জুলাই অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে আইনি সুরক্ষা, বিচার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের মতোই জুলাইযোদ্ধাদের আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা দেয়া হবে এবং গণ-অভ্যুত্থানের সময় জনতার প্রতিরোধে যারা নিহত হয়েছেন, তা যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা হিসেবে বিবেচিত হবে।
গতকাল সোমবার ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের চতুর্থ দিনে প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকারের এ অবস্থান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, জুলাইযোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা থাকবে। সব দলের ঐকমত্যে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের অঙ্গীকারনামা মেনে চলবে সরকার। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার রাজাকার হত্যার বিচার যেমন সম্ভব নয়, তেমনি জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ে জনগণের প্রতিরোধে যারা নিহত হয়েছেন, তা যুদ্ধের ময়দানের বিচার। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন এমপি সম্পূরক প্রশ্নে জানতে চান, গত ১৬ বছর পুলিশ বাহিনীর যারা আইন অমান্য করে যা কিছু করেছে, জুলাইয়ে যারা স্বপ্রণোদিত হয়ে হত্যাযজ্ঞে অংশ নিয়েছে, মানুষের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন করেছে, এর বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিভাগীয় পদক্ষেপ নেবে কি না? আওয়ামী লীগ ‘পুলিশ হত্যার’ নামে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে- এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ আছে কি না তাও জানতে চান তিনি।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাইযোদ্ধাদের আইনি এবং সাংবিধানিক সুরক্ষায় জুলাই জাতীয় সনদে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছি। অন্তর্বর্তী সরকারের ‘জুলাইযোদ্ধা সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়েছে, যা সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে। অধ্যাদেশটি বিল আকারে পাস করাতে একমত হয়েছি।
‘পুলিশ হত্যার বিচার’ হবে বলে সামাজিক মাধ্যমে যে প্রচার রয়েছে তা নাকচ করে সালাহউদ্দিন বলেন, আওয়ামী ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী সোশ্যাল মিডিয়ায় যে সমস্ত হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি করছে, সেই বিষয়ে আগেও বলেছি তাহলে তো মুক্তিযোদ্ধাদেরও বিচার করতে হবে, যারা ১৯৭১ সালে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। গণ-অভ্যুত্থানের সময় যারা হানাদার বাহিনীর মতো আন্দোলনকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গণহত্যা চালিয়েছে, তারা জনতার প্রতিরোধের মুখে কেউ প্রাণ হারিয়েছে, কেউ আহত হয়েছে; কিন্তু সেটি যুদ্ধের ময়দানেই ফয়সালা হয়ে গেছে।
জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার প্রতিরোধে কেউ হতাহত হয়ে থাকলে এর বিচার হবে না বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার ওপর সঙ্ঘটিত হত্যাযজ্ঞের বিচার হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুলিশের বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড- সম্পর্কে নির্দিষ্ট মামলা দায়ের করা হয়েছে। কিছু মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এবং কিছু সাধারণ আদালতে রয়েছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এবং তার সহযোগী সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলার রায় হয়েছে। আদালত স্বাধীনভাবে বিচার পরিচালনা করবে, সরকার এতে হস্তক্ষেপ করবে না। দেশে সব গুম, খুন, হত্যাকাণ্ড ও গণহত্যার বিচার হবেই।
সম্পূরক প্রশ্নে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে নির্যাতনের সংস্কৃতি ছিল। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘মব কালচার’ দেখা গেছে, যেখানে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিন শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। এ পরিস্থিতি বন্ধে সরকারের পদক্ষেপ জানতে চান তিনি।
উত্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, উল্লিখিত পরিসংখ্যান তার কাছে নেই এবং সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর খুব অল্প সময় হয়েছে। তিনি বলেন, সব ঘটনাকে মব বলা ঠিক নয়; কিছু ঘটনা পরিকল্পিত অপরাধ, যার বিরুদ্ধে মামলা, তদন্ত, গ্রেফতার ও বিচার প্রক্রিয়া চলছে। গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে থানায় হামলা বা উত্তরা এলাকায় একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর এসব ঘটনার সংজ্ঞা আলাদা করে দেখতে হবে।
তিনি আরো বলেন, দায়িত্ব নেয়ার পর সরকার স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশে কোনো ধরনের মব কালচার থাকতে দেয়া হবে না। সড়ক বা মহাসড়ক অবরোধ করে দাবি আদায়ের প্রবণতাও বরদাশত করা হবে না। তবে গণতান্ত্রিক উপায়ে দাবি উত্থাপন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি প্রদান, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম আয়োজন বা জনসমাবেশের মাধ্যমে মত প্রকাশের সুযোগ থাকবে।
বিএনপির এমপি আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী প্রশ্নে বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা বহু মামলা এখনও নিষ্পত্তি হয়নি এবং সেগুলো প্রত্যাহার করা উচিত। তিনি পুলিশ নির্যাতনের একটি ঘটনার কথাও তুলে ধরেন। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কিছু মিথ্যা মামলা ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে। সরকারি ও বিরোধী দলের নেতাকর্মী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো যাচাই-বাছাই করে আবেদন অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করা হচ্ছে।



