আসাদুল ইসলাম সবুজ, লালমনিরহাট
তিস্তার উত্তাল স্রোত আর ভাঙন লালমনিরহাটের চরাঞ্চলের মানুষের নিত্যসঙ্গী। দারিদ্র্য আর বঞ্চনার সেই ধূসর বালুচরেই এখন রঙিন স্বপ্ন বুনছে একদল শিশু। প্রতিকূল পরিবেশে বেড়ে ওঠা এসব শিশুর ‘ছায়া অভিভাবক’ হয়ে দাঁড়িয়েছে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ-‘লালমনি বিদ্যাপীঠ’। কোনো বড় দাতা সংস্থার অর্থায়ন ছাড়াই কেবল তারুণ্যের অদম্য শক্তিতে বদলে যাচ্ছে চরের কয়েক শ’ শিশুর জীবন।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার তরুণ সমাজকর্মী নাঈম রহমান (২১) এই উদ্যোগের কারিগর। আধুনিক সুবিধা থেকে বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের শিশুদের স্কুলছুট হওয়া, শিশুশ্রম ও মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে যাত্রা শুরু করে এই বিদ্যাপীঠ। পথচলা সহজ ছিল না; দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা, কুসংস্কার আর অর্থের অভাব ছিল নিত্যদিনের চ্যালেঞ্জ। তবে দমে যাননি নাঈম ও তার ৩০ জন সহযোদ্ধা। নিজেদের পড়াশোনার খরচ বাঁচিয়ে তারা জ্বালিয়ে রেখেছেন শিক্ষার আলো।
লালমনি বিদ্যাপীঠ কোনো সাধারণ স্কুল নয়। এখানে চার দেয়ালের শ্রেণিকক্ষ বা বাধাধরা পাঠ্যসূচি নেই। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে ছয়টি কেন্দ্রে শিশুদের নিয়ে বসেন স্বেচ্ছাসেবীরা। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা, মানবিক মূল্যবোধ, স্বাস্থ্যজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার আলো পৌঁছে দেয়া হচ্ছে তাদের মধ্যে। পরিচ্ছন্নতা ও শিষ্টাচার শেখানোর পাশাপাশি শিশুদের বড় স্বপ্ন দেখার সাহস জোগাচ্ছে এই বিদ্যাপীঠ।
এই উদ্যোগের সাফল্য চোখে পড়ার মতো। ইতোমধ্যে ৮০০-এর বেশি অভিভাবক তাদের সন্তানদের বাল্যবিবাহ না দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন। অর্ধশতাধিক সচেতনতা ক্যাম্পের মাধ্যমে ঝরে পড়া অনেক শিক্ষার্থীকে আবারো মূল ধারার স্কুলে ফেরানো সম্ভব হয়েছে। ডাউকিচরের বাসিন্দা সালমা বেগম আবেগপ্লত হয়ে বলেন, টাকার অভাবে ছেলেকে পড়াতে পারতাম না। এখন সে এই বিদ্যাপীঠে পড়তে পারছে, নিজের নাম লিখতে শিখছে। আমাদের চরে এটা অনেক বড় পাওয়া।
স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক মাইশা আক্তার বলেন, শহরে বসে চরের জীবন বোঝা যায় না। এখানে এসে শিশুদের চোখে যে মেধা আর আকুতি দেখেছি, তা আমাদের কাজের অনুপ্রেরণা জোগায়।
বিদ্যাপীঠের প্রতিষ্ঠাতা নাঈম রহমান বলেন, ‘চরাঞ্চলের শিশুরা মেধাবী, তারা কেবল সুযোগের অভাবে পিছিয়ে থাকে। আমরা যদি অভিভাবকের মতো তাদের পাশে থাকতে পারি, তবেই তারা নতুন সম্ভাবনার আলো দেখবে। তিস্তার বৈরী প্রকৃতিতেও লালমনি বিদ্যাপীঠের মাধ্যমে নতুন এক ভবিষ্যতের পথে এগোচ্ছে চরের শিশুরা। সেই আলোয় মুছে যাচ্ছে বঞ্চনার অন্ধকার, চরের প্রতিটি শিশুর চোখে এখন উজ্জ্বল আগামীর স্বপ্ন।


