আব্দুর রাজ্জাক ঘিওর (মানিকগঞ্জ)
বর্ষার মেঘ জমলেই বদলে যায় মানিকগঞ্জের চর ও নিম্নাঞ্চলের চিত্র। শুকনো মৌসুমের যে পথে মানুষ হেঁটে চলেন, বর্ষায় সেখানে ছুটে চলে নৌকা। বাড়ির উঠান থেকে বাজার, ফসলের মাঠ থেকে স্কুল কিংবা নদীর ঘাট- অনেক জায়গায় কাঠের ডিঙিই হয়ে ওঠে প্রধান বাহন। আর নৌকার সেই প্রয়োজন মেটাতে বর্ষা এলেই প্রাণ ফিরে পায় ঘিওর ও হরিরামপুরের ঝিটকার পুরনো নৌকার হাট।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ঘিওরের নৌকার হাটের ইতিহাস শত বছরেরও বেশি পুরনো। হরিরামপুরের ঝিটকার হাটের গোড়াপত্তন ব্রিটিশ আমলে। নদী, খাল-বিল ও চরনির্ভর জনপদে একসময় যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌকা। কৃষিপণ্য পরিবহন, মাছ ধরা, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে গ্রামান্তরে যাতায়াত সব ক্ষেত্রেই ছিল এর ব্যবহার। সেই প্রয়োজন থেকেই নির্দিষ্ট দিনে গড়ে ওঠে নৌকার হাট। ঘিওরে প্রতি বুধবার ও ঝিটকায় প্রতি শনিবার এখনো বসে এ হাট।
হাটে লাখ টাকার বেচাকেনা : ভোর থেকেই ঘিওরের হাটে আসতে শুরু করেন নৌকা বিক্রেতারা। সারি সারি নৌকার ফাঁকে ক্রেতারা কাঠের মান, তলার পুরুত্ব, গড়ন ও আকার দেখে দরদাম করেন। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, প্রতি বুধবারের হাটে প্রায় ৯ থেকে ১০ লাখ টাকার নৌকা কেনাবেচা হয়। গত বুধবার বিভিন্ন ধরনের নৌকা ৩ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়েছে।
মাচাইন এলাকার ব্যবসায়ী সোরহাব ব্যাপারী বলেন, পানি বাড়ার সাথে নৌকার চাহিদাও বাড়ে। চরাঞ্চলের মানুষ প্রয়োজনের তাগিদেই নৌকা কিনতে আসেন।
কাঠের মানেই নৌকার স্থায়িত্ব : ছোট ডিঙি নৌকার পাশাপাশি এ হাটে বড় নৌকাও পাওয়া যায়। মাছ ধরা, ব্যক্তিগত যাতায়াত ও ছোটখাটো মালামাল বহনে ছোট নৌকা ব্যবহৃত হয়। আর বড় নৌকা কাজে লাগে কৃষিপণ্য ও বিভিন্ন মালামাল পরিবহনে। নৌকা তৈরিতে রেইনট্রি, কড়ই, চাম্বল ও মেহগনি কাঠ ব্যবহার করেন কারিগরেরা। কাঠ কেটে তক্তা তৈরি, কাঠামো জোড়া লাগানো, ফাঁক বন্ধ করা, ঘষামাজা ও রঙ বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে তৈরি হয় একটি নৌকা। সাথে লাগে লোহা, পেরেক ও অন্যান্য উপকরণ। কাঠ ও শ্রমের দাম বাড়ায় নৌকা তৈরির খরচও বেড়েছে।
কারিগর পরিতোষ বলেন, আগের মতো নৌকার কাজ নেই। বছরের সবসময় কাজও থাকে না। বর্ষায় কাজ বাড়ে, আর কয়েক মাসের এই আয় দিয়েই অনেক কারিগরের সংসার চলে।
ঝিটকার হাটে কমেছে নৌকা, টিকে আছে ঐতিহ্য : একসময় হরিরামপুরের ঝিটকার নৌকার হাটে বর্ষায় কয়েক শত নৌকা উঠত বলে জানান স্থানীয় প্রবীণরা। দূর-দূরান্ত থেকে আসতেন ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা। এখন হাটের পরিসর কমেছে। প্রতি শনিবার সাধারণত ৬০ থেকে ১০০টি নৌকা ওঠে। তবে পানি বাড়লে আবারো বাড়ে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়। দৌলতপুর থেকে নৌকা কিনতে আসা আজিজুল মিয়া বলেন, বর্ষায় তাদের এলাকায় নৌকা ছাড়া চলাচল কঠিন। কৃষিকাজ, মাছ ধরা ও বাজারে যাওয়ার জন্য নৌকা প্রয়োজন।
এক হাটে জড়িত বহু মানুষের জীবিকা : নৌকার হাট শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়; এর সাথে জড়িয়ে আছে কাঠ ব্যবসায়ী, করাতকল শ্রমিক, কারিগর, বৈঠা প্রস্তুতকারক, কামার, রঙ ব্যবসায়ী ও পরিবহন শ্রমিকদের জীবিকা। বৈঠা ব্যবসায়ী অজয় সূত্রধর বলেন, নৌকার বিক্রি বাড়লে বৈঠার চাহিদাও বাড়ে। ঘিওর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাশিতা তুল ইসলাম বলেন, ঘিওরের নৌকার হাটটি ঐতিহ্যবাহী। প্রতি বুধবার বিভিন্ন ধরনের নৌকা ওঠে এবং জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা আসেন। সড়ক যোগাযোগ বেড়েছে, আধুনিক যানবাহন বদলে দিয়েছে মানুষের জীবনযাত্রা। তবু বর্ষার পানিতে যখন চেনা পথ হারিয়ে যায়, তখন শতবর্ষের পুরনো কাঠের নৌকাই আবার হয়ে ওঠে চলার সঙ্গী। নদীমাতৃক বাংলার সেই পুরনো ঐতিহ্য তাই এখনো টিকে আছে ঘিওর ও ঝিটকার দুই নৌকার হাটে।



