আশরাফুল ইসলাম
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত আলোচিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত জোরদার করা হয়েছে। দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির অন্যতম হিসেবে আলোচনায় রয়েছে এস আলম গ্রুপ। একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ, হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি এবং বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগে গ্রুপটির বিরুদ্ধে নজিরবিহীন তদন্ত ও সম্পদ উদ্ধার কার্যক্রম চলছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), আদালত ও অন্যান্য তদন্ত সংস্থার সমন্বিত পদক্ষেপে দেশে-বিদেশে বিপুল পরিমাণ সম্পদ শনাক্ত, জব্দ ও ফ্রিজ করা হলেও অধিকাংশ সম্পদ এখনো রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে- লুট হওয়া অর্থ কোথায়, কী অবস্থায় আছে এবং ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ আদৌ কতটা ফেরত পাওয়া সম্ভব?
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ কিংবা সম্পত্তি ক্রোক করা সম্পদ উদ্ধারের প্রথম ধাপ মাত্র। তদন্তে উঠে এসেছে যে, অভিযুক্তদের সম্পদের একটি বড় অংশ আত্মীয়স্বজন, সহযোগী প্রতিষ্ঠান, শেল কোম্পানি (কাগজে-কলমে থাকা প্রতিষ্ঠান) ও বিদেশি ট্রাস্টের নামে স্থানান্তর করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ করা, বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্তকরণ এবং তা দেশে ফিরিয়ে আনা এখন রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ
এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে পরিচালিত তদন্তে এখন পর্যন্ত দেশে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ শনাক্ত করা হয়েছে। সরকারি তথ্যানুযায়ী, গ্রুপটির নামে থাকা প্রায় চার হাজার ২৬৪ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ (জমি, বাড়ি ও ফ্ল্যাট) জব্দের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি আদালতের নির্দেশে ছয় হাজার ৬৯২ কোটি টাকার শেয়ার জব্দ করা হয়েছে।
এর বাইরে ১৭১টি কোম্পানির প্রায় ২৪ হাজার ৮১১ কোটি টাকার শেয়ার ও মালিকানা স্বার্থ আদালতের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার প্রক্রিয়া চলমান। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, এসব প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং ঋণের অর্থ বিভিন্ন স্তরে হস্তান্তরের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।
এর আগে আদালত এস আলম ও তার পরিবারের ১৬টি স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক এবং ৬৮টি ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তদন্তের অগ্রগতির সাথে সাথে নতুন নতুন সম্পদ শনাক্ত হওয়ায় জব্দের পরিধিও ক্রমাগত বাড়ছে।
ব্যাংক হিসাব ও শেয়ার অবরুদ্ধের তালিকাও দীর্ঘ হচ্ছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) জানিয়েছে, এস আলম গ্রুপসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ৬৬২টি ব্যাংক হিসাবে থাকা প্রায় ২৪৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা ফ্রিজ করা হয়েছে। একই সাথে ২২৭টি বিও অ্যাকাউন্টে থাকা প্রায় ৮১৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকার শেয়ার অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
এসব হিসাব বিশ্লেষণ করে সন্দেহজনক লেনদেনের বিষয়ে পৃথক গোয়েন্দা প্রতিবেদন প্রস্তুত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পাঠানো হয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, ব্যাংক হিসাবের বাইরেও আরো বহু সম্পদ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকায় অনুসন্ধানের কাজ অব্যাহত রয়েছে।
বিদেশে সম্পদ উদ্ধারে পদক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক ফার্ম নিয়োগ
বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে সিঙ্গাপুরে। আদালতের নির্দেশে এস আলম, তার স্ত্রী ও সন্তানদের নামে থাকা ৪০টিরও বেশি ব্যাংক হিসাব, একাধিক বীমা পলিসি, প্রায় ছয় কোটি ৮০ লাখ সিঙ্গাপুর ডলারের বিনিয়োগ, বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার ও পরিচালক হিসেবে মালিকানা এবং অন্যান্য আর্থিক সম্পদ ফ্রিজ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, বিদেশে একটি বাড়ি, ৬২টি ব্যাংক হিসাব, ১৪টি কোম্পানির সম্পদ এবং ছয়টি ট্রাস্ট ফান্ডসহ প্রায় তিন হাজার ২২২৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দের জন্য আদালতের নির্দেশ জারি করা হয়েছে। এ ছাড়া- যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, হংকং, কানাডা এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে থাকা সম্পদের তথ্য সংগ্রহের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নেয়া হচ্ছে।
এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের করা হচ্ছে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত দ্রুত এগোচ্ছে। সর্বশেষ দায়ের হওয়া বড় মামলাগুলোর একটিতে এস আলমসহ ৬৬ জনের বিরুদ্ধে ইসলামী ব্যাংক থেকে ঋণের নামে প্রায় ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও এর একটি অংশ সিঙ্গাপুরে পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ ছাড়া অর্থপাচারের অভিযোগে যৌথ তদন্তের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে ২৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি মামলায় চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে এবং বাকি মামলাগুলো তদন্ত ও বিচারাধীন রয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া মাত্রই আরো নতুন মামলা দায়ের করা হবে। অপর দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএফআইইউ কেবল হিসাব ফ্রিজ করেই ক্ষান্ত হয়নি। সন্দেহজনক লেনদেন বিশ্লেষণ, অর্থপাচারের রুট শনাক্তকরণ, বিদেশী আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার সাথে তথ্যবিনিময় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সম্পদ উদ্ধারের কৌশল বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
একই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠান (ল ফার্ম) নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। উদ্ধার না হলে ফি নেই নীতিতে নিয়োগ পাওয়া এসব প্রতিষ্ঠান সম্পদ উদ্ধার করতে পারলেই কেবল তাদের পারিশ্রমিক পাবে। আন্তর্জাতিকভাবে এটি সম্পদ পুনরুদ্ধারের একটি অত্যন্ত কার্যকর কৌশল হিসেবে বিবেচিত।
সম্পদ উদ্ধারে দীর্ঘসূত্রতার কারণ ও বাস্তবতা
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নানা জটিলতার কারণে সম্পদ উদ্ধারে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিয়েছে। যদিও জব্দ হওয়া সম্পদের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে, তবুও সেগুলোর অধিকাংশ এখনো রাষ্ট্রের আইনি মালিকানায় আসেনি। কারণ আদালতের চূড়ান্ত রায় ছাড়া এসব সম্পদ বাজেয়াপ্ত বা বিক্রি করা আইনিভাবে সম্ভব নয়।
বিদেশে থাকা সম্পদ ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট দেশের আদালতের অনুমোদন, পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া অনেক সম্পদ শেল কোম্পানি, ট্রাস্ট কিংবা আত্মীয়স্বজনের নামে নিবন্ধিত থাকায় প্রকৃত মালিকানা প্রমাণ করা সময়সাপেক্ষ। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন আইনি কাঠামোর কারণেও সম্পদ উদ্ধারের গতি ধীর হয়ে পড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সম্পদ জব্দ হওয়া মানেই যে ব্যাংকের সব অর্থ সাথে সাথে ফেরত পাওয়া যাবে- এমনটি নয়। কারণ অনেক ঋণের বিপরীতে থাকা জামানতের বর্তমান বাজারমূল্য মূল ঋণের তুলনায় অনেক কম। আবার অনেক সম্পদ নিয়ে মালিকানাসংক্রান্ত আইনি বিরোধ রয়েছে। ফলে সব সম্পদ বিক্রি করলেও শতভাগ অর্থ উদ্ধার সম্ভব না-ও হতে পারে।
তবে তারা মনে করেন, দ্রুত তদন্ত সমাপ্তি, বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচারকাজ সম্পন্ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার এবং আধুনিক ‘অ্যাসেট রিকভারি’ কৌশল গ্রহণ করা গেলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
টাস্কফোর্স গঠন ও স্থায়ী সমাধানের সুপারিশ
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পদ উদ্ধারের প্রক্রিয়াটি সফল করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক, বিএফআইইউ, এনবিআর, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিত করে একটি স্থায়ী জাতীয় অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স গঠন করা জরুরি। একই সাথে বিদেশী আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা, আন্তর্জাতিক আইনি বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আদালতের সাথে সমন্বয় আরো জোরদার করতে হবে।
তাদের মতে, শুধু এস আলম নয়- ব্যাংক খাতের এই অরাজকতা ও অনিয়মে জড়িত সব ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর সম্পদ দ্রুত শনাক্ত, সংরক্ষণ এবং আইনি প্রক্রিয়ায় বাজেয়াপ্ত করা গেলে ভবিষ্যতে আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ও কঠোর বার্তা পৌঁছাবে।
এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে পরিচালিত তদন্তে দেশে-বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ, শত শত ব্যাংক হিসাব ও শেয়ার ফ্রিজ এবং একাধিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা রাষ্ট্রীয় নজরদারিতে এলেও, প্রকৃত অর্থে অর্থ উদ্ধার এখনো একটি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা, ত্বরান্বিত বিচারব্যবস্থা এবং সমন্বিত রাষ্ট্রীয় কৌশল অপরিহার্য। এই প্রক্রিয়া সফল হলে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক পুনরুদ্ধারই হবে না, বরং দেশের ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহিতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের বড় আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধেও এটি একটি যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।



