আবুল হাসান ছাগলনাইয়া-পরশুরাম (ফেনী)
ফেনীর সীমান্তবর্তী জনপদের দীর্ঘদিনের দুই দুঃখ- বর্ষায় ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও মুহুরী-কহুয়া নদীর ভাঙন এবং সীমান্তের মুহুরীর চরে নিজেদের জমিতে যেতে না পারা। একদিকে প্রতি বছর বর্ষা এলেই বাঁধ ভেঙে কিংবা উপচে প্লাবিত হচ্ছে ছাগলনাইয়া, পরশুরাম ও ফুলগাজীর বিস্তীর্ণ এলাকা; অন্য দিকে কয়েক দশকের সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগের পরও দলিল থাকা জমিতে চাষাবাদ করতে পারছেন না বাংলাদেশী কৃষকরা।
এই দুই সঙ্কটের কেন্দ্রেই রয়েছে পরশুরাম সীমান্তের মুহুরী নদী ও মুহুরীর চর। এবার ফেনীবাসীর বহুল প্রতীক্ষিত বাঁধ নির্মাণের জন্য ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকার প্রকল্প নেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পটি কিভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজের একটি অংশ দুর্নীতি বন্ধ এবং দীর্ঘস্থায়ী বাঁধ নির্মাণের স্বার্থে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের অভিযোগ, অতীতেও মুহুরী-কহুয়া নদীর বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও টেকসই সমাধান হয়নি।
অন্য দিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রচলিত প্রক্রিয়ায় একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করা হবে। ফলে বিপুল অর্থের এই প্রকল্পের মান, তদারকি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ রয়ে গেছে।
২০২৪-এর বন্যা দেখিয়েছে বাঁধের দুর্বলতা
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ভয়াবহ বন্যা ফেনীবাসীর কাছে মুহুরী-কহুয়া নদীর বাঁধের দুর্বলতা নতুন করে স্পষ্ট করে দেয়। দেশের অভ্যন্তরে অতিবৃষ্টি এবং ভারতের ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ছাগলনাইয়া, পরশুরাম, ফুলগাজী ও ফেনী সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। বহু ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যায়; ফসল, গবাদিপশু ও অন্যান্য সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
ওই বন্যায় মুহুরী নদীর বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ভেঙে যায়। বিশেষ করে পরশুরামের নিজকালিকাপুর সীমান্তের বল্লামুখা এলাকায় দু’টি স্থানে প্রায় ১৯০ ও ৭০ মিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে প্রায় ৭ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে বাঁধটি পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পুনর্নির্মাণের সময় সীমান্তের ওপার থেকেও বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল। বিজিবি ও স্থানীয়দের তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত কাজ এগোয়।
২০২৪ সালের বন্যার সময় সেনাবাহিনীর ত্রাণ তৎপরতা স্থানীয় মানুষের মধ্যে বিশেষ আস্থার সৃষ্টি করে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত অবস্থায় সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছে দেয়া হয়। সেনাবাহিনী প্রধানও ছাগলনাইয়া এলাকায় বন্যার্তদের সহায়তা করেন।
সেই অভিজ্ঞতা থেকেই স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি- যে বাহিনী দুর্যোগের সময় দ্রুত ও কার্যকরভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, তাদের তত্ত্বাবধানেই এবার শত শত কোটি টাকার বাঁধ নির্মাণ করা হোক।
কেন সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বাস্তবায়নের দাবি?
