কবিতার জীবনকাল : হাসান নাজমুল

Printed Edition
কবিতার জীবনকাল : হাসান নাজমুল
কবিতার জীবনকাল : হাসান নাজমুল

মানুষের জীবনকালের মতো কবিতারও জীবনকাল রয়েছে। তবে এ জীবনকালের মধ্যে আছে ঢের পার্থক্য। একজন সাধারণ মানুষের জীবনকাল সীমাবদ্ধ। অথচ একজন অসাধারণ মানুষের জীবনকাল সীমাহীন। মৃত্যুর পরেও একজন অসাধারণ মানুষ তার অসাধারণ কাজের জন্য জীবিত থাকে যুগ যুগ ধরে। অনুরূপভাবে অকবিতার জীবদ্দশা সীমাবদ্ধ। অকবির উদর হতে অনায়াসে বেরিয়ে অকবিতা সাময়িক অবস্থান করে মাত্র। অকবির তৃপ্তির সীমার মাঝেই অকবিতার বসবাস। আর কবিতার জীবনকাল অসাধারণ মানুষের জীবনকালের মতোই অসীম। আবার এটাও সত্য যে, কবিতা বেঁচে থাকে ভাষার জীবনকালের ভিতর। কবিতায় ব্যবহৃত ভাষার বোধগম্যের ভিতর। শব্দ-শরীরের ভিতর। শব্দের সহজবোধ্যতার ভিতর। কবিতায় ব্যবহৃত অনুষঙ্গের ভিতর। কাজেই শব্দ, ভাষা, শব্দ ও ভাষার সহজবোধ্যতা এবং কবিতার উপাদান সম্পর্কে একজন কবিকে অবশ্যই ওয়াকিবহাল থাকতে হবে। তবেই কবি তার কবিতার খরভব উঁৎধঃরড়হ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হবে। শব্দের সহজবোধ্যতা, ভাষার বোধগম্যতা তৈরিতে পারদর্শী কবি শামসুর রাহমানের ‘আবার এসেছো তুমি’ কবিতার কয়েক পঙ্ক্তি পড়ে নেয়া যাক-

আবার এসেছো তুমি বৃক্ষতলে খর পূর্ণিমায়

নিঃশব্দে পেরিয়ে ডোরাকাটা পথ, শাড়ির হিল্লোল

তুলে নিরিবিলি, দেখলাম। মোহন ছন্দের দোল

তোমার সত্তায়, তুমি জ্যোৎস্নাময় হেসে নিরালায়

চলো যাই বলে ওঠে গেলে যানে, আস্তে পুনরায়

বসেছি তোমার পাশে আগেকার মতো, ডামাডোল

চতুর্দিকে, পুলিশের হুইসিল, কারো রাগী বোল

ভেসে আসে, কখনোবা রবীন্দ্রসংগীত বয়ে যায়।

উপরোক্ত আটটি পঙ্ক্তি পড়ে বোদ্ধা পাঠক সহজেই উপলব্ধি করতে পারেন পঙ্ক্তিগুলো অক্ষরবৃত্ত ছন্দে লেখা। পঙ্ক্তিগুলোর মিলবিন্যাস : কখখক কখখক। ছন্দ, অন্ত্যমিল আর সহজবোধ্যতা পঙ্ক্তিগুলোকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখবে।

কবি কবিতার জীবনদাতা। কবিতার জীবনদাতা হিসেবে কবিকে শিল্পশূন্য হলে চলবে না। শব্দশূন্য আর ভাষাশূন্য হলেও চলবে না। কবির হৃদয় হতে হবে শিল্পভাণ্ডার, শব্দ আর ভাষার ভাণ্ডার। কবিহৃদয়ে থাকতে হবে সমসাময়িক চিন্তা আর দর্শনের দোকান। থাকতে হবে বৈশ্বিক ও ঐশ্বরিক জ্ঞান। হতে হবে পক্ষপাতহীন এবং নির্ভীক।

শিল্পসুষমার পাশাপাশি কবিতার থিমও কবিতাকে দীর্ঘজীবী করে। অসংখ্য থিমের মাঝে প্রেম কবিতার অন্যতম মানুষসংশ্লিষ্ট থিম। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়

তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি শত রূপে শতবার

জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।

চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয় গাঁথিয়াছে গীতহার

কত রূপ ধরে পরেছ গলায়, নিয়েছ সে উপহার

জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।

  • (অনন্ত প্রেম)

