নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা আজো প্রেরণা দেয়

Printed Edition
নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা আজো প্রেরণা দেয়
নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা আজো প্রেরণা দেয়

দীপান্বিতা পালিত

কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। আজ থেকে ঠিক ১০০ বছর আগে রচিত এই কবিতা এখনো প্রাসঙ্গিক। ১০০ বছর পরেও সেই কবিতার আবেদন ফুরায়নি, রয়ে গেছে আগের মতোই। মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি রচনা করেন প্রায় ১৫০ পঙ্ক্তির এই ভুবনবিজয়ী কবিতা।

বাংলাদেশের জাতীয় কবি ও সর্বমানবিক মুক্তির প্রবক্তা কাজী নজরুল ইসলামের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কবিতা বিদ্রোহী। ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে এই কবিতাটি রচিত হয়েছিল। সমূলক হোক আর অমূলক হোক, বিদ্রোহের কোনো স্বীকৃত ব্যাকরণ নেই। বিদ্রোহ স্বতঃস্ফূর্ত স্বতোৎসারিত, সর্বগ্রাসী ও সংক্রামক।

বিদ্রোহী কবিতায় নজরুলের বিদ্রোহ চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। ভারতীয় এবং পশ্চিম এশীয় পুরাণ ও ইতিহাসের আধার থেকে শক্তি সঞ্চয় করে নজরুল এখানে প্রবল বিদ্রোহ বাণী উচ্চারণ করেছেন। নজরুল বিদ্রোহ করেছেন ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে, শৃঙ্খলপরা আমিত্বের বিরুদ্ধে। এই কবিতা রচনার জন্য নজরুল ‘বিদ্রোহী কবির আখ্যা পেয়েছেন। এখানে নজরুল তার বিদ্রোহকে সঙ্গত কারণেই ‘আমি’ প্রতীকে ব্যঞ্জনাময় করেছেন এবং নিজেকে অজেয় বলে উপলব্ধি করেছেন। তাইতো বিদ্রোহী আত্মশক্তিকে উদ্বোধিত করার লক্ষ্যে প্রথমেই কবির সরব ঘোষণা : ‘বল বীর বল উন্নত মম শির!’ নজরুল এই কবিতার প্রথম স্তবকেই প্রসঙ্গত উত্থাপন করেছেন মহাবিশ্ব, মহাকাশ, চন্দ্রসূর্য, গ্রহতারা, ভূলোক দ্যুলোক, খোদার আসন, বিশ্ববিধাত্রী, চির বিস্ময়, রাজটীকা, রুদ্র ভগবান আর দীপ্ত জয়শ্রীর কথা।

বক্তব্যের অনুক্রম অনুযায়ী কবিতাটিকে মোট দশটি স্তবকে ভাগ করা যায়। প্রথম স্তবকে আমি’র শক্তিমত্তার পাশাপাশি রয়েছে বিজয়ের প্রত্যয়, আর এই বিজয়ের জন্য প্রয়োজন আঘাতকারীর। আমি’র ধ্বংসাত্মক রূপ, যা কবিতাটির ১১ থেকে ২৭ পঙ্ক্তি পর্যন্ত ঘূর্ণিত : ‘আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণি। আমি পথ সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি। শক্তির উদ্বোধন ও সংহারচিত্রের পরই হঠাৎ শুরু হলো মিলনের নৃত্যপাগল ছন্দ। ২৮ থেকে ৩৭ পঙ্ক্তি পর্যন্ত আমি এমন এক মুক্ত জীবনানন্দ, যে শত্রুর সাথে গলাগলি করে, আবার মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে। কিন্তু মিলনের এই আকাক্সক্ষার পর পরবর্তী দুই পঙ্ক্তিতে ‘আমি’ আবার মহামারী, ভীত, শাসন-ত্রাসন ও সংহাররূপে আবির্ভূত। তার পর ৪২ থেকে ৫১ সংখ্যক পঙ্ক্তিতে আবার আছে উদ্দাম ইতিবাচকতা, হোমশিখা, উপাসনা, নিশাবসানের আকাক্সক্ষা। আর এই অংশের ৪৯ তম পঙ্ক্তিতেই আছে সেই জাদুকরী সরল স্বীকারোক্তি : মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণতূর্য।

