জসিম উদ্দিন রানা
ফুটবল কখনো কখনো নিষ্ঠুর। এমন নিষ্ঠুর যে কোটি কোটি মানুষের একটি ছোট্ট ইচ্ছেও পূরণ করে না। পৃথিবীর দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে এখনো দু’টি নাম সমান আলো ছড়ায়, একজনের বাঁ পা যেন জাদুর তুলি, আরেকজনের শরীর যেন ইস্পাতে গড়া বিজয়যন্ত্র। একজন লিওনেল মেসি, অন্যজন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। অথচ ২০২৬ বিশ্বকাপে তাদের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই। যদি না ভাগ্য শেষ মুহূর্তে এমন এক অলৌকিক গল্প লিখে, যার নাম বিশ্বকাপ ফাইনাল।
ভাবুন তো, কত বছর ধরে এই দুই নাম ফুটবলকে ভাগ করেছে দুই শিবিরে। কারো ঘরের দেয়ালে মেসির পোস্টার, কারো বুকজুড়ে রোনালদোর জার্সি। তর্ক হয়েছে, বন্ধুত্ব ভেঙেছে, আবার ফুটবলও নতুন করে ভালোবাসা শিখিয়েছে এই দুই মহাতারকা। অথচ বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের শেষ লড়াই দেখার সুযোগ হয়তো আর মিলবে না। সময়ের কাছে সবচেয়ে বড় তারকারাও একসময় হার মানেন। মেসির বয়স এখন প্রায় চল্লিøশের কোঠায়, রোনালদোও একই পথে। শরীর এখনো লড়াই করতে চায়, মন এখনও ট্রফির স্বপ্ন দেখে, কিন্তু সময়ের ক্যালেন্ডার কোনো কিংবদন্তির জন্য থেমে থাকে না। ২০৩০ বিশ্বকাপে তাদের দেখা যাবে এমন স্বপ্ন দেখার সাহসও এখন খুব কম মানুষের আছে।
মেসি এবং রোনালদো একে অপরের বিপক্ষে বহুবার মুখোমুখি হয়েছেন। তারা তাদের ক্লাব ক্যারিয়ারে প্রায় ৩৬ বার একে অপরের মুখোমুখি লড়াইয়ে নেমেছেন, যার মধ্যে এল ক্লাসিকো (বার্সেলোনা বনাম রিয়াল মাদ্রিদ) এবং চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে, তারা আন্তর্জাতিক ফুটবলে অর্থাৎ আর্জেন্টিনা এবং পর্তুগালের জার্সিতে কখনোই একে অপরের বিপক্ষে কোনো অফিশিয়াল ম্যাচে বা বিশ্বকাপে মুখোমুখি হননি।
কী অদ্ভুত! প্রায় দুই দশক ধরে ক্লাব ফুটবলে তারা একে অপরের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। স্পেনের এল ক্লাসিকো থেকে শুরু করে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ব্যালন ডি’অরের মঞ্চ সবখানেই একজনের পাশে আরেকজন। যেন একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতাই তাদের আরো মহান করেছে। কিন্তু বিশ্বকাপ? সেখানে ভাগ্য যেন বারবার তাদের আলাদা রাস্তা বেছে দিয়েছে। এ যেন রেল লাইন বহে সমান্তরাল।
ফুটবলপ্রেমীদের আফসোস এখানেই। শেষবারের মতো যদি একটি সন্ধ্যা পাওয়া যেত! একটি ম্যাচ, মাত্র নব্বই মিনিট। একপাশে নীল-সাদা জার্সিতে মেসি, অন্য পাশে লাল-সবুজে রোনালদো। স্টেডিয়ামের আলো নিভে গেলে, প্লেয়ান টানেলের ভেতর দু’জনের চোখাচোখি। করমর্দন। তারপর বাঁশির শব্দ। হয়তো একজন দারুণ একটি ফ্রি-কিক নিতেন, অন্যজন অবিশ্বাস্য এক হেডে গোল করতেন। সেই ম্যাচের ফল কে জিতল, তা হয়তো ইতিহাস মনে রাখত। কিন্তু তার চেয়েও বড় ইতিহাস হতো-দুই মহাতারকার শেষ নৃত্য।
