প্যারিস সম্মেলনে ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তায় সমর্থন যুক্তরাষ্ট্রের

ইউক্রেনে যুদ্ধ থামলে সেনা পাঠাবে ফ্রান্স-ব্রিটেন

রয়টার্স
Printed Edition
প্যারিসে ‘কোয়ালিশন অব উইলিংয়ের’ সম্মেলনে এলিসি প্রাসাদে ইউরোপীয় এবং ন্যাটো নেতারা : ইন্টারনেট
প্যারিসে ‘কোয়ালিশন অব উইলিংয়ের’ সম্মেলনে এলিসি প্রাসাদে ইউরোপীয় এবং ন্যাটো নেতারা : ইন্টারনেট

রাশিয়া পরে কখনো আক্রমণ চালালে ইউক্রেনের নিরাপত্তায় এগিয়ে আসার যে অঙ্গীকার কিয়েভের ইউরোপীয় মিত্ররা করে আসছে তাতে প্রথমবারের মতো সমর্থন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ নিরাপত্তা নিশ্চয়তায় ইউক্রেনের পাশে দাঁড়াতে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক প্রতিশ্রুতিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে মঙ্গলবার কিয়েভ মিত্রদের বিস্তৃত জোটের নেতারা আশ্বস্ত করেছেন।

প্যারিসে ‘কোয়ালিশন অব উইলিংয়ের’ সম্মেলনে এ আশ্বাস এসেছে। ২০১৪ ও ২০২২ সালে দুইবার আক্রমণ চালানো রাশিয়ার সাথে যে কোনো যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে ইউক্রেনের জন্য সুদৃঢ় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিশ্চিতে মূলত ইউরোপীয় দেশগুলোর নেতৃত্বে এ জোটই ব্যাপক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

জোটের আগের বৈঠকগুলোতে দেখা না যাওয়া মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পজামাতা জ্যারেড কুশনার এবার প্যারিস সম্মেলনে উপস্থিত হন। তাদের সাথে ছিলেন ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ জেনারেল অ্যালেক্সাস গ্রিনকেভিচ, যিনি আগের দিন ইউরোপের সেনা কর্মকর্তাদের সাথে নিরাপত্তা নিশ্চয়তার খুঁটিনাটি নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করেছেন। রাশিয়ার সাথে আলোচনার নেতৃত্ব দেয়া উইটকফ সম্মেলন শেষে বলেছেন, ‘নিরাপত্তা প্রটোকলগুলোর’ ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দৃঢ় সমর্থন রয়েছে। “এই নিরাপত্তা প্রটোকলগুলো করা হয়েছে ইউক্রেনে যে কোনো হামলা রোধ করতে, আর হামলা হলে সুরক্ষা দিতে। এগুলো উভয় কাজই করবে এবং এগুলো এত শক্তিশালী যে আগে কেউ এর সমতুল্য কিছু দেখেনি,” ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটিশ ও ইউক্রেনের নেতাদের সাথে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এমনটাই বলেছেন মার্কিন এ দূত।

কুশনার বলেছেন, “যদি ইউক্রেন শেষমেষ কোনো চুক্তি করে, তাহলে তাদের জানা থাকতে হবে যে চুক্তির পর তারা নিরাপদ থাকবে, তাদের সুদৃঢ় প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকছে এবং তাদের এমন বাস্তবপন্থী ব্যাকআপ থাকবে যা নিশ্চিত করবে যে এই (যুদ্ধ) পরিস্থিতি আর কখনো ঘটবে না।”

জোটের নেতাদের বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ ও যাচাই-বাছাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন যে প্রক্রিয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে তাতে কিয়েভ মিত্ররাও অংশগ্রহণ করবে। এই পর্যবেক্ষণ ও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় ড্রোন, সেন্সর ও স্যাটেলাইট থাকলেও কোনো মার্কিন সেনার উপস্থিতি থাকবে না। বৈঠকের পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি টেলিগ্রামে লিখেছেন, ‘সত্যিকারের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করতে ইউরোপ ও পুরো কোয়ালিশন অব উইলিং যে কতটা প্রস্তুত, এ সমঝোতাতেই সে সঙ্কেত পাওয়া যাচ্ছে।’

