গণভোট প্রশ্নে দুই শিবিরে রাজনীতি

নির্বাচন ও আসন্ন গণভোটকে ঘিরে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে মেরুকরণ। এক দিকে গণভোটের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তাদের দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সহযোগী জাতীয় পার্টি (জাপা), অন্য দিকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার এবং জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১ দলীয় জোট। এই দুই পক্ষের টানাপড়েনে এখনো অস্পষ্ট অবস্থানে রয়েছে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

  • জামায়াত-এনসিপি জোট ‘হ্যাঁ’-এর প্রচারণায়
  • এখনও দোটানায় বিএনপি
  • ‘না’-এর পক্ষে সরব আ’লীগ-জাপা ও মিত্ররা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আসন্ন গণভোটকে ঘিরে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে মেরুকরণ। এক দিকে গণভোটের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তাদের দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সহযোগী জাতীয় পার্টি (জাপা), অন্য দিকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার এবং জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১ দলীয় জোট। এই দুই পক্ষের টানাপড়েনে এখনো অস্পষ্ট অবস্থানে রয়েছে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি।

মাঠপর্যায়ে প্রচারণা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বয়ান তৈরি এবং বিভিন্ন এলাকায় বিব্রতকর পরিস্থিতি- সব মিলিয়ে গণভোটকে কেন্দ্র করে রাজনীতির উত্তাপ দিনে দিনে বেড়েই চলেছে।

গণভোটের বিপক্ষে আওয়ামী লীগ ও জাপা

এত দিন গণভোটের বিপক্ষে অবস্থান মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ ছিল আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে। ফেসবুক, ইউটিউব ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তারা ধারাবাহিকভাবে গণভোটকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। বিভ্রান্তিকর নানা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।

অভিযোগ আছে, তারা প্রচার করছে- গণভোট হলে সংসদ নির্বাচন বাতিল হয়ে যাবে, গণভোটের মাধ্যমে দেশের সংবিধান পরিবর্তন করে ‘অরাজকতা’ সৃষ্টি করা হবে, কিংবা এটি বিদেশী শক্তির চাপিয়ে দেয়া কোনো এজেন্ডা। কোথাও কোথাও তারা দাবি করছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে পড়বে। ধর্মীয় কার্ডও খেলছে আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগীরা। তাদের মধ্যে একটি পক্ষ অপপ্রচার করছে- গণভোট মানে স্বাধীনতার বিপক্ষে, সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকবে না, বিসমিল্লাহ থাকবে না, আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস কমবে।

১১ দলীয় জোটের ‘হ্যাঁ’ প্রচারণা

অন্য দিকে, গণভোট শুরু থেকেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। সময়ের সাথে সাথে এই অবস্থান আরো বিস্তৃত হয়ে ১১ দলীয় জোটে রূপ নিয়েছে, যা এখন মাঠে একটি সুসংগঠিত ও দৃঢ় গণভোট সমর্থক শিবির হিসেবে পরিচিত। এই জোট শুধু সংসদ নির্বাচনে নিজ নিজ দলীয় বা জোটের প্রতীকে ভোট চাইতেই সীমাবদ্ধ নয়, তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনমত গঠনের ক্ষেত্রেও সক্রিয়। তারা বিভিন্ন শহর ও গ্রামে সভা-সমাবেশ, উঠান বৈঠক, সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করছে। লিফলেট, প্রচারপত্র এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে তারা সাধারণ মানুষকে সচেতন করছে, গণভোটকে শুধু আইনগত প্রক্রিয়া হিসেবে নয় বরং জুলাই ২০২৪-এর অর্জন ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে উপস্থাপন করছে।

জোটের এই প্রচারণা স্থানীয় স্তরে বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তারা জনগণকে বোঝাচ্ছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়া মানে শুধু নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়া নয়, বরং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতা রক্ষা ও দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এ ছাড়া তারা শিক্ষিত তরুণ, নাগরিক সংগঠন এবং সম্প্রদায় ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সমন্বয় করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই জোটের সক্রিয় প্রচারণা জনগণের মধ্যে গণভোট সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করছে এবং ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বিএনপির দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থান

