নিজস্ব প্রতিবেদক
- ১০৫ জনের লাশের দাবিদার পাওয়া যায়নি
- ৯টি আবেদনকারীর মধ্যে ৮ জনের পরিচয় শনাক্ত, ১টি প্রক্রিয়াধীন
- দেড় বছরের পর হারানো সন্তানের ঠিকানা পেয়ে মায়ের আহাজারি
চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছিলেন তাদের মধ্যে ১১৪ জনের পরিচয় না পাওয়া যাওয়ায় ‘অজ্ঞাত পরিচয়’ বেওয়ারিশ হিসেবে রায়েরবাজার কবরস্থানে লাশ দাফন করা হয়েছিল। কবরের পাশে পরিচয় হিসেবে ছিল শুধু একটি নম্বর। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায় মাত্র আটজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। গতকাল সেই ভয়াল ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে নিহত আটজনের স্বজনরা পরিচয় নিশ্চিত হয়ে সান্ত্বনা হিসেবে আল্লাহও দরবারে শুকরিয়া আদায় করে শুধু একটি কথাই বলেন, ‘হে আল্লাহ, তুমি আমার সন্তানের পরিচয় দিয়েছ, তোমার কাছে চীরকৃতজ্ঞ।’ ‘আল্লাহ তুমি আমার সন্তানকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করো।’
গতকাল স্বজনরা কবরের পাশে কান্না করছিলেন। তখন সেখানকার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। তাদের কান্নায় অনেকে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
সিআইডি জানায়, উত্তোলনকৃত লাশের ডিএনএ সংগ্রহ করা হয়েছে। কেউ লাশের দাবি করলে সেটি বিবেচনায় নেয়া হবে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, উত্তোলনকৃত লাশের বেশির ভাগই ছিন্নমূল শিশু-কিশোর।
সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো: ছিবগাত উল্লাহ বলেন, সিআইডির ডিএনএ ল্যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ৯টি আবেদনকারীর মধ্যে আটটি শহীদ পরিবারের প্রিয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে এবং বাকি একটি লাশের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া দ্রুতগতিতে চলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিআইডির এক কর্মকর্তা বলেন, উত্তোলনকৃত লাশ থেকে যে ডিএনএ সংগ্রহ করা হয়েছে তা দীর্ঘ সময় সিআইডির সংরক্ষণে থাকবে। যে কেউ লাশের দাবিদার হিসেবে আবেদন করলে সাথে সাথে বিবেচনায় নেয়া হবে। ডিএনএ ম্যাচ করলে পরিবারের কাছে ওই লাশ হস্তান্তর বা নম্বরকৃত কবরের ঠিকানা জানিয়ে দেয়া হবে। লাশগুলোর পরিচয় শনাক্তের মাধ্যেমে শহীদদের মর্যাদা রক্ষা, ভবিষ্যতের বিচারিক ও অনুসন্ধানমূলক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলেও মনে করেন সিআইডির এই কর্মকর্তা।
রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফনকৃত লাশের বেশির ভাগই ছিন্নমূল শিশু কিশোর বলে দাবি করেন সেই সময়ে মোহাম্মদপুরে দায়িত্ব পালনকালী এক পুলিশ কর্মকর্তা।
দেড় বছর পর প্রিয় সন্তানের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি উত্তরায় নিহত ফয়সাল সরকারের মা হাজেরা বেগম। কবরের মাটি জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন, সেই মাটির ভেতরেই চির নিদ্রায় শুয়ে আছে সন্তান। তার পাশে যাত্রাবাড়ীতে নিহত সোহেল রানার মা রাশেদা বেগম ছেলের কবরের সামনে বসে পড়েন। কাঁপা গলায় বলেন, ‘বাবা, তুই আমাকে কিছুই বলে গেলি না। আমার পায়ে তেল মালিশ করে ঘুমিয়ে রেখে গেলি। বাবা, আর তোরে পাইলাম না।’
মোহাম্মদপুরে নিহত মাহিমের মা জোসনা বেগম আর তার স্ত্রী কবরের মাটিতে পানি ঢালছিলেন নীরবে। চোখের পানি আর পানির ফোঁটা এক হয়ে যাচ্ছিল বালুর ওপর। কেউ কবরের পাশে লাগানো ছোট গাছে হাত বুলাচ্ছিলেন যেন গাছটার ভেতর দিয়েই সন্তানের স্পর্শটা অনুভব করা যায়।
