দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে আগের তুলনায় অস্থিরতা কমেছে। রেমিট্যান্সের রেকর্ড প্রবাহ, রফতানি আয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়ায় ডলারের সরবরাহে অনেকটা স্বস্তি ফিরেছে। কিন্তু এর পরও শিল্প খাতে স্বস্তি নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজার স্থিতিশীল হলেও ডলারের উচ্চ বিনিময় হার, ব্যাংক ঋণের ব্যয়, এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলার খরচ এবং কাঁচামাল আমদানির ব্যয় উৎপাদন খাতকে এখনো চাপে রেখেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি মার্কিন ডলারের ওয়েটেড অ্যাভারেজ রেট (ডব্লিউএআর) ১২৩.৮২ টাকা, যা দুই বছর আগের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ডলারের বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি আগের তুলনায় উন্নত হলেও কয়েকটি ব্যাংকের অতিরিক্ত দামে ডলার কেনাবেচার কারণে বাজারে এখনো চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। জুনের শেষ দিকে আমদানি বিল নিষ্পত্তির হার বেড়ে ১২৩ দশমিক ৫৫ টাকায় পৌঁছায়, যা ব্যাংকগুলোর আমদানি ব্যয় আরো বাড়িয়ে দেয়। এ দিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের গ্রস রিজার্ভ ৩৭ দশমকি ৫৮ বিলিয়ন ডলার এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ৩২ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার দাঁড়িয়েছে। এক বছর আগে যা ছিল যথাক্রমে ২৯ দশমিক ৮০ বিলিয়ন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেমিট্যান্স প্রবাহও অর্থনীতিতে বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী আয় ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হওয়ার পথে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ের মধ্যে অন্যতম। এই প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, ডলারের বাজার স্থিতিশীল হলেও উৎপাদন ব্যয় কমেনি। কারণ কাঁচামাল আমদানির সময় শুধু ডলারের দাম নয়, ব্যাংকের কমিশন, এলসি মার্জিন, সুদহার, শিপিং চার্জ ও বীমা ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে আমদানির জন্য এলসি খোলার পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৪১ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু একই সময়ে এলসি নিষ্পত্তি ১ দশমিক ২১ শতাংশ কমেছে, যা শিল্পখাতে কাঁচামালের চাহিদা পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কেত। সংখ্যাগতভাবে এলসি বাড়লেও উদ্যোক্তারা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় কম আমদানি করছেন। কারণ ভবিষ্যৎ চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
তিনি বলেন, ডলারের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় তৈরী পোশাক, টেক্সটাইল, প্লাস্টিক, ওষুধ, ইস্পাত ও ভোগ্যপণ্য খাতের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। কারণ একই পরিমাণ কাঁচামাল আমদানিতে আগের তুলনায় কয়েক কোটি টাকা বেশি ব্যয় হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়ানো সম্ভব না হওয়ায় এই অতিরিক্ত ব্যয় নিজেদেরই বহন করতে হচ্ছে বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের (বিএই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল নয়া দিগন্তকে বলেন, বেশির ভাগ রফতানিকারক আগাম নির্ধারিত দামে ক্রয়াদেশ পান। এমন পরিস্থিতিতে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির পুরো চাপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকেই বহন করতে হয়। এতে মুনাফার হার কমছে এবং নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, তুলা, কেমিক্যাল, সিনথেটিক ফাইবারসহ প্রায় সব ধরনের কাঁচামাল আমদানিনির্ভর। ডলারের উচ্চ মূল্য উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করছে।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, ডলারের বাজারে বড় ধরনের সঙ্কট কেটে গেছে। কিন্তু বিনিময় হার এখন যে অবস্থানে রয়েছে, সেটিই শিল্পখাতের জন্য ব্যয়বহুল। একই সাথে উচ্চ সুদহার উদ্যোক্তাদের ওপর দ্বৈত চাপ সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয়। তবে শিল্পখাতকে প্রতিযোগিতামূলক রাখতে ব্যাংকিং খরচ, এলসি ব্যয় ও অর্থায়নের ব্যয় কমাতে হবে।
এ দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক সাম্প্রতি প্রকাশিত মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরো শক্তিশালী করাই এখন অগ্রাধিকার। রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় বাড়ার ফলে বৈদেশিক খাতের ঝুঁকি আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে।
দেশের শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, এখনো অনেক ব্যাংক এলসি খোলার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আগের মতো সহজে বৈদেশিক মুদ্রা সুবিধা পাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরলেও শিল্প খাতে প্রকৃত স্বস্তি ফিরবে তখনই, যখন ডলারের উচ্চ বিনিময় হার ধীরে ধীরে সহনীয় পর্যায়ে নামবে। একই সাথে ঋণের সুদ কমবে এবং কাঁচামাল আমদানির অর্থায়ন সহজ হবে। অন্যথায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়লেও উৎপাদন ব্যয় ও রফতানি প্রতিযোগিতায় চাপ থেকেই যাবে বলে তারা মনে করছেন।



