পদ ছাড়লে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা সম্ভব : তথ্য উপদেষ্টা

Printed Edition
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা: জাহেদ উর রহমান সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি বিষয়ে ব্রিফিংয়ে বক্তব্য রাখেন : নয়া দিগন্ত
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা: জাহেদ উর রহমান সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি বিষয়ে ব্রিফিংয়ে বক্তব্য রাখেন : নয়া দিগন্ত

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

রাষ্ট্রপতি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যক্রম শুরু বা চালিয়ে নেয়া যায় না। তবে দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার পর তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া গ্রহণ করা যাবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা: জাহেদ উর রহমান।

তিনি বলেছেন, “রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। রাষ্ট্রপতির পদে থাকা অবস্থায় তিনি বিশেষ সাংবিধানিক সুরক্ষা পান। কিন্তু পদ থেকে চলে যাওয়ার পর দায়িত্ব গ্রহণের আগে বা পরে সংঘটিত কোনো অনিয়ম ও অসদাচরণের অভিযোগ আইনগতভাবে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।”

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে সরকারের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

‘দায়মুক্তি স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নয়’

সাবেক বা বর্তমান রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন আদালতে চলমান অভিযোগ ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে দেয়া সুরক্ষার ব্যাখ্যা নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি রয়েছে।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি তার পদে থাকা অবস্থায় কোনো ফৌজদারি আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হবেন না। কিন্তু তিনি যখন আর রাষ্ট্রপতি থাকবেন না, তখন আগে বা পরে করা কোনো কাজ কিংবা অসদাচরণের অভিযোগ নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।”

এই বক্তব্য কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ করে নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এটি যেকোনো রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য একটি সাধারণ সাংবিধানিক ব্যাখ্যা।”

রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে ট্রায়াল কোর্ট, হাইকোর্ট ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিভিন্ন আবেদন বা অভিযোগের প্রসঙ্গ উঠলে তিনি বলেন, “আদালত স্বাধীনভাবে কাজ করছে। কোনো মামলা আদালতে গেলে তার বিচারিক প্রক্রিয়া কিভাবে চলবে, সেটি আদালতই নির্ধারণ করবেন।”

তিনি বলেন, “সরকার কোনো কোনো মামলায় পক্ষ হয়। আবার অনেক মামলা সরকারের বিরুদ্ধেও হয়। উচ্চ আদালতে অসংখ্য রিটে সরকার পরাজিত হয়। সুতরাং সবকিছু সরকার নিয়ন্ত্রণ করছে এভাবে দেখা ঠিক হবে না।”

পুলিশের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “একটা সময় পুলিশ বাহিনী অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। সেই অবস্থা কাটিয়ে উঠে তারা এখন তুলনামূলকভাবে ভালো পারফর্ম করছে।”

তিনি বলেন, “আমাদের জনগণেরও উচিত পুলিশের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের সহযোগিতা করা। নিরাপত্তা অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। শুধু পুলিশের ওপর সব দায়িত্ব দিয়ে দিলে হবে না। জনগণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা থাকতে হবে।”

আন্তর্জাতিক আয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়নি

একটি আন্তর্জাতিক আয়োজনে বাংলাদেশকে পর্যবেক্ষক হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো এবং সেখানে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেবেন কিনা- প্রশ্নে উপদেষ্টা বলেন, “এই বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”

প্রধানমন্ত্রী গেলে সংশ্লিষ্ট দেশ ও আন্তর্জাতিক নেতাদের সাথে বৈঠকের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ কিংবা সফরসঙ্গী কারা হবেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।”

এমনকি প্রাথমিক পর্যায়ের বিস্তারিত আলোচনাও শুরু হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, “সময় নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।”

‘সরকারের সব কাজ নিখুঁত হবে না, তবে আন্তরিকতা আছে’

প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেশের কয়েকটি পত্রিকার সম্পাদকদের একটি সংগঠনের প্রতিনিধিদের বৈঠকের প্রসঙ্গ তুলে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ওই বৈঠকে দেশের গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

তিনি বলেন, “গণমাধ্যমের অবস্থা নিয়ে কথা উঠলে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখেছেন বিগত সময়ে কোন খাতটি ধ্বংসের বাইরে ছিল?”