পঙ্ক্তিগুলো অন্ত্যমিলসমৃদ্ধ, মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা। প্রেম পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে নাড়া দেয়। প্রেম, ছন্দ আর ভাষার বোধগম্যতার কারণে আরো শত সহস্র বছর পঙক্তিগুলো মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই পাবে।

পৃথিবীতে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি। দারিদ্র্য মানুষকে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে রাখে। কবি ছাড়া দারিদ্র্য নিয়ে ভাবার মানুষ খুব কম। অতএব কবিতার বিষয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘দারিদ্র্য’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘দারিদ্র্য’ বিষয়ে আলোচনামাত্রই দরিদ্র মানুষের কবি এবং পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের নিচের পঙ্ক্তিগুলো অনায়াসে মুখে চলে আসে

হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান।

তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিষ্টের সম্মান

কণ্টক-মুকুট শোভা।-দিয়াছ, তাপস,

অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস;

  • (দারিদ্র্য)

পঙ্ক্তি চারটি অক্ষরবৃত্ত ছন্দে লেখা। শব্দ ও ভাষায় সহজ। দরিদ্র মানুষেরা সাধারণত হতাশ হয়ে থাকে। নজরুলের ‘দারিদ্র্য’ কবিতার পঙ্ক্তিগুলো পড়ে হতাশা দূর করতে সক্ষম হবে। কাল থেকে কালে কেবলই ভাবতে থাকবে দারিদ্র্যও মানুষকে মহান করতে পারে। একই সাথে ক্রমশ কবিতাটির আয়ু বৃদ্ধি পেতে থাকবে।

যে কবিতার থিম প্রেম ও প্রকৃতি, সে-কবিতাই বেঁচে থাকে মানুষের হৃদয়ে। কেননা প্রেম ও প্রকৃতি মানুষসংশ্লিষ্ট। মানুষসংশ্লিষ্ট সবই স্বয়ং মানুষই বাঁচিয়ে রাখে। প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশের প্রকৃতি ও দেশপ্রেমের একটি কবিতার কয়েক পঙ্ক্তি পড়ে নেয়া যাক

এই ডাঙা ছেড়ে হায় রূপ কে খুঁজিতে যায় পৃথিবীর পথে।

বটের শুকনো পাতা যেন এক যুগান্তের গল্প ডেকে আনে :

ছড়ায়ে রয়েছে তারা প্রান্তরের পথে পথে নির্জন অঘ্রাণে

তাদের উপেক্ষা করে কে যাবে বিদেশে বল, আমি কোনো মতে

বাসমতী ধানক্ষেত ছেড়ে দিয়ে মালাবারেউটির পর্বতে

যাব নাকো দেখিব না পামগাছ মাথা নাড়ে সমুদ্রের গানে

  • (এই ডাঙা ছেড়ে হায়)

উপরোক্ত পঙ্ক্তি ছয়টি অক্ষরবৃত্ত ছন্দে ৮+৮+৬-এর চালে লেখা। রূপভর্তি বাংলার ডাঙা ছেড়ে কবি পৃথিবীর অন্য কোথাও যেতে নারাজ। বাংলার প্রকৃতি উপেক্ষা করে কবি বিদেশ যেতে চান না। পঙ্ক্তিগুলোর পরতে পরতে রয়েছে প্রকৃতির ছোঁয়া। প্রকৃতিপূর্ণ দেশপ্রেমের এসব পঙ্ক্তি বেঁচে রবে বহুকাল।

যে কবি দেশকে তার কবিতায় জীবিত রাখে, দেশ ও দেশের মানুষেরাও সে কবির কবিতা পাঠের মাধ্যমে কবিকে বাঁচিয়ে রাখে যুগ থেকে যুগান্তরে। কোনো কোনো কবি কখনো কখনো মনের অজান্তে এমন সব দেশপ্রেমের বিখ্যাত পঙ্ক্তি লিখে ফেলেন যার দরুন সে কবি খ্যাতির চূড়ান্ত শিখরে আরোহণ করেন। নব্বই দশকের অন্যতম শক্তিশালী কবি জাকির আবু জাফরের দেশপ্রেমের এমন কয়েকটি বিখ্যাত পঙ্ক্তি পড়ে নেয়া যাক-