এই কবিতার ছত্রে ছত্রে পৌরাণিক রূপকের ব্যবহার এতটাই যথার্থ যে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। রূপকের প্রয়োগ দেখে যে কেউ আঁচ করতে পারবেন, গ্রিক আর ইন্ডিয়ান মিথের ওপর কবির কতটা দখল ছিল।

সমাজের অসাম্যের বিরুদ্ধে কবির বিদ্রোহী সত্তা কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিচিত্তে বিদ্রোহী চেতনা প্রকাশ পেয়েছে। তিনি পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে ঘুমন্ত দেশ ও জাতিকে মুক্ত করার জন্য নিজে যেমন বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন, তেমনি জাতিকে জাগিয়ে তুলতে প্রয়াস পেয়েছেন। কবি জরাজীর্ণ পুরনো সমাজ ও রীতিনীতি ভেঙে নতুন দেশ ও জাতি গড়তে তার কাব্যে ভাঙনের খেলা খেলেছেন। কবি পরাধীনতার বিরুদ্ধে, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। সমকালীন যুগ, তার রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্ত সংশয়, দ্বিধা, অনিশ্চয়তা, অবক্ষয় সুকান্তর কবিসত্তা গড়ে তুলেছে। তার কবিতায় উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনা প্রতিফলিত হয়েছে। বিদ্রোহী কবিতায়ও দেখা যায় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দ্বারা পদদলিত এ দেশ দীর্ঘকাল শাসন, শোষণ, অন্যায়, অবিচার আর বৈষম্যের পঙ্কিলতায় আচ্ছন্ন থেকেছে। সমাজ সচেতন কবি এ সমাজ ও রাষ্ট্রের অবিচার এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিপ্লবী মনের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কবিতায় কবির এই বিদ্রোহ ও প্রতিবাদ উচ্চকিত থাকবে যত দিন না তার মূল উৎপাটিত হয়।

বর্তমান সময়ে নানা রকম অসাম্যের ভিড়ে আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করি ‘ বিদ্রোহী’ কবিতার প্রাসঙ্গিকতা ও তার অমøান তাৎপর্যের কথা। উপনিবেশবাদের অবসান ঘটলেও বিশ্বায়নের শৃঙ্খল আর ধনতন্ত্রের শোষণ বঞ্চনা অত্যাচার নির্যাতনসহ আর্থসামাজিক বৈষম্য সব কিছুই বলবৎ আছে। অত্যাচারীর কৃপাণের তলে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল এই বাংলার আকাশে-বাতাসে আজো প্রতিনিয়ত ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়। অন্য দিকে মানুষের শক্তির প্রতি, তার বীরত্বের প্রতি অনাস্থাও সমানভাবে অটুট। তাই নজরুলের ভাষায়- শান্ত থাকার অবকাশ মিলছে চতুষ্পর্শের প্রতিবাদহীন মেরুদণ্ড হীনতার পরিপ্রেক্ষিতে বিপুল কাম্য হয়ে উঠেছে উন্নত মম শির-এর বজ্্রদীপ্ত ঘোষণা। শোষণ পীড়ন আর বৈষম্য থেকে মুক্তির সঙ্কল্প নিয়ে মানুষের আপন শক্তির উদ্বোধন ঘটিয়ে নজরুল কথিত বিদ্রোহের রণে অশ্লীন হওয়ার যেন বিকল্প নেই। সভ্যতার ইতিবাচক অগ্রগমনের প্রয়োজনে যুগে যুগে এই মূর্ত প্রতীক বারবার ভিন্ন ভিন্ন অভিব্যক্তিতে আবির্ভূত হতে পারে। বিশ্বব্যাপী বিদ্রোহীর এই মঙ্গলশক্তির জয় হোক।