কেউ অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা

বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সভায় প্রধানমন্ত্রী

Printed Edition
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন  : নয়া দিগন্ত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বিভ্রান্তি ছড়িয়ে কেউ অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি সবাইকে সতর্ক করে বলেন, বিগত স্বৈরাচারের সময় যারা ‘গুপ্ত’ অবস্থায় ছিল, এখন তাদের ভেতরে থেকে স্বৈরাচারীরা দেশে অরাজকতা উসকে দিচ্ছে কি না সজাগ থাকতে হবে। গতকাল বিকেলে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান এ কথা বলেন। বিএনপি আয়োজিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। অনুষ্ঠানের শুরুতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, মরহুম সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দলের সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ বিএনপির মরহুম নেতাদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। জাতীয় ও দলীয় সঙ্গীত পরিবেশনের পর বিএনপির ৪৮ বছরের পথচলা নিয়ে নির্মিত একটি ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

একটি বিরোধী রাজনৈতিক দলকে ইঙ্গিত করে তারেক রহমান বলেন, স্বৈরাচারী শাসনের সময় দলটি ‘গুপ্ত বেশ’ ধারণ করেছিল এবং পরে তাদের নিজেদের লোকজনই বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেশে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা করছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর পেছনে কারা রয়েছে, তা জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। বিএনপি চেয়ারম্যানের অভিযোগ, ‘এই গুপ্ত বাহিনী ১৯৭১ সাল থেকে বিভিন্ন সময় একে অন্যকে আড়াল ও আশ্রয় দিয়ে এসেছে। ১৯৮৬ ও ১৯৯৬; গত এক যুগ এবং বর্তমান সময়েও বিভিন্নভাবে তারা একে অন্যকে আড়াল করেছে।’

বিএনপি জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক ধারা সমুন্নত রাখা এবং গণতান্ত্রিক নীতিনৈতিকতা অনুসরণে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তবে কেউ অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইলে দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, একটি নির্বাচিত সরকার হিসেবে পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, প্রত্যেকের সীমার মধ্যে থাকা দরকার।

দেশে বিভিন্ন সমস্যা থাকার কথা স্বীকার করে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আগের স্বৈরাচারী সরকার ও অন্তর্র্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করছে। তবে এসব সমস্যাকে পুঁজি করে কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি বিভ্রান্তি ছড়িয়ে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তা মেনে নেয়া হবে না।

বিএনপি সরকার একটি ‘ভঙ্গুর অর্থনীতি’ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতির পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগব্যবস্থাসহ বিভিন্ন খাতে সমস্যার বোঝা সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। এর সাথে সামাল দিতে হচ্ছে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবও।

দেশের বর্তমান সমস্যাগুলোর মধ্যে জ্বালানি সঙ্কটকে সবচেয়ে বড় বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সঙ্কটে দেশের বহু মানুষ ও শিল্পকারখানার মালিক কষ্টে আছেন উল্লেখ করে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।

তবে অতীত সরকারের রেখে যাওয়া সমস্যাকে শুধু ‘অজুহাত’ হিসেবে দেখাতে চান না জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, সরকার বাস্তবতা জনগণের সামনে তুলে ধরতে চায় এবং এমন পদক্ষেপ নিতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে মানুষ আবার একই ধরনের জ্বালানি সঙ্কটে না পড়ে। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানির দাম বাড়লেও জনগণের ওপর চাপ কম রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত জ্বালানির দাম কিছুটা বাড়াতে সরকার বাধ্য হয়েছে।

বিএনপি নির্বাচনের আগে দেয়া প্রতিশ্র“তিগুলো বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারীদের স্বাবলম্বী করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’, ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিনসহ ধর্মীয় ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়ানো এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে কাজ শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, গ্রামের মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকারের বাজেটে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কম রাখার চেষ্টা করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় ৬০টি পণ্যের ওপর কর বাড়ানো হয়নি; বরং কয়েকটি পণ্যের কর কমানো হয়েছে।

বিএনপির ৪৮ বছরের ভূমিকা

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বক্তব্যে বিএনপির ৪৮ বছরের রাজনৈতিক ভূমিকা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির সাথে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এবং সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নাম জড়িয়ে আছে। জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু এবং প্রবাসী আয় ও তৈরী পোশাক শিল্পের বিকাশের ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। খালেদা জিয়া সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন এবং মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। তারেক রহমান বলেন, শুধু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না, দেশে ‘টেকসই গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ জন্য মানুষের কথা বলার অধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করা জরুরি।

২৪-এর আন্দোলনের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব জনগণের

গত ১৬ বছরের শাসনের সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, ওই সময়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা ব্যাপক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। দলের প্রায় ৫০ লাখের বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ‘গায়েবি মামলা’ ছিল।

বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, বিএনপি প্রকাশ্যে রাজপথে থেকে জনগণকে সাথে নিয়ে আন্দোলন করেছে; কোনো কিছু গোপনে করেনি। ২০২৪ সালের আন্দোলনের সফলতার ‘সম্পূর্ণ কৃতিত্ব’ দেশের জনগণের।

তারেক রহমান বলেন, বিএনপির কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল এবং এখনো আছে। তবে সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে দেশের জনগণ দেখেছে, দীর্ঘদিন ধরে তাদের স্বার্থ রক্ষায় বিএনপি কাজ করেছে।

নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান

দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, শুধু দলীয় পদ-পদবি পাওয়ার জন্য নয়, দেশের জন্য কাজ করতে হবে। সবাইকে সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী করা সম্ভব নয়; অধিকাংশ কর্মী হিসেবেই থাকবেন। তবে কাজের মাধ্যমে প্রত্যেকে নিজেকে একজন ‘সাচ্চা জাতীয়তাবাদী কর্মী’ হিসেবে প্রমাণ করতে পারেন।

পরিবেশ রক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর সরকারি পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে দলীয় নেতাকর্মীদের এ কাজে অংশ নিয়ে পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় সভায় আরো বক্তব্য দেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহ, আমান উল্লাহ আমান ও ফরহাদ হালিম ডোনার, যুবদলের সভাপতি আবদুল মোনায়েম এবং ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।