উপদেষ্টারা যা বললেন : লাশ শনাক্তকরণ কার্যক্রম ও তার ফলাফল উপস্থাপন করেন শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। তিনি বলেন, মিনেসোটা প্রটোকল মেনে এখানে কবরস্থ হওয়া ১১৪ জনের লাশ উত্তোলন ও ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। তার মধ্যে শনাক্ত আটজন জুলাই যোদ্ধার পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। আরো একজনের পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া চলমান। বাংলাদেশে কখনো এত সংখ্যক লাশ একসাথে কবর থেকে তোলা হয়নি।
উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, এখানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হওয়া জুলাই যোদ্ধাদের পরিচয় ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠাকে রাষ্ট্র তার নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব বলে মনে করে। সেই গুরুদায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবেই অজ্ঞাতনামা শহীদদের পরিচয় শনাক্তকরণে একটি পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম (বীর প্রতীক) বলেন, এই শনাক্তকরণের ফলে শহীদদের পরিবারগুলো অন্তত জানতে পারছে তাদের প্রিয়জনদের ভাগ্যে কী ঘটেছে বা তারা কোন স্থানে শায়িত আছে। এটা তাদের জন্য ও জাতির জন্য এক বিরাট মানসিক শান্তির কারণ।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ডা: সায়েদুর রহমান বলেন, ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের মতো সংবেদনশীল কাজগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সম্পন্ন করা হয়েছে।
পরিচয় শনাক্ত হওয়া ৮ জন : মো: মাহিন মিয়া (৩০)। তার বাবার নাম গাজী মামুদ ও মায়ের নাম জোসনা বেগম। মাহিনের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলপুর থানার ফুলপুর গ্রামে। মাহিন মারা যান ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই। তার জন্ম ১৯৯৪ সালে। আসাদুল্লাহ (৩১); তার বাবা মৃত আব্দুল মালেক এবং মায়ের নাম আশেয়া বেগম। শহীদ আসাদুল্লাহর গ্রামের বাড়ি শেরপুর জেলার শ্রীবর্দী থানায়। আসাদুল্লাহ মারা গেছেন ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই; তার জন্ম ১৯৯৩ সালে। পারভেজ বেপারী (২২); বাবা সবুজ বেপারী ও মা শামসুন্নাহার। গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার মতলব থানার বারোহাটিয়া গ্রামে। ২০০২ সালে জন্ম নেয়া পারভেজ মারা গেছেন ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। রফিকুল ইসলাম (৫১); বাবা মৃত আব্দুল জব্বার শিকদার। রফিকুল ইসলামের বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুর থানার সাতকাছিনা গ্রামে। ১৯৭৩ সালে জন্ম নেয়া রফিকুল মারা গেছেন ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। সোহেল রানা (৩৭); বাবা মৃত মো: লাল মিয়া ও মা রাশেদা বেগম। তার বাড়ি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থানায়। সোহেল রানার জন্ম ১৯৮৭ সালে; মারা গেছেন ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই। রফিকুল ইসলাম (২৮); বাবা মৃত খোরশেদ আলম। রফিকুলের বাড়ি ফেনী জেলায়। ১৯৯৬ সালে জন্ম নেয়া এই তরুণ মারা গেছেন ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। ফয়সাল সরকার (২৫); তার বাবার নাম শফিকুল ইসলাম। ফয়সালের বাড়ি কুমিল্লার দেবিদ্বার থানার কাচিমারা গ্রামে। ফয়সালের জন্ম ১৯৯৯ সালে; তিনি মারা গেছেন ২০২৪ সালের ২২ জুলাই। ৫৮ বছর বয়সী কাবিল হাসানের বাবা মৃত বুলু মিয়া, মায়ের নাম ছামেনা বেগম। তার বাড়ি ঢাকার মুগদা থানার গলিতে। তিনি মারা গেছেন ২০২৪ সালের ২ আগস্টে।
জানা গেছে, শনাক্ত হওয়া জুলাই যোদ্ধারা ছিলেন কেউ কাপড় ব্যবসায়ী, কেউ শ্রমজীবী, কেউ তরুণ, কেউ সংসারের একমাত্র ভরসা।



