এসএম রহমান, পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)
চট্টগ্রামবাসীর বহুল প্রত্যাশিত কালুরঘাটে কর্ণফুলী নদীর ওপর নতুন রেল-কাম-সড়ক সেতু নির্মাণ প্রকল্প শিগগিরই আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। বর্তমানে প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব মূল্যায়ন এবং চূড়ান্ত নকশা প্রণয়নের প্রস্তুতি চলছে। প্রকল্প পরিচালক (পিডি) প্রকৌশলী আবুল কালাম চৌধুরী গতকাল বিকেলে এ তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নকারী সংস্থার (ঊউঈঋ) নির্দেশনা অনুযায়ী পাঁচটি দক্ষিণ কোরীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে সংক্ষিপ্ত তালিকায় রাখা হয়েছে। চলতি বছরের ৩ জুন প্রতিষ্ঠানগুলো কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে বর্তমানে প্রস্তাবগুলো মূল্যায়ন করছে। খুব শিগগিরই একটি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্তভাবে নিয়োগ দেয়া হবে। ওই প্রতিষ্ঠান মূল সেতুর বিস্তারিত ও চূড়ান্ত নকশা প্রণয়ন করবে। নকশা সম্পন্ন হওয়ার পর নির্মাণকাজের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে। এরপর নদী ও দুই পাড়ে দৃশ্যমান নির্মাণকাজ শুরু হবে। প্রকল্প পরিচালক জানান, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে চার লেনের রেল-কাম-সড়ক সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ করার প্রত্যাশা রয়েছে।
দুই দেশের যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ১১ হাজার ৫৬০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন চার হাজার ৪৩৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ সাত হাজার ১২৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা। প্রকল্পের জন্য ঊউঈঋ ও ঊউচঋ ঋণের পরিমাণ যথাক্রমে ৭২৪.৭২৯ মিলিয়ন ও ৯০.১৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৪ সালের ২৭ জুন প্রকল্পের ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। গত বছরের ১৪ মে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুস রেল-কাম-সড়ক সেতুটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
জানা গেছে, পুরোনো কালুরঘাট সেতুর প্রায় ৭০ মিটার উজানে নতুন সেতুটি নির্মাণ করা হবে। সেতুটির দৈর্ঘ্য হবে ৭০০ মিটার। এর সঙ্গে ৬.২০ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট, ৪.৫৪ কিলোমিটার অ্যামব্যাংকমেন্ট, ২.৪০ কিলোমিটার সড়ক ভায়াডাক্ট এবং ১১.৪৪ কিলোমিটার রেল ট্র্যাকসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। সেতুটির নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্স থাকবে ১২.২ মিটার। রেলপথ হবে ডুয়েল গেজ ও ডাবল ট্র্যাক এবং সড়কপথ হবে দুই লেনের।
প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো পুরনো ও সংকীর্ণ রেল-কাম-রোড সেতুর পাশে নতুন সেতু নির্মাণের মাধ্যমে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে নিরবচ্ছিন্ন রেল যোগাযোগ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত হয়ে চীন, ভারত ও মিয়ানমারের সাথে রেল যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে পণ্য পরিবহনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন রেল করিডোর গড়ে তোলা।
১৯৩১ সালে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেল সেকশনে মিটারগেজ রেললাইনসহ কালুরঘাট সেতু নির্মিত হয়। পরে ১৯৬২ সালে ডেক পরিবর্তন করে এটিকে রেল-কাম-সড়ক সেতুতে রূপান্তর করা হয়। দীর্ঘদিনের পুরনো এ সেতু বর্তমানে জরাজীর্ণ। ফলে ঘণ্টায় ১০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে ট্রেন চলাচল করতে পারে না। ট্রেন চলাচলের সময় সেতুর সড়কপথের যানবাহনও বন্ধ রাখতে হয়।
দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন চালু হওয়া এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে ভবিষ্যতে পণ্য পরিবহনের চাহিদা বাড়ায় নতুন সেতুর প্রয়োজনীয়তা আরো বেড়েছে। এ কারণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথকে ডুয়েল গেজে উন্নীত করার পরিকল্পনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এর আগে পুরনো কালুরঘাট সেতুর সংস্কারকাজ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। প্রায় ১৪ মাসের সংস্কারকাজে সেতুর লোড ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি, ওয়াকওয়ে নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজ করা হয়। সংস্কারের পর মিটারগেজ ট্রেন চলাচলের উপযোগী করে সেতুটি পুনরায় চালু করা হয়। এ কাজে ব্যয় হয় প্রায় ৪৩ কোটি টাকা।
নতুন সেতু নির্মাণ প্রকল্পটি ২০১৮ সালে একনেকে উপস্থাপন করা হয়েছিল। সে সময় নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্স ৭.৬২ মিটার ধরে প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয় এক হাজার ১৬৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা। পরে ২০১৯ সালে নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্স ১২.২ মিটার নির্ধারণ করায় ২০২৩ সালে নতুন করে ফিজিবিলিটি স্টাডি ও কনসেপচুয়াল ডিজাইন করা হয়। এর ভিত্তিতে ২০২৪ সালে প্রকল্পের ডিপিপি পুনঃপ্রণয়ন ও অনুমোদন দেয়া হয়। নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্স বাড়ায় সেতুটি আগের পরিকল্পনার তুলনায় প্রায় ২৫ ফুট উঁচু করতে হচ্ছে। ফলে নির্মাণব্যয়ও বহুগুণ বেড়েছে।
জানা গেছে, ষাটের দশকের নির্মিত রেলওয়ে পুরনো সেতুটির দৈর্ঘ্য ৬২০ মিটার এবং সেতুটিতে ৯টি স্পেন রয়েছে। কালুরঘাট রেলওয়ের পুরনো সেতুতে স্থাপিত মিটার গেজ রেলওয়ে লাইনের (সেতুর উপর) লোড ক্যাপাসিটি ছিল প্রতি এক্সেলে মাত্র ১২ মেট্রিকটন। অপরদিকে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন লাইনটি সিঙ্গেল ট্রাক এবং ডবল গ্যাজের (এমজি বা মিটার গ্যাজ বিজি বা ব্রডগ্যাজ) এবং এর সার্বিক লোড ক্যাপাসিটি প্রতি এক্সেলে প্রায় ১৫ মেট্রিক টনের বেশি (মিটার গ্যাজে) এবং ব্রডগ্যাজে লোড ক্যাপাসিটি রয়েছে প্রতি এক্সেলে ২৫ থেকে ৩০ মেট্রিক টন। বর্তমানে মিটারগেজ ট্রেন চলাচল করছে যার ইঞ্জিনের প্রতি এক্সেলে লোড ক্যাপাসিটি প্রায় ১৫ মেট্রিক টনের মত। সে কারণেই কালুরঘাটে রেলওয়ে পুরনো সেতুটির লোড ক্যাপাসিটি ১২ মেট্রিক টন থেকে বাড়িয়ে অন্তত ১৫ মেট্রিক টনে উন্নীতকরণের পরেই ট্রেন চলাচল শুরু হয়।
চট্টগ্রামবাসীর প্রত্যাশা, নতুন সেতুটি নির্মিত হলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সাথে রেল যোগাযোগ আরো গতিশীল হবে এবং দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চারিত হবে।



