চমক দেখাচ্ছেন গোলরক্ষকরা

Printed Edition

মীর মোকাম্মেল আহছান

বিশ্বকাপ ফুটবল উন্মাদনার জ্বরে কাঁপছে গোটা দুনিয়া। ফুটবলের মহাযজ্ঞে উৎসবের আমেজে মেতে উঠেছে ফুটবলপ্রেমীরা। ফুটবলকে প্রায়ই গোলের খেলা বলা হয়। বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়া ফুটবল উন্মাদনায় তাই সাধারণত আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন ফরোয়ার্ডরা। গোল, অ্যাসিস্ট, ড্রিবল কিংবা অবিশ্বাস্য ফিনিশিং- সবকিছুই ঘিরে থাকে আক্রমণভাগের তারকাদের। গোলমেশিনদের ঝলকানি যেমন দর্শকদের আনন্দ দেয়, তেমনি গোলরক্ষকদের অবিশ্বাস্য সেভও তৈরি করছে বিশ্বকাপের স্মরণীয় মুহূর্ত। ২০২৬ বিশ্বকাপ মনে করিয়ে দিচ্ছে, শুধু গোল করলেই ম্যাচ জেতা যায় না; গোল বাঁচানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এবারের বিশ্বকাপ গ্লাভস হাতে যেন তৈরি হয়েছে গোলরক্ষকদের এক অবিশ্বাস্য মঞ্চ! তারকা ফরোয়ার্ডদের ঝলকের চেয়েও গোলরক্ষকদের দৃঢ় নৈপুণ্যে এবং একের পর এক রেকর্ড ভাঙার গল্পই এখন টুর্নামেন্টের প্রধান আলোচনার বিষয়। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই আন্ডারডগ দলগুলো গোলরক্ষকের নৈপুণ্যে নাকানিচুবানি খাইয়েছে ফেবারিটদের।

গ্রুপপর্বের শেষ রাউন্ডের দিকে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে বিশ্বকাপ। পুরো টুর্নামেন্টে বাকি আছে এখনো অনেক নাটক। এতে নতুন নায়ক উঠে আসবেন, তৈরি হবে নতুন সব গল্প। তবে এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় বার্তা একটাই- আলো কাড়ছেন গ্লাভস হাতে গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা অতন্দ্রপ্রহরীরা। একের পর এক ম্যাচে গোলরক্ষকদের অসাধারণ নৈপুণ্য মুগ্ধ করছে দর্শকদের। অনেক ম্যাচের ফল নির্ধারণে ফরোয়ার্ডদের চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছেন পোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এই শেষ প্রহরীরা। ফলে এবারের বিশ্বকাপকে অনেকেই ইতোমধ্যে ‘গোলরক্ষকদের বিশ্বকাপ’ বলতে শুরু করেছেন।

প্রথম দুই রাউন্ডের ম্যাচগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন গোলরক্ষকরা। যেখানে দর্শকরা গোলবন্যার প্রত্যাশা করেছিলেন, সেখানে একের পর এক অসাধারণ সেভ করে ম্যাচে নিজেদের দলের প্রাণভোমরা হয়ে উঠেছেন শেষ প্রহরীরা। ফলে টুর্নামেন্টের অন্যতম আলোচিত চরিত্র এখন গোলরক্ষকরাই।

বিশ্বকাপের শুরুতেই আলোচনায় উঠে আসেন কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা। ৪০ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক স্পেনের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে গোলশূন্য ড্র এনে দেন নিজের দেশকে। ম্যাচটিতে তিনি সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেন, যার বেশ কয়েকটি ছিল বক্সের ভেতর থেকে নেয়া শট। তার বীরত্বপূর্ণ পারফরম্যান্সে হতাশ হয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল স্পেনের তারকাসমৃদ্ধ আক্রমণভাগকেও। এই ম্যাচের পর বিশ্বজুড়ে আলোচনায় উঠে আসেন তিনি এবং বিশ্বকাপের অন্যতম বড় চমকে পরিণত হন ভোজিনহা।

জার্মানির বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ৭-১ ব্যবধানে হারে অভিষিক্ত কুরাসাও। এই ম্যাচের পর অনেকেই ভেবেছিলেন ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে অবস্থিত ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রটি হয়তো টুর্নামেন্টে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু পরের ম্যাচেই ইকুয়েডরের বিপক্ষে গ্লাভস হাতে জ্বলে উঠলেন গোলরক্ষক ইলয় রুম। ল্যাটিন আমেরিকার দেশটির ফরোয়ার্ডদের সামনে গোলপোস্ট রক্ষায় যেন তিনি দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তার এই মহাকাব্যিক পারফরম্যান্সে পুরো ম্যাচে ১৫টি সেভ করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে ৯০ মিনিটের ম্যাচে সর্বোচ্চ সেভের রেকর্ড গড়েন। তার অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে পয়েন্ট অর্জন করে কুরাসাও।

