রফিকুল হায়দার ফরহাদ আনোয়ারার চর, ভোলা থেকে ফিরে
‘পূর্বে ওই যে একটি বাগান দেখা যাচ্ছে সেখানেই চর কালকিনি বা চর নিজামের অবস্থান।’ মাঝের চর থেকে বের হয়ে যখন মেঘনা নদীর মোহনায় অন্য ট্রলারের মাঝিকে জিজ্ঞাসা করা হলো তখন তিনি এই উত্তর দেন। আমাদেরও সন্ধ্যার আগে আগে দিনের আলোতে পৌঁছাতে হবে চর নিজামে। তাই মনের মধ্যে অস্থিরতা ছিল। কারণ আগেই শুনেছি এই চর নিজাম বা চর কালকিনিতে ডাকাত আছে। কিন্তু যখন আমরা ওই বাগানের (দ্বীপ এলাকায় বন বিভাগের পরিকল্পিত বনায়নকে বলা হয় বাগান) কাছে এলাম তখন আরেক ট্রলারের মাঝি বললেন, ‘এই চর তো চর নিজাম নয়। ওই যে আরেকটি চর ওই পাড়ে দেখছেন সেটিই চর নিজাম।’ তবে ততক্ষণে সামনে থাকা নতুন এই চরের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গেলাম।
পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবু অবস্থায়। তখন আমরা অতিক্রম করছিলাম নতুন এই চরের সামনে দিয়ে। আমাদের ট্রলারের দক্ষিণে অবস্থান করছিল চরটি। ছোট চর লম্বায় ৪ কিলোমিটারের মতো। আর প্রশস্ততায় আধা কিলোমিটার হবে। দেখতে খোলা প্রান্তরে থাকা স্টেডিয়ামের মতো। আমার মনে হবে সাগরের বুকে ভেসে আছে একটি বড় বাগান। বড় তালার মতোও মনে হচ্ছিল। সেই সাথে আমাজান লিলির পাতার মতোও মনে হচ্ছিল।
আমরা কিছুটা কাছে গেলাম সেই চরের। তখন নদী এবং সাগরে মাছ শিকার শেষে বনে ফিরছিল বকসহ সামুদ্রিক পাখিগুলো। চারদিকে পানি বেষ্টিত এমন এলাকা আসলেই পাখিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল। লোকজনের উপস্থিতি থাকে না বলে ওদের জীবনচক্রও চলে নির্বিঘেœ। তবে সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় আর এই চরে নামলাম না। কারণ চর নিজামে তাড়াতাড়ি পৌঁছার তাড়া।
এই চরের সামনে থেকে প্রায় আধাঘণ্টা পর আমাদের ট্রলার পৌঁছল চর নিজাম ঘাটে। সেখানে দেখা স্থানীয় ব্যবসায়ী রশীদ হাওলাদারের সাথে। তার কাছে এই চরের নাম জানতে চাইলে বলেন এর নাম আনোয়ারার চর। এরপর যোগ করেন, আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন বন বিভাগের এক বড় কর্মকর্তা তার স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে এই চরে বেড়াতে আসেন। তার স্ত্রীর নাম ছিল আনোয়ারা। তাই আনোয়ারার নাম অনুসারেই এই চরের নামকরণ আনোয়ারার চর।’
রশীদ হাওলাদার আরো জানান, সেই ছোট বেলা থেকেই এই চর দেখে আসছি। এখানে বনায়নও হয় প্রায় ২০ বছর আগে। এই বনে হরিণ আছে। আছে শিয়াল, মহিষসহ অন্য প্রাণী। তবে কোনো লোক বসতি নেই। চর নিজামসহ অন্য এলাকার লোকজন এই চরে গরু ও মহিষ পালন করে। ওই গরু ও মহিষ দেখাশোনা করার জন্য অল্প কয়েকজন লোক সেখানে থাকেন। মানুষের স্থায়ীভাবে এখানে বসবাস করার মতো পরিবেশ তৈরি হয়নি।
এই আনোয়ারার চরের চার পাশে মেঘনা নদীর মোহনা। ফলে এই চরের আশপাশে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। আমরা যখন আনোয়ারার চর অতিক্রম করছিলাম তখন সেখানে জেলেদের মাছ ধরতে দেখেছি। ইলিশ মাছই বেশি ধরা পড়ে জালে। আমরা এই আনোয়ারার চরের পশ্চিম পাড়, উত্তর পাড় এবং পূর্ব পাড় দিয়েই এগিয়ে গেলাম চর নিজামের ট্রলার ঘাটের দিকে। এতে আমাদের দেখার সুযোগ হলো প্রায় পুরো চরটাই। দক্ষিণ দিকে চিকন হয়ে এই চর মিশে গেছে নদী তথা সাগরে।
পরের দিন সকালে এই আনোয়ারার চর এবং চর নিজামের মাঝের অংশ দিয়েই আমরা ছুটে চললাম বঙ্গোপসাগরের দিকে। তখন অবশ্য কুয়াশা থাকায় সেভাবে আর দেখার সুযোগ হয়নি আনোয়ারার চরকে। আমরা শীতের শান্ত বঙ্গোসাগরের মোহনা দিয়ে এই চরের তিন পাশ ঘুরে দেখলাম দুই দিনে। তবে বর্ষার মৌসুম হলে এত সাহস নিয়ে ট্রলার চালাতে পারতেন না মাঝি। কারণ প্রবল ঢেউ। তখন হয়তো আমার মনেও এতটা আগ্রহ থাকত না পানি ডিঙ্গানোর।