স্থানীয়দের বক্তব্য, মুহুরী-কহুয়া নদীর বাঁধ নিয়ে অতীতের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। বিভিন্ন সরকারের সময়ে বাঁধ নির্মাণ, সংস্কার ও পুনর্বাসনের নামে বিপুল অর্থ বরাদ্দ হলেও কয়েক বছর পরই একই এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ কারণেই এবার শুধু নতুন বাঁধ নির্মাণ নয়, প্রকল্পের অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং কাজের মান নিশ্চিত করাই স্থানীয়দের প্রধান দাবি।
স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর যুক্তি, সেনাবাহিনীর মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে ঠিকাদারি অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, নি¤œমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং কাজের দীর্ঘসূত্রতা কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে এই দাবির বিপরীতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে এমন কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি যে প্রকল্পটি সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, মুহুরী-কহুয়া নদীর দুই তীরের বাঁধ নির্মাণে বাঁধের ওপরের অংশ প্রায় পাঁচ মিটার প্রশস্ত থাকবে। নদীর দিকের অংশে জিওটিউব এবং বাইরের দিকে সিমেন্ট জিওব্যাগসহ বিভিন্ন প্রকৌশলগত ব্যবস্থা রাখা হবে। একাধিক বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
এখানেই স্থানীয়দের প্রশ্ন- ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকার প্রকল্পে নির্মাণকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য স্বাধীন তদারকি ও জবাবদিহির ব্যবস্থা কী থাকবে? বাঁধ নির্মাণের কয়েক বছর পর যদি আবার একই স্থানে ভাঙন দেখা দেয়, তাহলে দায় নেবে কে?
৬৭ কিলোমিটার বাঁধ, ১,৫৪২ কোটি টাকা
প্রকল্পের আওতায় পরশুরাম থেকে ছাগলনাইয়ার রেজুমিয়া সেতু পর্যন্ত প্রায় ৬৭ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘদিনের বন্যা ও নদীভাঙন থেকে সীমান্তবর্তী কয়েক লাখ মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর পরশুরামের মুহুরী স্টিল ব্রিজ এলাকায় প্রকল্পটির নির্মাণকাজ উদ্বোধনের কথা রয়েছে।
তবে প্রকল্পের বিশাল ব্যয়ের কারণে এর অর্থনৈতিক ও প্রকৌশলগত যৌক্তিকতাও সামনে আসছে। বাঁধটি কেবল বর্তমান নদীর গতিপথ বিবেচনা করে নির্মাণ করা হচ্ছে, নাকি আগামী কয়েক দশকের নদীভাঙন, জলপ্রবাহ ও সীমান্তবর্তী ভূপ্রকৃতির পরিবর্তন বিবেচনায় নেয়া হয়েছে- এ প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মুহুরী নদীর চরিত্র স্থির নয়। নদীর গতিপথ পরিবর্তন, পলি জমা, ভাঙন এবং সীমান্তের ওপারে নদী নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন অবকাঠামো পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি আরেক সঙ্কট- মুহুরীর চর
বাঁধ নির্মাণের খবরের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর ফেনী সফরকে ঘিরে মুহুরীর চরে বাংলাদেশীদের জমির অধিকার ফিরে পাওয়ার দাবিও নতুন করে সামনে এসেছে।
পরশুরাম সীমান্তের মুহুরীর চর নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের বিরোধ দীর্ঘদিনের। নদীভাঙনের কারণে সীমানার বিভিন্ন চিহ্ন বিলীন হয়ে যাওয়ার পর প্রায় ২ দশমিক ৫ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা দীর্ঘদিন অমীমাংসিত ছিল।
দুই দেশের যৌথ জরিপের পর ২০১৪ সালে সীমানা নির্ধারণ করে অস্থায়ী কাঠের পিলার স্থাপন করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, এর মাধ্যমে বাংলাদেশ কমপক্ষে ৬০-৭০ একর জমির মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু স্থায়ী সীমান্ত পিলার স্থাপন না হওয়ায় মাঠপর্যায়ে সমস্যার সমাধান হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জমির দলিল থাকলেও তারা সেখানে যেতে পারছেন না। ফলে বহু বছর ধরে তাদের জমি অনাবাদি পড়ে আছে।
৯ বছর পরও স্থায়ী পিলার নেই
২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ও ভারত ১৯৭৪ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তির প্রটোকল স্বাক্ষর করে। ওই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মুহুরীর চরসহ বিভিন্ন অমীমাংসিত সীমান্ত এলাকায় জরিপের উদ্যোগ নেয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে যৌথ জরিপে মুহুরীর চরের সীমানা নির্ধারণ করা হলেও স্থায়ী পিলার স্থাপন হয়নি। স্থানীয়দের বক্তব্য, ভারতীয় পক্ষের সম্মতি না পাওয়ায় স্থায়ী সীমান্ত পিলার স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
এ দিকে অস্থায়ী কাঠের খুঁটিগুলোর অনেক নষ্ট হয়ে গেছে। জরিপ নম্বরযুক্ত লোহার পাতও অনেক ক্ষেত্রে মরিচা ধরে বিবর্ণ। ফলে মাঠপর্যায়ে সীমানা চিহ্নিত করা আরো কঠিন হয়ে পড়েছে। এখানেই নতুন প্রশ্ন- যে সীমানা যৌথ জরিপে নির্ধারিত হয়েছে, সেটি দৃশ্যমান ও স্থায়ীভাবে চিহ্নিত করতে আর কত বছর লাগবে?