তবে যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের কাজ কিভাবে চলবে এবং কী করে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীকে সমর্থন ও অর্থায়ন করা হবে তার খুঁটিনাটি ঠিক করা এখনো বাকি, জানিয়েছেন তিনি। এবারের প্যারিস সম্মেলনের বিবৃতিতেও যুক্তরাষ্ট্রের সুস্পষ্ট অনুমোদন দেখা যায়নি, যুদ্ধবিরতি পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কী হবে তা নিয়ে ধোঁয়াশা আরো তীব্র হয়েছে। আগের খসড়ায় ইউক্রেনে বহুজাতিক বাহিনীকে সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর কথা বলা হলেও, এবার সেসব কথা বাদ পড়েছে।

তবে বৈঠকে মার্কিন বিশেষ দূতদের উপস্থিতি এবং তাদের শক্তিশালী বার্তাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন ইউরোপের কর্মকর্তারা। ইউক্রেনের জন্য নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনকে যে পাশে পাওয়া যাবে, উইটকফ ও কুশনারের উপস্থিতি সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে বলে তারা মনে করছেন। প্রায় চার বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা গত বছরের নভেম্বর থেকে গতি পেয়েছে। যুদ্ধের ইতি টানতে যুক্তরাষ্ট্র সেসময় যেসব প্রস্তাব হাজির করেছিল, তাতে রাশিয়ার মূল দাবিগুলো পূরণ হওয়ায় মস্কো ব্যাপক সমর্থন দিলেও কিয়েভ ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা এর বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।

এরপর কিয়েভের চাপে খসড়া প্রস্তাবের অনেক জায়গায় টুকটাক পরিবর্তন এসেছে বলে জানা গেলেও মস্কো যে এসব ব্যাপারে ছাড় দেবে এখন পর্যন্ত তার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। ইউক্রেন ও ইউরোপের চাওয়া অনুযায়ী নিরাপত্তা নিশ্চয়তাসহ যুদ্ধবিরতিতে রাশিয়া স্বাক্ষর করবে, তারও নিশ্চয়তা নেই। রাশিয়া এর আগে ইউক্রেনের অভ্যন্তরে ন্যাটো সদস্যভুক্ত যে কোনো দেশের সেনা মোতায়েনের প্রস্তাব উড়িয়ে দিয়েছিল। এতদিন পর্যন্ত ইউক্রেনের বেশিরভাগ মিত্রেরই আশ্বাস ছিল কিয়েভ বাহিনীকে সামরিক সহায়তা দেয়া এবং আন্তর্জাতিক কোনো শান্তিরক্ষী বাহিনী হলে তাতে যতখানি সম্ভব অংশ নেয়া।

কিন্তু এখন সবার মনোযোগ সরে এসেছে মস্কোর পরবর্তী যে কোনো হামলায় কিয়েভের সমর্থনে আইনগত বাধ্যবাধকতামূলক নিশ্চয়তা দেয়ার প্রসঙ্গে। তবে তেমন ক্ষেত্রে পাল্টা সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে রাজি নয় অনেক ইউরোপীয় দেশ, বলছেন কূটনীতিকরা।

“এসব অঙ্গীকারের মধ্যে থাকতে পারে সামরিক সক্ষমতাকে কাজে লাগানো, গোয়েন্দা তথ্য ও লজিস্টিক্যাল সহায়তা, কূটনৈতিক উদ্যোগ, আরো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা,” বলা হয়েছে নেতাদের বিবৃতিতে। তারা এখন আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক অঙ্গীকারগুলো চূড়ান্ত করতে কাজ করছেন, বলেছেন নেতারা।