বাংলাদেশ এখন শক্তিশালী প্রতিপক্ষও

ডারউইনে আনন্দের কাব্য, ম্যাকাইয়ে বেদনার উপাখ্যান

Printed Edition

জসিম উদ্দিন রানা

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের টেস্ট মিশন শেষ। শেষ হয়েছে ১-১ সমতায়। কিন্তু স্কোরকার্ডের এই একটি সংখ্যা দিয়ে উত্তরাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলে অস্ট্রেলিয়ার দুই টেস্টের গল্প বলা যাবে না। এই সিরিজ ছিল একই সাথে স্বপ্ন, বিস্ময়, সাহস, ভাঙন আর সম্ভাবনার গল্প। ডারউইনে যে বাংলাদেশ ক্রিকেটের অসম্ভবকে সম্ভব করার কাব্য লিখেছিল, ম্যাকাইয়ে সেই বাংলাদেশই যেন হঠাৎ নিজের পরিচিত পুরনো আয়নায় ফিরে তাকিয়েছে। তবু শেষ পর্যন্ত এটিকে শুধু সিরিজ ড্র বলা যায় না। বরং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ক্রিকেটের আত্মবিশ্বাসের নতুন একটি দরজা খুলে যাওয়ার গল্প এটি।

তাই অস্ট্রেলিয়া সফর শেষ হলেও গল্পটি শেষ হয়নি। বরং শুরু হলো নতুন এক গল্প, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ আর শুধু অতিথি নয়, প্রতিপক্ষও। ডারউইন সেই বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। ম্যাকাই দিয়েছে তার মূল্য। এখন সময়, সেই বিশ্বাসকে অভ্যাসে পরিণত করার। অস্ট্রেলিয়ার আকাশে বাংলাদেশের পতাকা একবার উড়েছে। পরের স্বপ্ন সেটি যেন আর বিস্ময় না হয়- হয়ে উঠুক স্বাভাবিক।

ডারউইন-বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য এক ঐতিহাসিক নাম হয়ে রইল। প্রথম টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে টাইগাররা শুধু একটি ম্যাচ জেতেনি, ভেঙেছে বহু বছরের মানসিক দেয়াল। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সেটিই বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শীর্ষ দলকে তাদেরই মাটিতে এমনভাবে হারানো ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম বড় অর্জন।

সেই জয়ের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন বোলাররা। প্রথম দিনেই হাসান মাহমুদের ৬/৫৫ যেন অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের পেস-বিপ্লবের ঘোষণা। নতুন বলে তার নিখুঁত লাইন, ধৈর্য আর সাহসী আক্রমণ অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংকে এমনভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল, যা এই সফরের আগে হয়তো কল্পনাও করা কঠিন ছিল। ১৯৮ রানে অস্ট্রেলিয়াকে গুটিয়ে দেয়ার সেই দৃশ্যই পরবর্তী গল্পের প্রথম অধ্যায়।

তারপর এলেন তানজিদ হাসান তামিম। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি। ১০১ রানের সেই ইনিংস শুধু একটি শতক নয়, ছিল আত্মবিশ্বাসের এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর। বাউন্স, গতি, অচেনা পরিবেশ সবকিছুকে পাশে সরিয়ে তানজিদ যেন ব্যাট হাতে বলে দিলেন, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশি ব্যাটারদের জন্যও আকাশটা খুব বেশি দূরে নয়।

তানজিদের সাথে মুমিনুল হক, নাজমুল হোসেন শান্তদের ব্যাটিং এবং পরে মেহেদী হাসান মিরাজের ঘূর্ণি মিলে ডারউইনে বাংলাদেশ লিখেছিল এক পূর্ণাঙ্গ দলীয় বিজয়ের গল্প। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে ২৮৪ রানে থামিয়ে মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য, তারপর ৯ উইকেটের জয়। ক্রিকেটের ভাষায় এটি জয়; বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভাষায় এটি ছিল বিশ্বাসের পুনর্জন্ম।

কিন্তু ক্রিকেট বড় নির্মম শিল্প। একই সফরে কয়েক দিনের ব্যবধানেই তার রং বদলে যায়। ডারউইনের আনন্দের পর ম্যাকাই। নতুন মাঠ, নতুন পরিস্থিতি, নতুন পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষার প্রথম ঘণ্টাতেই বাংলাদেশ যেন নিজের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে গেল। প্রথম ইনিংসে মাত্র ৬৪! সাদমান, তানজিদ, শান্ত, লিটন উপরের সারির একাধিক ব্যাটার শূন্য রানে ফিরে গেলেন। সাত ওভারের মধ্যেই পাঁচ উইকেট হারানো বাংলাদেশ তখন যেন নিজের ছায়াকেও খুঁজে পাচ্ছিল না। ৬৪ রানে অলআউট হওয়া বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের চতুর্থ সর্বনিম্ন দলীয় সংগ্রহ।

অন্য দিকে মিচেল স্টার্ক যেন ডারউইনের বাংলাদেশকে এক ঝটকায় বাস্তবতার মাটিতে নামিয়ে আনলেন। প্রথম ইনিংসে ৬/১২। মাত্র ২২ বলেই পাঁচ উইকেট! বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপের সামনে তার বোলিং ছিল আগুনের মতো। প্যাট কামিন্সও পিছিয়ে ছিলেন না। অধিনায়ক হিসেবে মাঠের প্রতিটি মুহূর্তে তার তীক্ষèতা, বোলিংয়ের আগ্রাসন এবং চাপ তৈরি করার ক্ষমতা বাংলাদেশের ব্যাটারদের নিঃশ্বাস ফেলার জায়গাটুকুও রাখেনি।

