লক্ষ্মীছড়িতে প্রাথমিক শিক্ষার বেহাল দশা

২৩৪ পদের মধ্যে শূন্য ৭৪ পদ

Printed Edition

মোবারক হোসেন লক্ষ্মীছড়ি (খাগড়াছড়ি)

স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান ও চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে শিক্ষাই একটি জাতির ভিত্তি। কিন্তু খাগড়াছড়ি জেলার দুর্গম উপজেলা লক্ষ্মীছড়িতে সেই ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। শিক্ষক সঙ্কট, অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার কারণে উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা এখন চরম দুরবস্থায়। মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুরা। দুর্গম পার্বত্য এলাকায় শিক্ষার এই ভয়াবহ সঙ্কট দূর করতে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ ও কার্যকর তদারকির দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, লক্ষ্মীছড়ি উপজেলায় মোট ৪০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে অনুমোদিত শিক্ষক পদ ২৩৪টি হলেও বর্তমানে কর্মরত মাত্র ১৬০ জন। অর্থাৎ ৭৪টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষক ২২ জন এবং সহকারী শিক্ষক ৫২ জনের পদ খালি রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার চারটি বিদ্যালয়ে মাত্র একজন করে শিক্ষক কর্মরত আছেন। বিদ্যালয়গুলো হলো- ফুত্যাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বানরকাটা মধ্যপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নারান্যাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং দুরছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এর মধ্যে বানরকাটা মধ্যপাড়ায় ৬৬ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে একজন শিক্ষকের ওপর নির্ভর করে। ৯টি বিদ্যালয়ে রয়েছে মাত্র দুজন করে শিক্ষক, অথচ এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা গড়ে ৬০ থেকে ১০০ জনের মধ্যে।

লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা লিটন চন্দ্র সূত্রধর বলেন, একসময় সব স্কুলেই নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষক পদায়ন করা হয়েছিল। কিন্তু যোগদানের পর অনেকে নানা অজুহাতে প্রভাব খাটিয়ে অন্যত্র বদলি হয়ে যায়। স্থানীয়ভাবে নিয়োগ না দেয়ার কারণেই এই সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। তিনি আরো জানান, শিক্ষা অফিসেও চারটি পদ শূন্য। অফিস সহকারী, উচ্চমান সহকারী, হিসাব সহকারী ও অফিস সহায়ক পদগুলোতে একটি করে পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

শিক্ষক ও অভিভাবকরা জানান, অনেক বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককেই একাধিক শ্রেণীর পাঠদান করতে হচ্ছে। একজন শিক্ষক পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত ৬০ থেকে ১০০ শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে পাঠদানের মান ও শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে সেই শিক্ষক উপজেলা সদরে অফিসে গেলে ক্লাস কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ফলে স্কুলগুলোতে অনুপস্থিতি বেড়েছে, ঝরে পড়ার হারও বাড়ছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, সদর এলাকার স্কুলগুলোতে শিক্ষক তুলনামূলক বেশি থাকলেও দূরবর্তী পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে শূন্যপদই বেশি। যে চারটি বিদ্যালয়ে মাত্র একজন শিক্ষক এবং ৯টিতে দুজন করে শিক্ষক আছেন, সেগুলোর সবই প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত। ফলে পাহাড়ি ও প্রান্তিক পরিবারের শিশুরাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার আলো থেকে।

লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান অংগ্য প্রু মারমা বলেন, যে হারে শিক্ষক শূন্যপদ রয়েছে, তাতে শিক্ষার মান উন্নয়ন অসম্ভব। পূর্ববর্তী সরকারের সময় অন্য উপজেলার শিক্ষকরা তদবির করে বদলি হয়ে গেছেন, কিন্তু তাদের স্থলে নতুন কেউ আসেননি। এখন অনেক স্কুলে একজন শিক্ষক ডেপুটেশনে পাঠিয়ে ক্লাস চালানো হচ্ছে, যা একেবারেই অকার্যকর। তিনি দ্রুত শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানান।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, স্থানীয় যোগ্য প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দিয়ে নিয়োগ দিলে শিক্ষক সঙ্কট অনেকাংশে কমে যাবে। এতে দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীরাও নিয়মিত পাঠদান পাবে। এ বিষয়ে লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার (অ. দা.) তাহমিনা আফরোজ ভূঁইয়া বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি ইতোমধ্যে এ তথ্য জেনেছি এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিতভাবে জানাব। আশা করি দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হবে।