জগতের সব ফুল থেকে রঙ তুলে

শাপলার ঠোঁটে লিখি বাংলাদেশের নাম

হঠাৎ ভিজিয়ে রাখে টুপটাপ শিশিরের জল

প্রজাপতি ঠোঁট ধুয়ে ফুলে লেখে বিজয় চুম্বন

বিজয় বিজয় বলে বুকে রাখি বাংলাদেশ।

(বুকে রাখি বাংলাদেশ)

যে কবি পৃথিবীর সব ফুল থেকে রঙ সংগ্রহ কোরে শাপলার ঠোঁটে বাংলাদেশের নাম লিখতে পারেন এবং নিজস্ব বুকে দেশকে ধারণ করতে সক্ষম হন, সে কবির কবিতা সময়ের নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকতে পারে না। সে কবির কবিতা সময়সীমাকে অতিক্রম করে অনায়াসে।

জাত কবিদের সম্মিলিত সমালোচনা এবং পাঠের মাধ্যমে জাত কবিতা সাধারণ পাঠকের দৃষ্টিগোচর হয়। একই সাথে সাধারণ মানুষ এবং পাঠকের সংস্পর্শে আসতে আসতে জনপ্রিয় কবিতায় পরিণত হয়ে যায়। মূলত প্রকৃত কবিরাই প্রকৃত কবিতার মানদণ্ড নিরূপণ করে থাকেন এবং প্রকৃত কবিতা নির্ণয় কোরে পাঠকমহলে ছেড়ে দেন। আর এভাবেই একটি কবিতা মহাকালের গর্ভে টিকে যায়। ‘নবিনামা’ মহাকাব্যের কবি এবং নব্বইয়ের দশকের অন্যতম শক্তিশালী কবি সায়ীদ আবুবকরের দেশপ্রেমের একটি প্রকৃত এবং ঝঁংঃধরহধনষব কবিতা পড়ে নেয়া যাক-

আকাশের পাহাড়চূড়ায় বসে দেখি যার মুখ

বারবার; মানবীর হাত ধরে রোমের রাস্তায়

হাঁটতে হাঁটতে যার কথা মনে পড়ে; পোষ মানা

পায়রার মতো দিন শেষে রোজ পরম আস্থায়

যার কাছে ফিরে আসে হৃদয়, শরীর; আমি যার

চোখ চোখে নিয়ে হলদে পাখির রূপ দেখি, কাক

আর ভাটশালিকের গদ্যময় ওড়াউড়ি দেখে

হয়ে যাই প্রতিদিন বিমুগ্ধ বিস্ময়ে রুদ্ধবাক

সে আমার বাংলাদেশ তৃষ্ণার পানির মতো প্রিয়

চৈত্রের দুপুরে; শীতের সকালে সে কাশ্মিরি শাল;

ঝড় ও বাদলায় নিরাপদ নীড়; নদীর উজানে

তন্দুর রুটির মতো ফুলে ওঠা সৌভাগ্যের পাল

পালে তার নাম লিখে শতাব্দীর আমি শেষ মাঝি

নেমেছি অথই গাঙে, ধরেছি জীবনটাকে বাজি

(বাংলাদেশ)

সায়ীদ আবুবকরের ‘বাংলাদেশ’ অক্ষরবৃত্ত ছন্দে লেখা একটি নিখুঁত কবিতা। কবিতাটিতে কবি গুচ্ছ গুচ্ছ ওসধমবৎু ব্যবহার করেছেন। কয়েক পঙ্ক্তিতে ব্যবহার করেছেন উপমা ও উৎপ্রেক্ষা। প্রতিটি স্তবকের দ্বিতীয় ও চতুর্থ পঙ্ক্তিতে এবং শেষ দু’টি পঙ্ক্তিতে কবি অন্ত্যমিল ব্যবহার করেছেন। অতএব, কবিতাটিকে নির্দ্বিধায় একটি ঝঁংঃধরহধনষব কবিতা বলা যেতেই পারে।

শব্দ ও ভাষাকে ছন্দ, অলঙ্কার আর শিল্পরূপ দান করে কবি যখন তার কবিতায় দেশ ও দশের কথা বলে, মানুষসংশ্লিষ্ট বিষয়ের কথা বলে, যাপিত জীবনের কথা বলে এবং স্রষ্টার সৃষ্ট পৃথিবী ও নিসর্গের কথা বলে, তখন কবির কবিতা ক্রমশ টেকসই হতে থাকে। টেকসই হতে হতে মহাসময়কেও অতিক্রম করে। হ