আদালতে অবরুদ্ধ হিসাব থেকে শুল্ককর আদায়ের উদ্যোগ

সুপারিশ দেয়ার জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ে কমিটি গঠন

Printed Edition

সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু

বিদেশে পাচারকৃত সম্পদের মধ্যে আদালত কর্তৃক অবরুদ্ধ/সংযুক্ত হিসাব থেকে শুল্ক ও কর আদায় করতে চায় সরকার। এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ ও কার্যকর ব্যবস্থায় নেয়ার জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ে কমিঠি গঠন করা হয়েছে। সাত সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে অ্যাটর্নি জেনারেলকে।

গতকাল রোববার অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে এই কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়েছে। কমিটির অন্যান্য সদস্যর মধ্যে রয়েছেন- আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কেন্ত্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংক অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব, দুর্নীতি দমন কমিশনের মানি লন্ডারিং বিভাগের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান কর্মকর্তা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টিলিজেন্স সেলের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডির (অর্গানাইজড ক্রাইম) ডিআইজি এবং এনবিআরের কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক। সূত্র জানায়, কমিটির কার্যপরিধি বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘বিদেশে পাচারকৃত সম্পদের মধ্যে আদালত কর্তৃক অবরুদ্ধ/সংযুক্ত হিসাব থেকে সরকারের শুল্ক ও কর আদায়ের ক্ষেত্রে আইনি ও অন্যান্য পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা প্রণয়ন করবে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ও সম্পদ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া বর্তমানে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়। দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং কর ফাঁকির মাধ্যমে অর্জিত এসব সম্পদের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে দেশের আদালত কর্তৃক অবরুদ্ধ করা হয়েছে। তবে আইনি মারপ্যাঁচ এবং আন্তর্জাতিক জটিলতার কারণে এই অবরুদ্ধ হিসাব বা সম্পত্তি থেকে সরকারের বকেয়া শুল্ক ও কর আদায় এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ না করলে আদালতের রায়ের দীর্ঘসূত্রতায় এই সম্পদ থেকে রাজস্ব আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। তার জন্য এই কমিটিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা নিজেদের মধ্য বৈঠক করে এ বিষয়ে একটি সুপারিশমালা প্রণয়ন করে সরকারের কাছে জমা দেবে।

রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, কোনো করদাতা বা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব আদালতের নির্দেশে অবরুদ্ধ বা সংযুক্ত হলে সংশ্লিষ্ট হিসাব থেকে সরকারের পাওনা অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে আদালতের আদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই সরাসরি অর্থ উত্তোলনের পরিবর্তে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রাজস্ব কর্তৃপক্ষকে মামলার নথি, আদালতের আদেশ এবং সরকারের পাওনার পরিমাণ যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে। এতে সময়ক্ষেপণের একটি বিষয়তো রয়ে গেছে।

আইনি জটিলতা ও বর্তমান অন্তরায়

সূত্র জানায়, দেশের প্রচলিত মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন এবং আয়কর ও শুল্ক আইনের আওতায় আদালতের নির্দেশে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তি জব্দ করা হয়। তবে অবরুদ্ধ এসব সম্পদ থেকে সরকারের রাজস্ব পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলো হলো :

জুরিডিকশন বা ভৌগোলিক সীমানা : পাচারকৃত সম্পদ ও ব্যাংক হিসাবগুলো বিভিন্ন বিদেশী রাষ্ট্রে অবস্থিত হওয়ায় সেসব দেশের নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়া ও সার্বভৌমত্ব মেনে চলতে হয়।

মালিকানা প্রমাণের দীর্ঘসূত্রতা : পাচারকারীরা সাধারণত বেনামি কোম্পানি, শেল কোম্পানি বা আত্মীয়স্বজনের নামে সম্পদ লুকিয়ে রাখায় প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ এবং কর ফাঁকির সঠিক পরিমাণ নিরূপণ সময়সাপেক্ষ।

মামলার দীর্ঘসূত্রতা : ফৌজদারি মামলা নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ সময় লাগায় আদালতের চূড়ান্ত রায় আসার আগ পর্যন্ত অবরুদ্ধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত বা সরকারের অনুকূলে হস্তান্তরের আইনি সুযোগ সীমিত থাকে।

এ দিকে সর্বশেষ পাওয়া সরকারি/সংসদীয় তথ্য অনুযায়ী, ২৫ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত বিদেশে আদালতের নির্দেশে ক্রোক (সংযুক্ত) ও অবরুদ্ধ করা সম্পদের পরিমাণ ছিল দেশে ও বিদেশে মিলিয়ে মোট : ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকা ।

তবে এটি পাচার হওয়া মোট অর্থের পরিমাণ নয়- এটি আদালতের আদেশে ইতোমধ্যে ক্রোক/অবরুদ্ধ করা সম্পদের মূল্য। সরকারের শ্বেতপত্রের হিসাবে ২০০৯-২০২৩ সময়ে বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে বিদেশে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ ছিল ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

আরো সাম্প্রতিকভাবে, চলতি জুলাই মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউ জানায়, ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মানিলন্ডারিং তদন্তে দেশে-বিদেশে মোট প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা সম্পদ আদালতের আদেশে ফ্রিজ/সংযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বিদেশে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা রয়েছে।