সম্ভবত ফুটবলও এমন গল্প লিখতে চেয়েছিল। কিন্তু নকআউটের কঠিন সমীকরণ, ড্রয়ের ভাগ্য আর প্রতিপক্ষের শক্তি সেই স্বপ্নকে বাস্তব হতে দেয়নি। এখন সমর্থকেরা শুধু ব্র্যাকেটের দিকে তাকিয়ে হিসাব কষে, যদি দু’জনই ফাইনালে ওঠেন? সেই ‘যদি’ শব্দটাই এখন সবচেয়ে মূল্যবান। কিন্তু ফুটবল শুধু বাস্তবের খেলা নয়, কল্পনারও খেলা। আজও অনেক সমর্থক চোখ বন্ধ করে একটি দৃশ্য কল্পনা করেন। বিশ্বকাপের ফাইনাল। অতিরিক্ত সময় চলছে। স্কোর ১-১। মেসি বল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। বিপরীত দিক থেকে রোনালদো সতীর্থদের উজ্জীবিত করছেন। গ্যালারিতে কেউ কাঁদছে, কেউ প্রার্থনা করছে। কারণ তারা জানে, এই ম্যাচের পর আর কখনো এমন দৃশ্য দেখা যাবে না। হয়তো সেটি আর হবে না। হয়তো বিশ্বকাপ ইতিহাসে মেসি-রোনালদোর শেষ মুখোমুখি লড়াই চিরকালই ‘অসম্পূর্ণ স্বপ্ন’ হয়ে থাকবে। কিন্তু তাতেই কি তাদের গল্পের সৌন্দর্য কমে যায়? বরং না। সব মহাকাব্যেরই কিছু অপূর্ণ অধ্যায় থাকে। সেই অপূর্ণতাই তাকে আরো স্মরণীয় করে তোলে।
বহু বছর পর নতুন প্রজন্ম যখন ফুটবলের ইতিহাস পড়বে, তারা গোলের সংখ্যা জানবে, ট্রফির তালিকা মুখস্থ করবে, রেকর্ডও খুঁজে নেবে। কিন্তু প্রবীণ ফুটবলপ্রেমীরা তখন হয়তো নিঃশ্বাস ফেলে বলবেন, ‘জানো, আমরা এমন এক যুগ দেখেছিলাম, যখন পৃথিবীতে একসাথে খেলতেন মেসি আর রোনালদো। শুধু একটা আক্ষেপ, বিশ্বকাপের শেষ মঞ্চে তাদের লড়াই আমরা দেখতে পাইনি।’
আর সেই আক্ষেপই হয়তো প্রমাণ করে, কিংবদন্তিরা কখনো শুধু ম্যাচ খেলেন না, তারা মানুষের হৃদয়ে এমন কিছু স্বপ্ন বুনে যান, যা পূরণ না হলেও সারাজীবন বেঁচে থাকে। কিছু ম্যাচ ইতিহাসে লেখা থাকে, আর কিছু ম্যাচ না খেলেও ইতিহাস হয়ে যায়। মেসি-রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ দ্বৈরথ সম্ভবত তেমনই এক ম্যাচ-যার স্কোরলাইন নেই, অথচ আক্ষেপ কোটি মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী।
বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বহুল প্রতীক্ষিত ‘লাস্ট ড্যান্স’ আর হচ্ছে না। কলম্বিয়ার বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে গ্রুপ রানার্সআপ হওয়ায় পর্তুগাল নকআউটের ভিন্ন পথে চলে গেছে। ফলে কোয়ার্টারে দুই মহাতারকার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে।
সমীকরণ ছিল সহজ। আর্জেন্টিনা ও পর্তুগাল দুই দলই নিজ নিজ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলে কোয়ার্টার ফাইনালে দেখা হতো মেসি-রোনালদোর। কিন্তু পর্তুগালের এক ড্র, সেই স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে। এখন শেষ ৩২-এ রোনালদোর দল খেলবে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে, এরপর সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ স্পেন। অন্য দিকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার সামনে কেপ ভার্দে।
এবারের বিশ্বকাপে মেসি দুর্দান্ত ছন্দে। প্রথম তিন ম্যাচে ছয় গোল করে টানা সাতটি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোলের বিশ্বরেকর্ডও গড়েছেন তিনি। অন্য দিকে রোনালদোও আছেন শিরোপার লড়াইয়ে। ২০৩০ বিশ্বকাপে দু’জনের খেলার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। তাই বিশ্বমঞ্চে তাদের শেষ দ্বৈরথ দেখার আশা এখন টিকে আছে মাত্র একটি সমীকরণে। আর্জেন্টিনা ও পর্তুগাল যদি ফাইনালে ওঠে। তাহলেই কেবল সম্ভব মুখোমুখি হওয়ার।



