স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) প্রশাসন শাখার উচ্চমান সহকারী মো: আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থেকে প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার, পদোন্নতি, বদলি ও নিয়োগে অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ এবং জ্ঞাত আয়ের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য গ্রহণের জন্য তাকে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হতে নোটিশ দেয়া হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক মো: হাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত এক নোটিশে এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) কার্যালয়ের উচ্চমান সহকারী-৩ মো: আমিনুল ইসলামকে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নোটিশে বলা হয়েছে, দুর্নীতি দমন আইন, ২০০৪-এর ২২ ধারা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা, ২০০৭ অনুযায়ী অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য গ্রহণের জন্য এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
দুদকের নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৩ সালে আমিনুল ইসলাম দিনাজপুরের খানসামা উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়ে কমিউনিটি অর্গানাইজার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। পরে তিনি এলজিইডির প্রশাসন শাখায় সংযুক্ত হন। অভিযোগ অনুযায়ী, বিধিমালা লঙ্ঘন করে তিনি প্রায় ১৩ বছর একই কর্মস্থলে থেকে প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করেছেন।
নোটিশে আরো বলা হয়েছে, এলজিইডির অভ্যন্তরীণ পদোন্নতি, বদলি, নিয়োগ ও চাকরি স্থায়ীকরণসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব খাটিয়ে অসাধু কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে লক্ষাধিক টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।
দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি নিজের এবং পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কমিশনের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, এসব সম্পদের পরিমাণ তার পরিচিত বৈধ আয়ের উৎসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে দুদক জানিয়েছে, অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনও অনুসন্ধানাধীন এবং যাচাই-বাছাই চলছে।
দুদকের নোটিশে বলা হয়েছে, সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য গ্রহণ প্রয়োজন। এ কারণে তাকে নির্ধারিত দিনে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। একই সাথে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত না হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া তাকে নিজের ও পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত অনুলিপি, আয়কর-সংক্রান্ত নথি, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের সত্যায়িত কপি এবং তফসিলি ব্যাংকে থাকা নিজের ও পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত কাগজপত্র সাথে আনতে বলা হয়েছে। দুদক এসব নথি পর্যালোচনার মাধ্যমে সম্পদের উৎস ও আয়ের সাথে সম্পদের সামঞ্জস্য যাচাই করতে চায়।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জানিয়ে অর্থ আদায় করা হতো। একইভাবে বদলি বা পদোন্নতির ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেন ছাড়া ফাইল অগ্রসর হতো না বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় ৪৪ জন সার্ভেয়ারকে উপসহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চলতি দায়িত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। এ ঘটনায় এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রশিদ মিয়ার ঘনিষ্ঠদের সাথে সমন্বয় করে মধ্যস্থতার অভিযোগও আনা হয়েছে আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সাথে সম্পর্ক ব্যবহার করে তিনি প্রশাসনে নিজের অবস্থান আরো শক্তিশালী করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আমিনুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি দিনাজপুর। তার বাবা মো: মোজাম্মেল হক একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। মূলত এলজিইডির ঢাকার প্রধান কার্যালয়ের প্রশাসন শাখায় সংযুক্ত হওয়ার পর দ্রুতই বিপুল সম্পদ অর্জন করেন আমিনুল। তার বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ এবং আইনি নোটিশ ও দুদকের চিঠির প্রসঙ্গ উঠে এলেও অদৃশ্য ক্ষমতাবলে তিনি দীর্ঘ সময় একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন একই দফতরে কর্মরত থাকা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তবে দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকলেই কেউ অনিয়ম করেছেন- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। তাদের ভাষ্য, সরকারি প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতি, বদলি ও নিয়োগের মতো সংবেদনশীল প্রশাসনিক কার্যক্রমে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। এসব কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই দ্রুত, নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে অভিযোগের নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।
অভিযোগকারীদের দাবি, সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে মো: আমিনুল ইসলামকে অবিলম্বে সদর দফতর থেকে প্রত্যাহার করা উচিত। অন্যথায় তিনি তদন্তপ্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতে পারেন বলে তাদের আশঙ্কা। এ বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী, স্থানীয় সরকার বিভাগ, দুদক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপও দাবি করেছেন তারা। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মো: আমিনুল ইসলাম ফোনে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সাথে সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেন।



