প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কাজ শুরু প্রধানমন্ত্রীর

‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়নে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন

ইকবাল মজুমদার তৌহিদ
Printed Edition
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সচিবালয়ে সেনা, নৌ ও বিমানবাহীর প্রধান সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন : নয়া দিগন্ত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সচিবালয়ে সেনা, নৌ ও বিমানবাহীর প্রধান সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন : নয়া দিগন্ত

  • অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হবে সব প্রতিশ্রুতি
  • পরীক্ষামূলকভাবে রমজানেই চালু করা হবে ফ্যামিলিকার্ড
  • ৩ বাহিনীর প্রধানের সাথে বৈঠক

মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলার স্থিতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সব মৌলিক বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা বাস্তবায়ন করতে প্রধানমন্ত্রী কাজ শুরু করেছেন। নানা উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নসহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব প্রতিশ্রুতি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। এ ছাড়া রমজান মাসেই পরীক্ষামূলকভাবে ফ্যামিলিকার্ড বিতরণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করছে সরকার।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মনোভাব ও কর্মকাণ্ডের মধ্যে রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে। তার এই মনোভাব জনগণের মধ্যে আশা দেখাচ্ছে বলেও জানান তারা।

প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারি গাড়ি ব্যবহার না করার ঘোষণার পর এবার যানজটের কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তার গাড়িবহরের সংখ্যা কমিয়ে ফেলা হয়েছে। এতদিন প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরের সংখ্যা ছিল ১৩ থেকে ১৪টি। সেটি কমিয়ে চারটি করা হয়েছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী এখন থেকে মন্ত্রিসভার বৈঠক সচিবালয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারণ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক হলে সব মন্ত্রীর সচিবালয় থেকে যাতায়াতে জট সৃষ্টি হয়, ভিআইপি চলাচলে সাধারণ মানুষ ভোগান্তির মুখে পড়ে। সেসব কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে বেশির ভাগ সময় মন্ত্রিসভার বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

রাজধানীতে জনদুর্ভোগ এড়াতে প্রধানমন্ত্রীর যাত্রাপথে সড়কের দুইধারে পোশাকধারী পুলিশের অবস্থানের যে বিধান, তা বন্ধ করার জন্যও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন।

ফ্যামিলিকার্ড : গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী ডা: এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানান, রাজনৈতিক বিবেচনায় এই ফ্যামিলি কার্ড দেয়া হবে না। এ ছাড়া ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রে কোনো মধ্যস্বত্বভোগীও থাকবে না। ফ্যামিলিকার্ড দেয়া হলে চলমান ভাতাগুলোও অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।

কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ সাংবাদিকদের বলেন, আমরা কত দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু করতে পারি, এটি নিয়ে আজকের মিটিং ছিল। এই ঈদের আগেই পাইলট বেসিসে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করার বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে কতটুকু করা যায়, কত দ্রুত করা যায়, সংখ্যায় কত হবে এ নিয়ে আমরা বোধ হয় দুই এক দিনের মধ্যে ফাইনাল করব।

এদিকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানান, প্রথমে হতদরিদ্রদের ফ্যামিলি কার্ড দেয়া হবে। সুনির্দিষ্টভাবে কোন জেলায় কতজনকে দেয়া হবে সেটা আমরা এখনো ঠিক করিনি। তবে আগেই কিছু এরিয়া আমাদের ফিক্সড করা আছে, যেখানে একটা সার্ভে করা আছে। ওই রিপোর্টটা আমার কাছে নেই, তবে জানি যে বেশ কয়েকটা জেলাতে কিছু উপজেলাকে আগেই নির্দিষ্ট করা আছে।

ফ্যামিলি কার্ডের ভেতরে কী কী সুবিধা থাকবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এর ভেতরে সম্ভবত আমরা চেষ্টা করছি, ক্যাশ টাকা দেব, স্পেশালি মহিলাদের।

প্রধানমন্ত্রীর সাথে ৩ বাহিনী প্রধানের সাক্ষাৎ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান।

বৃহস্পতিবার সকালে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে এই সাক্ষাৎ হয় বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেসসচিব আতিকুর রহমান রুমন।