আফ্রিকার দেশ কেপ ভার্দে ও উত্তর আমেরিকার কুরাসাওয়ের গোলরক্ষকের পর গ্লাভস হাতে আলো ছড়িয়েছেন এশিয়ার প্রতিনিধিত্ব করা ইরানের গোলরক্ষক আলি রেজা বেইরানভান্দ। বেলজিয়ামের বিপক্ষে অসাধারণ সব সেভ করে দলকে মূল্যবান এক পয়েন্ট এনে দেন ইরানের অভিজ্ঞ এই গোলরক্ষক। বেলজিয়াম পুরো ম্যাচে আধিপত্য বিস্তার করলেও পরাস্ত করতে পারেননি বেইরানভান্দকে। তার দৃঢ়তায় ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র’তে শেষ হওয়ায় চলমান বিশ্বকাপে ‘জি’ গ্রুপের সমীকরণ আরো জটিল হয়ে ওঠে।

ভোজিনহা, ইলয় রুম ও আলি রেজা বেইরানভান্দ- এই তিন গোলরক্ষকই খেলে থাকেন দ্বিতীয় স্তরের ফুটবল ক্লাবে। আমেরিকার দ্বিতীয় স্তরের পেশাদার ফুটবল ক্লাব মিয়ামি এফসির হয়ে খেলেন কুরাসাও জাতীয় দলের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ইলয় রুম। আলি রেজা বেইরানভান্দ বর্তমানে ফার্সি গালফ প্রো লিগের ইরানি ক্লাব ট্রাক্টর-এর হয়ে খেলেন। ফুটবলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সাধারণত তারকা ফরোয়ার্ড বা উচ্চ বাজারমূল্যের খেলোয়াড়রা থাকলেও সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে ভিন্ন এক চিত্র। তুলনামূলক কম আয়ের ও কম বাজারমূল্যের গোলরক্ষকেরাই নিজেদের অসাধারণ পারফরম্যান্স দিয়ে বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়াচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারাই নিজেদের দলকে অপ্রত্যাশিত সাফল্য এনে দিচ্ছেন। বিশ্বকাপে খেলা এমন অনেক গোলরক্ষক রয়েছেন, যাদের আয়ের দিক থেকেও এদের বিস্তর ফারাক। রিয়াল মাদ্রিদের থিবো কর্তোয়ার কথাই বলা যাক। স্প্যানিশ জায়ান্ট ক্লাব থেকে বার্ষিক প্রায় এক কোটি ৫০ লাখ (১৫ মিলিয়ন) ইউরো মূল বেতন হিসেবে আয় করেন থিবো কর্তোয়া। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১৯২ কোটি টাকারও বেশি। এর বাইরে বোনাস ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে তার বার্ষিক আয়ের পরিমাণ ১ কোটি ৮০ লাখ (১৮ মিলিয়ন) ইউরোর কাছাকাছি। সে হিসেবে জিডি শাভেসের খেলা কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহার ক্লাবটিতে থেকে মাসিক আয় আনুমানিক ৫০ হাজার রিয়াল (প্রায় ৮.৪ হাজার ইউরো)।

মিয়ামি এফসিতে খেলা ইলয় রুমের বার্ষিক সুনির্দিষ্ট ও অফিশিয়াল পারিশ্রমিকের সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলেও ক্যারিয়ারের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এবং ট্রান্সফার মার্কেট ভ্যালু বিবেচনা করলে, তার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার ইউরো। এর আগে বেলজিয়ামের শীর্ষ লিগে তার সম্ভাব্য বার্ষিক আয় ছিল তিন লাখ ৩৯ হাজার ৩৪২ ডলার। আর বেইরানভান্দের বর্তমান ক্লাবের সাথে চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে আসছে ৩০ জুন। ক্লাবটি থেকে তিনি বার্ষিক আয় করতেন প্রায় ছয় লাখ ৫০ হাজার ইউরো থেকে ১০ লাখ ডলার।

কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা, কুরাসাওয়ের ইলয় রুম, ইরানের আলি রেজা বেইরানভান্দের পাশাপাশি মেক্সিকোর গিয়েরমো ওচোয়া, মরক্কোর ইয়াসিন বুনো কিংবা ক্রোয়েশিয়ার ডমিনিক লিভাকোভিচের মতো গোলরক্ষকেরা নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে অনেক বেশি আলোচিত হয়েছেন। যদিও তাদের বাজারমূল্য বিশ্বের সবচেয়ে দামি গোলরক্ষকদের সমপর্যায়ের ছিল না। কিন্তু ভোজিনহা, ইলয় রুম কিংবা আলি রেজা প্রমাণ করেছেন, অর্থ বা বাজারমূল্যের চেয়ে মাঠের পারফরম্যান্সই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পরিচয়।