বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সঙ্কট ও বিনিয়োগ স্থবিরতার চাপে, অন্য দিকে তরুণ জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, তখন কর্মসংস্থান প্রশ্নটি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। বিশেষ করে জেনারেশন জেড বা জেন-জিয়াদের বয়স ১৩ থেকে ২৮ বছরের মধ্যে- এই জনগোষ্ঠীই আগামী এক দশকের শ্রমবাজার ও ভোটব্যাংকের বড় অংশ। এই বাস্তবতায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার গঠন করতে পারলে প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির দাবি, এটি কোনো তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সেøাগান নয়; বরং বিনিয়োগনির্ভর, কর্মসংস্থানমুখী একটি অর্থনৈতিক মডেলের অংশ। তবে প্রশ্ন থেকে যায়- এই এক কোটি চাকরি আসবে কীভাবে, কোন খাত থেকে, এবং বাস্তবতার সাথে এই প্রতিশ্রুতির ফারাক কতটা?
কর্মসংস্থান বনাম প্রবৃদ্ধি : বিএনপির দর্শন কী?
বিএনপির নেতারা বলছেন, বিগত সময়ের উন্নয়ন ছিল ‘জবলেস গ্রোথ’। অর্থাৎ জিডিপি বেড়েছে, বড় বড় মেগা প্রকল্প হয়েছে, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। বিএনপির পরিকল্পনার মূল দর্শন হলো- প্রবৃদ্ধির সুফল সরাসরি মানুষের হাতে পৌঁছাতে হবে, আর তার প্রধান মাধ্যম হবে চাকরি সৃষ্টি।
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মতে, তরুণদের কর্মক্ষম ও কর্মোপযোগী না করতে পারলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। তাই বিএনপির কর্মসংস্থান পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে জেন-জি। আত্মকর্মসংস্থান, সরকারি ও বেসরকারি খাতের চাকরি এবং বিদেশে কর্মসংস্থান- এই তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে এক কোটি চাকরির হিসাব তৈরি করা হয়েছে।
১ কোটি চাকরির অঙ্ক : খাতভিত্তিক হিসাব
বিএনপির পরিকল্পনায় তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতকে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থান ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। দক্ষতা উন্নয়ন, আইটি ট্রেনিং, ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ও ডিজিটাল সার্ভিসে তরুণদের যুক্ত করার মাধ্যমে বড় আকারের কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব বলে দলটির ধারণা। বিশ্ববাজারে আউটসোর্সিং ও রিমোট কাজের প্রবণতা বাড়ছে- এই সুযোগ কাজে লাগাতে চায় বিএনপি।
তৈরী পোশাক শিল্পের পাশাপাশি নতুন নতুন উৎপাদন খাত গড়ে তোলার কথাও রয়েছে পরিকল্পনায়। বিএনপির নেতারা মনে করেন, একসময় গার্মেন্ট শিল্প যেমন লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছিল, তেমনি নতুন শিল্পখাত- লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, চামড়া, ফার্মাসিউটিক্যালস, প্লাস্টিক ও ভ্যালু-অ্যাডেড কৃষিপণ্য- নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হতে পারে।
কৃষি খাতেও বড় কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা দেখছে দলটি। আধুনিক কৃষি, অ্যাগ্রো-প্রসেসিং, কোল্ড স্টোরেজ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং কৃষিপণ্যের রফতানি বাড়ানোর মাধ্যমে গ্রামীণ কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের কথা বলছে বিএনপি। এতে গ্রাম থেকে শহরমুখী চাপও কিছুটা কমবে বলে তাদের ধারণা।
পর্যটন খাতকে এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি বলে মনে করে বিএনপি। অবকাঠামো উন্নয়ন, হোটেল-রিসোর্ট, পরিবহন ও সেবা খাতের সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই খাত থেকেও উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান আসতে পারে। পাশাপাশি বিদেশে কর্মসংস্থান- বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ায়- এক কোটি চাকরির হিসাবের একটি বড় অংশ।
বিনিয়োগ ছাড়া কি সম্ভব?
বিএনপির গবেষণা উইং বিএনআরসির সাথে যুক্তরা বলছেন, অর্থনীতি এগিয়ে নেয়ার তিনটি পথের মধ্যে বিনিয়োগভিত্তিক পথই সবচেয়ে টেকসই। টাকা ছাপানো বা ঋণনির্ভর উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে দুর্বল করে। তাই বিএনপির মূল লক্ষ্য দেশীয় ও বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা।
এ ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, লাইসেন্স ও কারেন্সি সংক্রান্ত সমস্যা দূর করা, বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন এবং ইপিজেড ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে দলটি। বিএনপির দাবি, অতীতে বেসরকারি খাতের বিকাশ ও বাজারভিত্তিক অর্থনৈতিক সংস্কারের বড় সিদ্ধান্তগুলো তাদের সময়েই নেয়া হয়েছিল।
পরিকল্পনার বাহির : বাস্তবতার কঠিন প্রশ্ন
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি একটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। বড় বিনিয়োগ বাস্তবে আসতে সময় লাগে, শিল্প স্থাপন ও সম্প্রসারণেও লাগে নীতিগত স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক নিশ্চয়তা। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সঙ্কট ও ডলার সঙ্কট- সব মিলিয়ে চ্যালেঞ্জ কম নয়।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো- এই চাকরিগুলো কতটা টেকসই ও মানসম্মত হবে? আত্মকর্মসংস্থান ও অস্থায়ী কাজকে চাকরির হিসাবে ধরলে সংখ্যার হিসাব পূরণ সহজ হতে পারে, কিন্তু তরুণদের প্রত্যাশা অনুযায়ী আয়, নিরাপত্তা ও ক্যারিয়ার গঠনের সুযোগ তৈরি করা কঠিন।
তরুণরা কী চায়?
বাংলাদেশের প্রায় ২৮ শতাংশ মানুষ ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী- সংখ্যায় প্রায় চার কোটি ৬০ লাখ। এই তরুণ জনগোষ্ঠী শুধু চাকরির সংখ্যা নয়, চাকরির মান, সম্মান ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা চায়। বিএনপির পরিকল্পনা সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।



