নতুন জ্বালানি মাস্টারপ্ল্যান : দুর্নীতিপ্রবণ আমদানিনির্ভর জ্বালানি মডেল বহালের ঝুঁকি

যদিও এই পরিকল্পনায় অতীতের ব্যর্থতাগুলো যেমন অতিরঞ্জিত চাহিদার প্রাক্কলন এবং ক্রমবর্ধমান ভর্তুকি স্বীকার করা হয়েছে, তবুও এতে জ্বালানি সার্বভৌমত্ব অর্জনে প্রয়োজনীয় মনোযোগের অভাব রয়েছে। এর পরিবর্তে, এটি জাতিকে একটি স্থায়ী ‘ঋণ ফাঁদে’ আটকে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে হুমকির মুখে ফেলবে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে বাংলাদেশের খসড়া ‘এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সেক্টর মাস্টারপ্ল্যান ২০২৫’ (ঊচঝগচ) এক দীর্ঘমেয়াদি ঋণ এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের চক্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে যাচ্ছে। যদিও এই পরিকল্পনায় অতীতের ব্যর্থতাগুলো যেমন অতিরঞ্জিত চাহিদার প্রাক্কলন এবং ক্রমবর্ধমান ভর্তুকি স্বীকার করা হয়েছে, তবুও এতে জ্বালানি সার্বভৌমত্ব অর্জনে প্রয়োজনীয় মনোযোগের অভাব রয়েছে। এর পরিবর্তে, এটি জাতিকে একটি স্থায়ী ‘ঋণ ফাঁদে’ আটকে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে হুমকির মুখে ফেলবে।

২০৫০ সাল পর্যন্ত ৪৫ বিলিয়ন ডলারের আমদানি ফাঁদ : চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের বিশ্লেষণে দেখা গেছে খসড়া ইপিএসএমপি (ঊচঝগচ) আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতাকে কার্যত স্বাভাবিক করে তুলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৫০ সাল নাগাদ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা মাত্র ২০% হ্রাস পাবে, যার ফলে ২০৫০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জ্বালানি উৎপাদনে আমদানিনির্ভর থেকে যাবে।

এই দীর্ঘস্থায়ী নির্ভরতার কারণে ২০২৬ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে ৩০ থেকে ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের (ফৎধরহ) পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।

দেশীয় বিকল্পের চেয়ে এলএনজি (খঘএ) টার্মিনাল এবং রিফাইনারিগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়ার মাধ্যমে, এই পরিকল্পনাটি দেশকে বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি (ঢ়ৎরপব ংযড়পশং) এবং মুদ্রার অবমূল্যায়নের ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

পরিকল্পিত অতিরিক্ত সমতা : ক্যাপাসিটি পেমেন্টে প্রত্যাবর্তন

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের পজিশন পেপারটিতে পুনরায় অতিরিক্ত সক্ষমতার (ড়াবৎপধঢ়ধপরঃু) সঙ্কটে পড়ার তীব্র ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৮৯.১ গিগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অথচ একই সময়ে জাতীয় চাহিদার প্রাক্কলন করা হয়েছে মাত্র ৫৯ গিগাওয়াট।

এই বিপুল ৩০ গিগাওয়াট উদ্বৃত্ত সক্ষমতা দেশটিকে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর এবং দুর্নীতিপ্রবণ ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। এতে করে গ্রাহকদের অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য অর্থ প্রদানে বাধ্য করা হবে এবং বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পাবে।

২০৪০ সাল পর্যন্ত রূপান্তরকে ‘পিছিয়ে দেওয়া’ (ইধপশ-ষড়ধফরহম)

বাংলাদেশের জাতীয় জলবায়ু প্রতিশ্রুতি (ঘউঈ ৩.০) থাকা সত্ত্বেও ইপিএসএমপি ২০৪০-৫০ সময়কালের আগে নবায়নযোগ্য শক্তির সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।

এই প্রশ্নবিদ্ধ বিলম্ব ব্যয়বহুল জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতাকে দীর্ঘায়িত করবে এবং দ্রুত নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারের জন্য প্রয়োজনীয় রেয়াতি (পড়হপবংংরড়হধষ) জলবায়ু অর্থায়নে প্রবেশাধিকার বাধাগ্রস্ত করবে।

রুফটপ সোলার, মিনিসোলার সিস্টেম এবং ডিস্ট্রিবিউটেড সোলারের মতো স্বল্প খরচের বিকল্পগুলোকে উপেক্ষা করে উচ্চ-বিনিয়োগের (যরময-পধঢ়বী) এলএনজি অবকাঠামোকে প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে।

