নাজমুস সাকিব, ইবি সংবাদদাতা
গুচ্ছ ভর্তি পদ্ধতিতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আল-ফিকহ অ্যান্ড ল’ বিভাগে মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে বিভাগটিতে মাদরাসা ও কলেজ থেকে ৫০:৫০ অনুপাতে শিক্ষার্থী ভর্তির সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ভর্তি শর্তে উল্লেখ থাকলেও গুচ্ছ ভর্তি কার্যক্রমে তা অনুসরণ করা হয়নি। ফলে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও বহু মাদরাসা শিক্ষার্থী বিভাগটিতে ভর্তি হতে পারেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দায় চাপিয়েছে গুচ্ছ ভর্তি কর্তৃপক্ষের ওপর। যদিও গুচ্ছের কেন্দ্রীয় টেকনিক্যাল কমিটির দাবি, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ভর্তি শর্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়েরই।
জানা যায়, গত ৭ ডিসেম্বর বিভাগের একাডেমিক কমিটি ও একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মনজুরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে আল-ফিকহ অ্যান্ড ল’ বিভাগে মাদরাসা ও কলেজ ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০:৫০ অনুপাতে আসন বণ্টনের সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ভর্তি শর্তেও উল্লেখ করা হয়। কিন্তু চলমান ভর্তি কার্যক্রমে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। চলতি শিক্ষাবর্ষে বিভাগটিতে এ ইউনিট থেকে ৩২ জন, বি ইউনিট থেকে ৪০ জন এবং সি ইউনিট থেকে আটজন শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পান। তবে ভর্তি ফি জমা দেয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় ৯০ শতাংশই কলেজ ব্যাকগ্রাউন্ডের বলে বিভাগ সূত্রে জানা যায়।
বিভাগ সূত্রে আরো জানা যায়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত আল-ফিকহ অ্যান্ড ল’ বিভাগে শুধু মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থীদের ভর্তি করানো হতো। সে সময় ভর্তিপরীক্ষায় আল-ফিকহ বিষয়ে পৃথক পরীক্ষাও নেয়া হতো। ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে মাদরাসা ও অন্যান্য শিক্ষার্থীর জন্য ৪০টি করে আসন নির্ধারণ করা হয়। বিভাগের শিক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তীতে গুচ্ছ ভর্তি পদ্ধতি চালুর পর বিশেষায়িত এ বিভাগে মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়াই শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু হয়, যা বিভাগের মূল উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মনজুরুল ইসলাম বলেন, ৫০:৫০ অনুপাতে ভর্তির শর্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে গুচ্ছ ভর্তি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল। তবে জিএসটি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গুচ্ছ ভর্তি সাধারণ নীতিমালার আওতায় পরিচালিত হয়। আল-ফিকহ বিভাগের মতো বিশেষ শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হলে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষায়িত বিভাগ থেকেও একই ধরনের দাবি উঠতে পারে।
তিনি বলেন, জিএসটি কর্তৃপক্ষের মতে, ‘মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ড’ বলতে কোন স্তরের শিক্ষাকে বোঝানো হয়েছে এবং ৫০ শতাংশ আসন এ, বি ও সি ইউনিটে কীভাবে বণ্টন হবে, সে বিষয়ে নীতিমালায় স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল না। এসব কারণে সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
