভিন্ন নৌমহড়ায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরেন।
বৈঠকে জানানো হয় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ককে বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। একই সাথে যুগোপযোগী ও বিস্তৃত সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরো গভীর করার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো: আরিফুল ইসলাম, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উত্তর আমেরিকা অনুবিভাগের মহাপরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে মতবিনিময় : প্রধানমন্ত্রী দেশের পানি ব্যবস্থাপনার বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে একদল বিশেষজ্ঞের সাথে মতবিনিময় করেছেন। সামাজিক উন্নয়নমূলক সংগঠন ফুটস্টেপস বাংলাদেশের নেতৃত্বে পরিবেশ, পানি ও প্রকৌশল খাতের বিশেষজ্ঞ এবং এ সংক্রান্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা সভায় অংশ নেন। তারা দেশের পানি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সমস্যা, বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা এবং সমাধান নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও সুপারিশ তুলে ধরেন।
এ সময় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার ও বিএনপির বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন উপস্থিত ছিলেন। সভায় ফুটস্টেপস বাংলাদেশের ট্রাস্টি ও হেড অব পার্টনারশিপস ফাসবীর এস্কান্দার, সভাপতি শাহ রাফায়াত চৌধুরী, ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ তাকী ইয়াসির, বিশ্বব্যাংকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী তারিক বিন ইউসুফ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, রেড অরেঞ্জের পরিচালক অলোক কুমার মজুমদার, উপপরিচালক সামিউল ইসলাম, ইয়ুথ ফর এনডিসির নির্বাহী পরিচালক আমানুল্লাহ পরাগ, গারবেজম্যানের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিদ উদ্দিন শুভ এবং নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনাবিদ এস এম মেহেদী হাসান উপস্থিত ছিলেন।



