চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রাম নগরীতে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের অফিসে ঢুকে প্রকাশ্যে তাণ্ডবের ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। গতকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি), চট্টগ্রাম বিভাগ। এতে তারা দাবি করেন, ঘটনার পর থেকে ডিডিএনসহ অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা-র্কমচারীরা কাজে ফিরতে ভয় পাচ্ছে। এ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে না পারলে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা প্রদান ব্যাহত হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন সংগঠনটির চট্টগ্রাম বিভাগের আহ্বায়ক রাজিব শাহরিয়ার রুবেন্স।
এর আগে ঘটনার দিন (সোমবার) রাতে ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন) নামে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক (হিসাব) মোহাম্মদ শামশুদ্দোহা মিনহাজ চকবাজার থানায় মামলা করেছেন। এতে অজ্ঞাতনামা ৩০-৪০ জনকে আসামি করা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে মুখে মাস্ক পরা হামলাকারীদের স্পষ্ট দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিককে ফোন করে চাঁদা দাবি ও হুমকির অডিও পুলিশ পেয়েছে। এরপরও কাউকে গ্রেফতার করতে না পারায় জনমনে প্রশ্ন জন্ম দিয়েছে।
এ ছাড়া এই ঘটনায় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা: শফিকুর রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দিলে আলোচনা নতুন মাত্রা পায়। এরপর সংবাদপত্রে বিবৃতি পাঠায় চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াত। ঘটনার পর থেকে সোশ্যাল মিডিয়া ও নগরীর পথে-ঘাটে ব্যাপক আলোচনা চলতে থাকে। বলা চলে টক অব দ্য চট্টগ্রামে পরিণত হয়েছে এটি।
চকবাজার থানার ওসি নুর হোসেন মামুন বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে যেভাবে অভিযোগ করা হয়েছে সেভাবেই মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপে কল করে হুমকিদাতা তার নাম ডেভিড ইমন বলেছিলেন। ইমনের নাম আসামির তালিকায় না থাকলেও মামলার সারসংক্ষেপে আছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন প্রতিষ্ঠানটির মালিক আদিল বিন মামুনকে গত শনিবার একটি বিদেশী নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়ে এককালীন দুই কোটি টাকা ও প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করেন। অন্যথায় ব্যবসা বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দেন। এর একদিন পর সোমবার দুপুরে নগরীর চকবাজার থানার বাকলিয়া এক্সেস রোডে মরিয়ম হাইটসের তৃতীয় তলায় ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন) অফিসে নির্বিচারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ডেভিড ইমনের সাথে ফোনকলে প্রতিষ্ঠানের মালিক চাঁদা দিতে অসম্মতি জানান। এর দুই দিনের মাথায় সোমবার দুপুর সোয়া ১২টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ৩০-৪০ জন সন্ত্রাসী অতর্কিতে তাদের অফিসে ঢুকে তাণ্ডব চালায়। সন্ত্রাসীরা চারটি ডেস্কটপ, চারটি ল্যাপটসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ও অফিসের দরজা ভাঙচুর করে। এতে প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের অন্যতম পরিচালক আরিফুল ইসলামের ব্যাগ থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদ রাখা নগদ ৩৫ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায়।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) হাবিবুর রহমান প্রামাণিক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আপাতত কারো নাম বলতে চাচ্ছি না। অভিযান চলছে।’
এ দিকে মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ব্যবসায়ীরা বলেন, ডিডিএন অফিসে হামলার ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ ধরনের ঘটনা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; বরং সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আইএসপি মালিক ও প্রতিষ্ঠানের কাছে চাঁদা দাবি, টেলিফোনে হুমকি প্রদান, চাপ সৃষ্টি ও হামলার মতো ঘটনা ঘটছে। এর পুনরাবৃত্তি ঘটলে সমগ্র আইএসপি শিল্প নিরাপত্তা সঙ্কটে পড়বে। বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্প-কারখানা, ব্যাংকিং, ই-কমার্স, সরকারি ও বেসরকারি প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং নাগরিক সেবার অন্যতম মৌলিক অবকাঠামো। আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নিরাপদে কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারে তবে এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু একটি শিল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দেশের সামগ্রিক ডিজিটাল অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা অবিলম্বে হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনা, দেশের সব আইএসপি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় মতো বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানান। সংবাদ সম্মেলনের পর তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। এ সময় তারা ব্যানার-ফেস্টুনে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণার দাবি জানান।