তিনি বলেন, সকালে প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে দ্বিতীয় দিনের মতো অফিস করেছেন। দিনের কর্মসূচি অনুযায়ী গতকাল তিন বাহিনী প্রধান প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পর এটাই তার সাথে তিনবাহিনীর প্রধানের প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত : রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশগঠনের বিষয়ে খুব সিরিয়াস। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পরে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরে গাড়ির সংখ্যা কমানো, এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি না করা, সরকারি প্লট বরাদ্দ বন্ধ, সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক করাসহ যেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন তা অত্যন্ত ইতিবাচক, যা দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রধানমন্ত্রীর এসব সিদ্ধান্ত জনগণের মনে স্থান করে নিয়েছে বলেও জানান তারা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা: শাখওয়াত হোসেন সায়ান্ত নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সরকারি গাড়ি ব্যবহার না করা, এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়িসুবিধা বন্ধ, প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরে গাড়ির সংখ্যা কমানো এগুলো হলো জনগণের মধ্যে পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা ছিল তার প্রথম ধাপ। প্রধানমন্ত্রীর এসব সিদ্ধান্তে জনগণ খুশি হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আমার বিশ্বাস রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনের যে স্বপ্ন প্রধানমন্ত্রী জনগণকে দেখিয়েছেন তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এ প্রসঙ্গে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এসব সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়। তার এসব সিদ্ধান্ত দেশের দুর্নীতিবাজদের লাগাম টানতে সহায়ক হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করি।

সরকারের চ্যালেঞ্জ : বিশ্লেষকরা মনে করেন, বর্তমান সরকার রমজানের শুরুর দিকে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এ সময়টা সাধারণত নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট ভেঙে নিত্যপণ্যের দাম স্বাভাবিক রাখা সরকারের জন্য এই মুহূর্তে প্রধান চ্যালেঞ্জ।

তারা আরো মনে করেন, হাসিনা সরকার পতনের পর মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে। জনগণের মধ্যে অনেক বেশি প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছে। তারা রাষ্ট্রের প্রতিটা সেক্টর পরিচ্ছন্ন দেখতে চায়। এটা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার আগে অনেকগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করা সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে রাষ্ট্রের প্রতিটা সেক্টর, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশী ঋণের বোঝা রেখে গেছে। এসব বিষয় মোকাবেলা করে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাকা সচল করাও বর্তমান সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়নে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন : এ কমিটি মূলত ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের একটি উপযুক্ত নকশা বা ডিজাইন এবং সুবিধাভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি প্রণয়ন করবে। প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের আটটি বিভাগের প্রতিটিতে একটি করে উপজেলা নির্বাচন করে সেখানে এ কার্ড প্রবর্তনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারের আর্থিক সুরক্ষায় দেশের আটটি বিভাগের আটটি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলটিং) ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। এ কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে অর্থমন্ত্রীকে সভাপতি করে ১৫ সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ কমিটি গঠন সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী। এছাড়া স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ও মাহ্দী আমিন, মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ সাতটি মন্ত্রণালয়ের সচিব এ কমিটিতে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এ কমিটি মূলত ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের একটি উপযুক্ত নকশা বা ডিজাইন এবং সুবিধাভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি প্রণয়ন করবে। প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের আটটি বিভাগের প্রতিটিতে একটি করে উপজেলা নির্বাচন করে সেখানে এ কার্ড প্রবর্তনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রজ্ঞাপনে আরো জানানো হয়, নারীদের জন্য বিদ্যমান অন্য কোনো কর্মসূচিকে এ কার্ডের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না, কমিটি তা পর্যালোচনা করবে। এছাড়া সুবিধাভোগীদের ডাটাবেজ তৈরির লক্ষ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ন্যাশনাল হাউজহোল্ড ডাটাবেইজের মধ্যে আন্তঃসংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে একটি ডিজিটাল এমআইএস প্রণয়নের সুপারিশ করবে এ কমিটি। আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। সেই লক্ষ্য পূরণে আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রণয়ন করতে বলা হয়েছে কমিটিকে।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কমিটির সভা প্রয়োজন অনুসারে অনুষ্ঠিত হবে এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেবে। কমিটি প্রয়োজনে যেকোনো নতুন সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষমতা রাখবে।