অমিনুল ইসলাম
- মাদকসহ ধরা না পড়লে মামলা করা যায় না
- আইনের সংস্কার এবং কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি
দেশে মাদকবিরোধী অভিযান ও ‘মাদককে না বলুন’ স্লোগানের আড়ালে এক ভয়াবহ বাস্তবতা বিরাজ করছে। এক দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাদকের মূল উৎপাটনের দাবি করছে, অন্য দিকে আইনের মারপ্যাঁচে অনায়াসেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে রাঘববোয়াল বা মাদক গডফাদাররা। শুধু তাই নয়, এই অপরাধীরা এখন এতটাই শক্তিশালী যে, তারা উল্টো মাদকবিরোধী অভিযানের বিরুদ্ধেই আদালতকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
এই আইনের দুর্বলতার কারণে আবার কখনো কখনো সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অভিযান। অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছে, নির্দিষ্ট কিছু স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে গেলে অধিদফতরকে জানাতে হবে এবং তাদের প্রতিনিধিকে অভিযানের সাথে নিতে হবে। আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, তাদের এ দাবি গ্রহণযোগ্য নয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মাদকবিরোধী যুদ্ধ কেবল মাঠপর্যায়ে বাহককে গ্রেফতারের মাধ্যমে জয় করা সম্ভব নয়। গডফাদারদের দমনে প্রয়োজন আইনের আমূল সংস্কার এবং কাঠামোগত পরিবর্তন। ‘হাতেনাতে’ ধরার প্রাচীন প্রথা ভেঙে ডিজিটাল ও ফরেনসিক প্রমাণকে মামলার মূল ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। একই সাথে বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও সিসা বারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও কঠোর প্রশাসনিক তদারকি নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। জানা গেছে, মাদকবিষয়ক আইন সংস্কার এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরকে ঢেলে সাজাতে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বিষয়টি জাতীয় সংসদেও উত্থাপন করেছেন।
‘হাতেনাতে’ ধরার বাধ্যবাধকতা : মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে কাউকে মাদকসহ ‘হাতেনাতে’ ধরা না গেলে তার বিরুদ্ধে মামলা করা কঠিন। মাদক সিন্ডিকেটের প্রধান বা গডফাদাররা এই ফাঁকটিকেই সুনিপুণভাবে কাজে লাগায়। তারা নিজেরা কখনো মাদক বহন করে না, এমনকি বাহক বা ‘কুরিয়ার’দের সাথে সরাসরি যোগাযোগও রাখে না। অনুসন্ধানে জানা যায়, গডফাদাররা মূলত আড়াল থেকে অর্থ লেনদেন এবং পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করে। ডিএনসি বা পুলিশের কর্মকর্তারা অভিযানে গিয়ে মাদক পেলেও মূল হোতাদের সাথে সরাসরি সংযোগের প্রমাণ না পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিতে হিমশিম খেতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে নিরুপায় হয়ে তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা দেয়া হয়, কারণ তারা দ্রুত বিপুল সম্পদের মালিক বনে যান। কিন্তু সেখানেও প্রমাণের অভাবে তারা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় পুরনো কারবারে লিপ্ত হয়।
রাজনৈতিক সিন্ডিকেট : মাদককারবারিদের দাপটের পেছনে রয়েছে শক্তিশালী রাজনৈতিক মদদ। বিগত বছরগুলোতে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। ওই সিন্ডিকেটের বাইরে গিয়ে কেউ কোনো কাজ করতে পারেনি। অবৈধ পথে মাদকপাচার, বিভিন্ন বারের জন্য বিদেশী মদ আমদানি কোনো কাজই সিন্ডিকেটের বাইরে ছিল না। অভিযোগ রয়েছে এখনো সেই একই সিন্ডিকেটের সদস্যরা বহাল তবিয়তে কাজ করে যাচ্ছে। তবে তাদের সাথে নতুন করে বর্তমান সরকারের আস্থাভাজন পরিচয়ে যুক্ত হচ্ছে অনেক। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা মাদক আমদানিতে নিয়মনীতির তোয়াক্কা করে না। অভিযোগ রয়েছে, যেসব সৎ কর্মকর্তা এ সিন্ডিকেটের টুঁটি চেপে ধরার চেষ্টা করেন, তাদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো থেকে শুরু করে বদলি করার জন্য লাখ লাখ টাকা ঢালা হয়। অভিযানগুলোকে দুর্র্বল করতে দায়ের করা হয় একের পর এক মামলা।
বন্ডেড ওয়্যারহাউজ ও ডিউটি ফ্রি শপের আড়ালে অবৈধ মদ : অনুসন্ধানে আরো দেখা গেছে, ডিপ্লোম্যাটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউজ ও ডিউটি ফ্রি শপগুলোকে কেন্দ্র করে একটি বিশাল মাদক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী, মদ আমদানির প্রতিটি ধাপে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অনুমোদন এবং পোর্টে খালাসের সময় অনাপত্তিপত্র বাধ্যতামূলক। এমনকি পণ্য গুদামে আনার পর কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে কার্টন খোলার নিয়ম থাকলেও এই সিন্ডিকেট তা মানছে না। ফলে নিষিদ্ধ মাদক যেমন বাজারে ঢুকছে, তেমনি সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।
রেস্তরাঁর আড়ালে সিসা বার : রাজধানীর বিভিন্ন আভিজাত এলাকায় রেস্টুরেন্টের আড়ালে চালানো হচ্ছে ভয়ঙ্কর সিসা বার। বিশেষ করে বনানীতে অন্তত ২৫টি সিসা বার রয়েছে, যার একটিরও বৈধ লাইসেন্স নেই। এখানেই আইনের একটি বড় ফাঁক রয়েছে। আইনে নিকোটিনের পরিমাণ ০.২ শতাংশের নিচে থাকলে সেটিকে অবৈধ বলা কঠিন। অভিযানে গেলে মালিকরা নিজেদের ‘সাধু’ সাজিয়ে এই পয়েন্ট ২-এর দোহাই দিয়ে বলে থাকে তারা পয়েন্ট ২-এর নিচে সিসা সার্ভ করছেন; কিন্তু বাস্তবে এসব বারে নিকোটিনের মাত্রা অনেক বেশি থাকে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে গেলেই মালিকপক্ষ ওই আইনের দোহাই দিয়ে আদালতে রিট করে সেটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে।
দায়িত্বশীলদের বক্তব্য : মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ডেপুটি ডিরেক্টর (উত্তর) শামীম আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ নিজে মাদক উৎপাদন না করলেও এর তিন দিকে থাকা প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে প্রতিনিয়ত মাদক ঢুকছে। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকা দিয়ে আসা মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে হলে উন্নত প্রযুক্তি এবং আরো জনবল প্রয়োজন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মাদকবিরোধী অভিযানে তেমন বাধ্যবাধকতা নেই। তবে লাইসেন্সসংক্রান্ত বিষয়ে অভিযানে গেলে সেটি অধিদফতরকে জানানো প্রয়োজন।



