জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতা, নিরাপত্তা জোরদার ও প্রশাসনিক বিধিনিষেধের প্রভাব সরাসরি পড়ছে দেশের ব্যবসাবাণিজ্যে। পরিবহন চলাচল সীমিত হওয়া, পাইকারি বাজার আংশিক বন্ধ থাকা এবং ব্যাংকিং লেনদেন কমে যাওয়ায় স্বল্পমেয়াদে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ভোটের আগের দুই দিন ও ভোটের দিন মিলিয়ে সারা দেশে দৈনিক গড় লেনদেনের অন্তত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে যায়, যার আর্থিক পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকার সমান।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন সারা দেশে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান ঢাকায় প্রবেশ করে। নির্বাচনের আগের ৪৮ ঘণ্টায় এই সংখ্যা কমে প্রায় তিন হাজারে নেমে আসে, অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পায়। এতে কৃষিপণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও শিল্প কাঁচামাল সরবরাহে বিলম্ব ঘটে। পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, এক দিন পণ্য পরিবহন স্বাভাবিকের তুলনায় কম হলে প্রায় ৮০০ থেকে এক হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ পণ্যের গতি মন্থর হয়।
রাজধানীর কাওরান বাজার, চকবাজার ও চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানান, ভোটের আগের দিন পাইকারি বাজারে উপস্থিতি ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। শ্রমিক উপস্থিতিও কমে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে। খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের এক নেতা বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে এখানে দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়। ভোটের সময় তা নেমে আসে ২৫০ থেকে ৩০০ কোটিতে।’ অর্থাৎ শুধু একটি বড় পাইকারি বাজারেই দৈনিক প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকার লেনদেন কমে যায়।
নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার প্রভাব পড়ে খুচরা বাজারে। টিসিবি ও বাজার পর্যবেক্ষকদের তথ্যমতে, নির্বাচনের আগের সপ্তাহে ঢাকায় কাঁচা সবজির পাইকারি সরবরাহ গড়ে ২০ শতাংশ কমে। ফলে কিছু সবজির দাম কেজিতে পাঁচ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়ে। ব্রয়লার মুরগির সরবরাহ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমায় দাম কেজিতে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তে দেখা যায়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এটি স্থায়ী মূল্যবৃদ্ধি নয়; বরং সরবরাহ চেইনের সাময়িক বিঘেœর ফল।
শিল্প খাতেও নির্বাচনের প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। তৈরী পোশাক খাত দেশের মোট রফতানির প্রায় ৮৫ শতাংশ জোগান দেয়। বিজিএমইএ’র তথ্যমতে, প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ পোশাক উৎপাদন ও রফতানি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। নির্বাচনের দিন এবং আগের দিন কারখানার উপস্থিতি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমে গেলে উৎপাদন সূচিতে বিঘœ ঘটে। একজন রফতানিকারক জানান, এক দিন শিপমেন্ট মিস করলে কনটেইনার-প্রতি অতিরিক্ত এক হাজার থেকে দুই হাজার ডলার খরচ হয়। বড় অর্ডারের ক্ষেত্রে এটি কয়েক লাখ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে সাত থেকে আট হাজার কনটেইনার ওঠানামা হয়। নির্বাচনের সময় নিরাপত্তা জোরদার ও পরিবহন সীমিত থাকায় এই সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমে যায়। ফলে কনটেইনার জট তৈরি হলে ডেমারেজ চার্জ বাড়ার ঝুঁকি থাকে। বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, এক দিনের জটিলতায় আমদানি-রফতানিতে প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার কার্যক্রম বিলম্বিত হতে পারে।
ব্যাংকিং খাতেও ধীরগতি দেখা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক কর্মদিবসে আন্তঃব্যাংক লেনদেন (আরটিজিএস ও ইএফটি) মিলিয়ে দৈনিক গড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। ভোটের আগের দিন এই পরিমাণ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমে যায়। এলসি খোলা ও বড় অঙ্কের আমদানি বিল নিষ্পত্তিতেও বিলম্ব ঘটে। আমদানিকারকরা জানান, দুই দিনের বিলম্বে সুদ ও সংরক্ষণ খরচ বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের মূল্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা তুলনামূলক বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন। এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৭৮ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ রয়েছে, যা মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮০ শতাংশ জোগান দেয়। নির্বাচনের সময় দুই থেকে তিন দিন বিক্রি কমে গেলে তাদের মাসিক আয়ের ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হয়। রাজধানীর নিউ মার্কেটের এক ব্যবসায়ী বলেন, স্বাভাবিক দিনে দুই লাখ টাকার বিক্রি হলে ভোটের সময় তা নেমে আসে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকায়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নির্বাচনের প্রভাব সাধারণত স্বল্পমেয়াদি হলেও ঘন ঘন রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলে তা সামষ্টিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের জিডিপি বর্তমানে প্রায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। দৈনিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণ আনুমানিক ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। যদি নির্বাচনকে ঘিরে দুই থেকে তিন দিন ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কার্যক্রম কমে যায়, তাহলে হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ উৎপাদন ও লেনদেন স্থগিত থাকে।
তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীরা সাধারণত নির্বাচন-পূর্ব সময়ে অপেক্ষা-দেখো নীতি গ্রহণ করেন। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুযায়ী, বড় বিনিয়োগ প্রস্তাবের একটি অংশ নির্বাচন-পূর্ব তিন মাসে অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকে। এতে অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ সাময়িকভাবে কমে যায়।
তবে ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন, প্রশাসনিক সমন্বয় জোরদার করলে ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখা, বন্দর কার্যক্রম চালু রাখা এবং ব্যাংকিং লেনদেন ডিজিটাল মাধ্যমে সচল রাখলে সরবরাহ চেইনের চাপ কমে। বর্তমানে দেশে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের গ্রাহক সংখ্যা ২০ কোটির বেশি অ্যাকাউন্টে পৌঁছেছে, যার মাধ্যমে দৈনিক কয়েক হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। নির্বাচনের সময় সরাসরি বাজারে উপস্থিতি কমলেও ডিজিটাল লেনদেন কিছুটা ভারসাম্য রক্ষা করে।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অপরিহার্য অংশ হলেও এর সাথে জড়িত অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক কড়াকড়ির কারণে স্বল্পমেয়াদে ব্যবসাবাণিজ্যে ধীরগতি দেখা দেয়। পরিবহন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে যাওয়া, পাইকারি বাজারে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ লেনদেন হ্রাস, ব্যাংকিং লেনদেনে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমতি- সবমিলিয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সাময়িকভাবে স্থবির হয়ে পড়ে। তবে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থা ফিরলে এই ক্ষতি আংশিক পুষিয়ে নেয়া সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