কার্বন ফাইন্যান্সের সম্ভাবনা নিয়ে পরিকল্পনার দাবি বাস্তবসম্মত নয় বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০৫০ সালের জন্য ২০ বিলিয়ন ডলারের পূর্বাভাস দেয়া হলেও, চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের ঘউঈ ৩.০ গবেষণায় ভবিষ্যতে এর বাস্তব সম্ভাবনা মাত্র প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার বলে দেখা গেছে।

সামাজিক মূল্য : ক্রয়ক্ষমতা এবং ন্যায়পরায়ণতা

খসড়া পরিকল্পনায় পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে যে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে ১৩.৬৬ টাকা এবং গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটারে ৭০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। বর্তমান সংস্কারগুলোতে গৃহস্থালি এবং দ্রুত ব্যবসার জন্য অধিকারভিত্তিক সুরক্ষার অভাব রয়েছে।

মূল্য বৃদ্ধির আঘাত থেকে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করার জন্য কোনো ‘লাইফলাইন ট্যারিফ’ বা স্বয়ংক্রিয় সহায়তা ব্যবস্থা রাখা হয়নি।

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান বলেন, ‘এলএনজি থেকে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পে ১ ডলার বিনিয়োগ স্থানান্তর করলে যেখানে অতিরিক্ত ১৭ ডলার লাভ নিশ্চিত করা সম্ভব, সেখানে এই মাস্টারপ্ল্যান দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার একটি নীল-নকশা। নবায়নযোগ্য শক্তিভিত্তিক সার্বভৌমত্ব ছাড়াা ‘ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর’ (ঔঁংঃ ঊহবৎমু ঞৎধহংরঃরড়হ) কেবল কিছু অন্তঃসারশূন্য শব্দ মাত্র। আমরা দুর্নীতিপ্রসূত অর্থনীতি বিধ্বংসী এবং আমদানিকেন্দ্রিক জ্বালানি মডেলের উত্তরাধিকার বহন করতে পারি না, যা আমাদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শেষ করে দিচ্ছে এবং গ্রিডের দেশীয় সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করছে।

সার্বভৌম সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী

ভবিষ্যতে ‘অচল সম্পদ’ (ংঃৎধহফবফ ধংংবঃ) তৈরির ঝুঁকি রোধে, পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করার আগে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ পাঁচটি বাধ্যতামূলক সংশোধনীর প্রস্তাব করেছে।

১. জ্বালানি সার্বভৌমত্ব যাচাই : সমস্ত নতুন এলএনজি এবং জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্পের জন্য বাধ্যতামূলক বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সহনশীলতা পরীক্ষা (ংঃৎবংং ঃবংঃরহম) এবং বৈশ্বিক মূল্য-অভিঘাতের পরিস্থিতি যাচাই করা।

২. নবায়নযোগ্য শক্তির পুনর্বিন্যাস : বৃহৎ আকারের সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোকে তৃতীয় পর্যায় (২০৪০-এর দশক) থেকে এগিয়ে এনে প্রথমপর্যায়ে (বর্তমান) বাস্তবায়ন করা; যেখানে দুর্নীতি ও বিরোধের ঝুঁকি কমাতে ৫০-১০০ মেগাওয়াটের রেন্টাল বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

৩. অধিকারভিত্তিক ক্রয়ক্ষমতা : জ্বালানি পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য লাইফলাইন ট্যারিফ এবং শ্রমিক রূপান্তর প্যাকেজ প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা।

৪. প্রাকৃতিক অধিকারভিত্তিক সুশাসন : জ্বালানি প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে ‘পরিবেশগত নিষিদ্ধ এলাকা’ (বপড়ষড়মরপধষ হড়-মড় ুড়হবং) এবং সম্প্রদায়ের তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা।

৫. স্বচ্ছতা ব্যবস্থা : অতিরিক্ত সক্ষমতা রোধ এবং নির্গমন ও ক্রয়প্রক্রিয়ার নিরীক্ষাযোগ্য পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে একটি ‘রোলিং আপডেট’ পদ্ধতি চালু করা।

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ সম্পর্কে : চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ একটি ‘থিংক অ্যান্ড ডু ট্যাংক’, যা জলবায়ু অর্থায়ন, জ্বালানি সার্বভৌমত্ব এবং প্রাকৃতিক অধিকারভিত্তিক সুশাসনের ওপর কাজ করে। এই বিশ্লেষণের লক্ষ্য বাংলাদেশের জাতীয় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের মাস্টারপ্ল্যান ২০২৫-এর তথ্য-প্রমাণভিত্তিক উন্নয়নে সহায়তা করা।