তবে একাডেমিক কাউন্সিলে অনুমোদিত এবং রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত একটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হওয়া সত্ত্বেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ কেন নেয়া হয়নি, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রথম ধাপের ভর্তি শেষ হওয়ার পর আমি দায়িত্ব নিয়েছি। বর্তমানে ৮০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়ে যাওয়ায় এ অবস্থায় ভর্তি বাতিল বা নতুন করে পুরো প্রক্রিয়া পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে বিভাগ ও প্রশাসনের সাথে আলোচনা করে স্থায়ী সমাধান খোঁজা হবে। প্রয়োজন হলে আল-ফিকহ বিভাগকে পৃথক ভর্তি পদ্ধতির আওতায় আনার বিষয়েও আলোচনা করা যেতে পারে। একই সাথে ৫০:৫০ অনুপাত নির্ধারণের যৌক্তিকতা নিয়েও পাল্টা প্রশ্ন তোলেন তিনি।
আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাজিমুদ্দিন বলেন, জিএসটি কর্তৃপক্ষের কারিগরি জটিলতার বিষয়ে আমি অবগত নই। তবে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৫০:৫০ অনুপাতে ভর্তির সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু কোনো প্রশাসনই তা বাস্তবায়ন করেনি। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা পাঠদান ও পাঠগ্রহণে জটিলতায় পড়েন। সর্বশেষ বিভাগের একাডেমিক কমিটি দুই ধারার গ্র্যাজুয়েট তৈরির সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। মাদরাসা ধারার শিক্ষার্থীরা ফিকহে বেশি প্রাধান্য দেবে, পাশাপাশি সাধারণ আইনেও দক্ষ হবে। অন্যদিকে কলেজ ধারার শিক্ষার্থীরা আইনের পাশাপাশি ইসলামী আইনেও অভিজ্ঞ হবে। ইবি প্রশাসনও সে অনুযায়ী বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে।
বিভাগটির সিনিয়র অধ্যাপক ড. আবুবকর মো: জাকারিয়া মজুমদার বলেন, ফিকহ বিষয়ে পড়াশোনার জন্য আরবি ও ফিকহের প্রাথমিক জ্ঞান প্রয়োজন। এ ধরনের প্রস্তুতি ছাড়া শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ায় বিভাগের উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও পাঠগ্রহণে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি অতীতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিভাগটির বিশেষায়িত বৈশিষ্ট্য দুর্বল করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার কেন্দ্রীয় টেকনিক্যাল কমিটির দায়িত্বে থাকা ইউএফটিবির সহকারী অধ্যাপক রুবেল শেখ বলেন, নীতিগত বা শর্তসাপেক্ষ ভর্তি-সংক্রান্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই ভালো বলতে পারবেন। বিভাগভিত্তিক বিশেষ শর্ত নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে জানার জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে অফিসকে তথ্য দিতে বলেছিলাম। কিন্তু এখনো তারা আমাকে কোনো তথ্য দিতে পারেনি। আগের ভিসি মূল কাজগুলো করে গেছেন, আমি দায়িত্ব নিয়েছি শেষ পর্যায়ে। প্রায় এক মাস হলো যোগদান করেছি, এর মধ্যেও হাতেগোনা কয়েকটি কার্যদিবস পেয়েছি। তাই চলমান প্রক্রিয়ায় কিছু করার সুযোগ ছিল না। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিষয়গুলো আমি অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করব।’
উল্লেখ্য, ১৯৭৭ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নির্দেশে গঠিত ‘ইসলামিক ইউনিভার্সিটি কমিটি’র চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ১.২.১ ও ৫.১৪ ধারায় ভর্তির ক্ষেত্রে জেনারেল ও মাদরাসা থেকে সমান সংখ্যক শিক্ষার্থী নেয়ার বিধান রাখা হয়। ১৯৮৮ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের ৫০ শতাংশ মাদরাসা থেকে নেয়া বাধ্যতামূলক ছিল। দুই ধারার শিক্ষার্থীর জন্য পৃথক ১০০ নম্বরের ইংরেজি অথবা আরবি ও ইসলামিয়াত পরীক্ষাও আবশ্যিক ছিল। বর্তমানে এ ভারসাম্য বিলুপ্ত। ধর্মতত্ত্ব অনুষদেও জেনারেল ও মাদরাসা শিক্ষার্থীদের ৫০:৫০ ভারসাম্য নীতি আর কার্যকর নেই। সম্প্রতি শুধু আল-ফিকহ অ্যান্ড ল’ বিভাগে তা পুনরায় কার্যকরের উদ্যোগ নেয়া হলেও চলমান ভর্তি কার্যক্রমে নীতিটি বাস্তবায়িত না হওয়ায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।