তবে ম্যাকাইয়ের গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়ও বাংলাদেশের। ৬৪ রানে অলআউট হওয়ার পরও তারা লড়াই ছেড়ে দেয়নি। শরিফুল ইসলাম বল হাতে যেন হঠাৎ ডারউইনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনলেন। অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে তার ৭/৪৮ শুধু ক্যারিয়ারসেরা নয়, বাংলাদেশের কোনো পেসারের টেস্টে সেরা ইনিংস বোলিং। তিনিই প্রথম বাংলাদেশী পেসার টেস্ট ইনিংসে ৭ উইকেটের মাইলফলক ছুঁলেন।

সেই ম্যাচে ক্যামেরন গ্রিনও নিজের গল্প লিখেছেন। ডারউইনে তার সেঞ্চুরি অস্ট্রেলিয়াকে দ্বিতীয় ইনিংসে কিছুটা লড়াইয়ের সুযোগ দিয়েছিল, আর ম্যাকাইয়েও তিনি দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৬৭ রান করেন। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং যখন বারবার বাংলাদেশের বোলিংয়ের সামনে ভেঙে পড়ছিল, গ্রিন তখন ছিলেন একা দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃক্ষের মতো।

আর স্টার্ক? তিনি যেন এই সিরিজের শেষ কবিতাটিও নিজের হাতে লিখে গেলেন। দুই ইনিংস মিলিয়ে ১০/৫১। ক্যারিয়ারে চতুর্থবারের মতো এক টেস্টে ১০ উইকেট। ম্যাচসেরা, সিরিজসেরা দু’টিই তার দখলে। ৩৬ বছর বয়সেও তার বোলিংয়ের ধার যে এতটা তীব্র হতে পারে, ম্যাকাই তারই প্রমাণ।

শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া জিতল ইনিংস ও ৫১ রানে। মাত্র দুই দিনেই শেষ টেস্ট। বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস থামল ৯৫ রানে। আরো বিস্ময়কর, দুই ইনিংসেই এক শ’র নিচে অলআউট বাংলাদেশ। এমনকি ২১ বছর পর প্রথমবার কোনো দল একই টেস্টে দুই ইনিংসেই একশর নিচে অলআউট হলো।

তাহলে অস্ট্রেলিয়া সফরকে কিভাবে দেখা হবে?

শুধু ফল দিয়ে দেখলে ১-১। কিন্তু ক্রিকেটের আয়নায় দেখলে এর চেয়েও অনেক বেশি কিছু। এই সফর দেখিয়েছে, বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পারে। দেখিয়েছে, বাংলাদেশের পেসাররা অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের অস্বস্তিতে ফেলতে পারেন। দেখিয়েছে, তানজিদ হাসান তামিমের মতো তরুণ ব্যাটার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সেঞ্চুরি করতে পারেন। দেখিয়েছে, হাসান মাহমুদ ৬ উইকেট নিতে পারেন, শরিফুল ইসলাম ভাণ্ডারে ৭ উইকেট জমা করতে পারেন। মিরাজের ঘূর্ণিও অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংকে থামিয়ে দিতে পারে।

আবার এই সফর এটাও নির্মমভাবে দেখিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে টেস্ট ক্রিকেট কতটা কঠিন। একটি ভালো সেশন যেমন ইতিহাস তৈরি করতে পারে, তেমনি একটি খারাপ সেশন পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিতে পারে। ডারউইনে বাংলাদেশ সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ; ম্যাকাইয়ে তারা ব্যর্থ। কিন্তু ব্যর্থতার মধ্যেও শেখার উপকরণ কম নেই।

সবচেয়ে বড় কথা, এই সফর বাংলাদেশের ক্রিকেটকে একটি নতুন প্রশ্ন দিয়েছে, আমরা কি অস্ট্রেলিয়ায় এমন আরো সিরিজ খেলতে পারি? উত্তরটা হওয়া উচিত অবশ্যই।

কারণ ডারউইনের জয় প্রমাণ করেছে, ব্যবধানটি যতটা স্কোরবোর্ডে মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়। আর ম্যাকাইয়ের হার মনে করিয়ে দিয়েছে, সেই ব্যবধান কমাতে হলে নিয়মিত বড় দলের বিপক্ষে বড় মঞ্চে খেলতে হবে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে একটি ঐতিহাসিক জয় নিয়ে দেশে ফিরে আসা আনন্দের। কিন্তু সেই জয়কে একটি বিচ্ছিন্ন রূপকথা না বানিয়ে ধারাবাহিকতার শুরুতে পরিণত করাই হবে আসল সাফল্য।

ডারউইনে বাংলাদেশ ছিল স্বপ্নের মতো। ম্যাকাইয়ে ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। মাঝখানে ছিল তানজিদের শতকের আলো, হাসানের ৬ উইকেটের ঝড়, শরিফুলের ৭ উইকেটের ইতিহাস, গ্রিনের ব্যাটিং, স্টার্কের আগুন আর কামিন্সের নির্মম শৃঙ্খলা।