উপদেষ্টা বলেন, “আমাদের সব কাজ নিখুঁত হয়ে যাবে, এমন নয়। কিন্তু সরকার আন্তরিক। সরকার আন্তরিকভাবে পরিস্থিতি পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। জনগণ সরকারের এই আন্তরিকতা উপলব্ধি করবে বলে আমরা আশা করি।”

অবসরে পাঠানো মানেই ‘রাতের ভোটে’ শাস্তি নয়

২০১৮ সালের নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন জেলা প্রশাসক ও যুগ্মসচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বলেনি যে তাদের নির্বাচনী অপরাধের কারণে অবসরে পাঠানো হয়েছে।”

সরকারি চাকরির বিধান অনুযায়ী, চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে সরকার কোনো কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানো ছাড়াই অবসরে পাঠাতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও সেই বিধান প্রয়োগ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে বিচার না হলে খারাপ দৃষ্টান্ত হবে

তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “২০১৮ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সন্ধ্যা থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স ভরার তথ্য আসতে শুরু করেছিল। রাতের বেলায় ভোট শেষ করে দেওয়ার এমন ঘটনা বিশ্বের নির্বাচন জালিয়াতির ইতিহাসেও বিরল।”

তার মতে, ওই নির্বাচনের ঘটনায় যথাযথ তদন্ত হওয়া জরুরি। সেখানে শুধু ডিসি ও এসপি নন; নির্বাচনী কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং অন্যান্য পর্যায়ে যারা নির্বাচনী অপরাধে জড়িত ছিলেন, তাদের দায়ও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ যদি ২০১৮ সালের নির্বাচনের ঘটনার বিচার না করে, তাহলে সেটি খুব খারাপ একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। নির্বাচনী অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থাও নেয়া যেতে পারে।”

২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়েও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান হওয়া দরকার বলে মন্তব্য করেন উপদেষ্টা। ২০০৮ সালের কয়েকটি কেন্দ্রে প্রতি বুথে অস্বাভাবিক দ্রুত ভোট পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সাগর-রুনি হত্যার সঠিক বিচার না হলে বিচারব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হবে

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্তে বারবার সময় নেয়ার বিষয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, দীর্ঘদিন প্রায় স্থবির হয়ে থাকা কয়েকটি হত্যা মামলায় নতুন করে গতি আনা হচ্ছে। কুমিল্লার কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার তদন্তও নতুন করে শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, “অতীতে অমীমাংসিত থাকা সব হত্যাকাণ্ড নিয়েই সরকার কাজ করবে। প্রতিটি মানুষের জীবন সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে কোনো সাংবাদিককে হত্যা করা হয়ে থাকলে সেটি রাষ্ট্র ও স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য বিশেষভাবে গুরুতর ঘটনা।”

তিনি বলেন, “সাগর-রুনি হত্যার একটি সুনির্দিষ্ট ও সঠিক বিচার না হলে দেশে বিচার বলে কিছু আছে কিনা সেই প্রশ্ন থেকে যাবে।”

তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ থেকে শতাধিকবার আদালতে সময় চাওয়ার বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, “সময় দেয়া আদালতের এখতিয়ার। কিন্তু যথাযথ তদন্ত না করে বারবার সময় চাওয়া সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়ের মধ্যে পড়ে।”

আগের সরকারের আন্তরিকতার অভাবের কারণে তদন্ত এগোয়নি- এমন সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে তদন্তে গতি আনার সুযোগ রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত মামলার রায় কী হবে, সেটি সম্পূর্ণভাবে আদালতের বিষয়।”