তবে এই দুই শিবিরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বিএনপি। এখন পর্যন্ত দলটির পক্ষ থেকে গণভোট প্রশ্নে কোনো সুস্পষ্ট ও আনুষ্ঠানিক অবস্থান ঘোষণা করা হয়নি। প্রচারণার মাঠে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের গণভোটের পক্ষে বা বিপক্ষে সরাসরি বক্তব্য প্রকাশিত হয়নি। বরং কিছু এলাকায় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিপক্ষে প্রচারণার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর বিপক্ষে থাকার সুযোগ নেই। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানসহ কয়েকজন সিনিয়র নেতা ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নিশ্চিত করেছেন। তবুও ভোটের মাঠে কিছু নেতার বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা হচ্ছে।

উদাহরণস্বরূপ, রাজশাহীর একজন বিএনপি নেত্রী ধানের শীষ প্রতীকে ভোট চাইতে গিয়ে গণভোটে ‘না’ ভোটের পক্ষে কথা বলেছেন। তার বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। তিনি বলেছেন, গণভোটে ‘না’ মানে বিএনপি এবং ‘হ্যাঁ’ মানে জামায়াত।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমেদও ২১ জানুয়ারি লালমোহনে বলেছেন, গণভোটের আইনগত কোনো ভিত্তি নেই। একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী এটি জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে।

সরকারের ‘হ্যাঁ’ প্রচারণা

অন্তর্বর্তী সরকার গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে মাঠে নেমেছে। উপদেষ্টা, প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মহানগর, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ধারাবাহিক প্রচারণা ও মতবিনিময় সভা চলছে।

শিল্প, গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, ‘সরকার গণভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। যারা প্রশ্ন তুলছে তারা মূলত পলাতক শক্তি। যারা জুলাই-আগস্টে আত্মহুতি দিয়েছেন, তাদের সহযোদ্ধাদের উদ্যোগেই জুলাই সনদ প্রণয়ন হয়েছে। এই সনদ বাস্তবায়নের জন্যই গণভোটের আয়োজন।’

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘গণভোটে ‘হ্যাঁ’ প্রচারণা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। যারা রক্ত দিয়েছেন, তাদের স্বজনদের স্বার্থে গণভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সংবিধান বা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত অধ্যাদেশে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা ইতিবাচক প্রচারণা করতে পারবে না এমন কোনো বিধান নেই।’

বিশ্লেষণ : বিভক্ত রাজনীতি

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বড় দল হিসেবে বিএনপির পক্ষ থেকে পরিষ্কার অবস্থান না আসায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, যদি বিএনপি প্রকাশ্যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে কথা বলতো, তা হলে মাঠের চিত্র আরো স্পষ্ট হতো। আবার অনেকে মনে করছেন, বিএনপি কৌশলগতভাবে সময় নিচ্ছে- পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত জানাতে পারে।

সব মিলিয়ে, গণভোট প্রশ্নে রাজনীতির মাঠ এখন স্পষ্টভাবে দুই ভাগে বিভক্ত-

  • এক পাশে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে ‘না’ ভোটের প্রচারণা,
  • অন্য পাশে অন্তর্বর্তী সরকার ও ১১ দলীয় জোটের ‘হ্যাঁ’ ভোটের ডাক।

মধ্যবর্তী অবস্থান ও দ্বিধার কারণে বিএনপি গণভোটের রাজনীতিকে আরো জটিল ও অস্পষ্ট করে তুলেছে।

গণভোটের প্রেক্ষাপট ও আইনি ভিত্তি

জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর আইনি ভিত্তি অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।

  • পূর্ববর্তী দুটি গণভোটে সরকারের অবস্থান সব সময় ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ছিল।
  • গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সরাসরি মতামত জানা যাবে এবং এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করবে।
  • সরকার প্রচারণায় আইনগত বাধা নেই- শীর্ষ প্রশাসন ও উপদেষ্টারা সভা-সমাবেশে জনগণকে সচেতন করছেন।