৯২ একর জমির হিসাব কোথায়?
মুহুরীর চর নিয়ে পুরনো নথি ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, বিরোধপূর্ণ এলাকায় প্রায় ৯২ একর জমি রয়েছে। ২০১১ সালের প্রটোকল-সংশ্লিষ্ট তথ্যে এর মধ্যে বাংলাদেশকে ৭১ দশমিক ৯৪ একর এবং ভারতকে ২০ দশমিক ২০ একর দেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
অর্থাৎ কাগজে মালিকানা নির্ধারণের প্রক্রিয়া এগোলেও বাস্তবে ভূমিমালিকরা তাদের জমিতে ফিরতে পারেননি।
স্থানীয় কৃষকদের প্রশ্ন, সীমান্ত নির্ধারণের পরও যদি ভূমিমালিক তার জমিতে প্রবেশ করতে না পারেন, তাহলে চুক্তি ও জরিপের বাস্তব সুফল কোথায়?
এটি শুধু ভূমির মালিকানার প্রশ্ন নয়; এর সাথে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিকের সম্পত্তির অধিকার জড়িত।
নদীর গতিপথ পরিবর্তনের অভিযোগ
স্থানীয়দের আরো অভিযোগ, ভারতের অংশে নদীভাঙন ঠেকাতে বিভিন্ন সময়ে গ্রোয়েন ও অন্যান্য নদী নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নির্মাণের ফলে মুহুরী নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। এর প্রভাবে নদী পূর্ব থেকে পশ্চিমে সরে এসে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে এবং চর সৃষ্টির ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে বলে তাদের দাবি।
১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের আলোচনায় মুহুরী নদীর মধ্যস্রোতকে সীমান্ত হিসেবে বিবেচনার বিষয়টি সামনে আসে। কিন্তু নদীর গতিপথ পরিবর্তনের সাথে সাথে মাঠপর্যায়ে সীমানা নির্ধারণ জটিল হয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের ভাষায়, নদী যেখানে সীমানা, নদী সরে গেলে সীমানা কোথায়- এই প্রশ্নের একটি স্থায়ী ও দ্বিপক্ষীয় সমাধান প্রয়োজন।
সীমান্ত অপরাধের ঝুঁকিও বাড়ছে
মুহুরীর চর ও আশপাশের এলাকা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অমীমাংসিত পরিস্থিতি সীমান্ত অপরাধের ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। পাশেই বিলোনিয়া স্থলবন্দর থাকায় চোরাচালান, মাদক ও অবৈধ অনুপ্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে।
২০১৬ সালের ১২ অক্টোবর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল মুহুরীর চর পরিদর্শন করে উচ্চপর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। এর আগে-পরে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরাও এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, সফর ও বৈঠক হয়েছে, জরিপ হয়েছে, কাঠের পিলার বসেছে- স্থায়ী সমাধান হয়নি।
৫৮ দিনের গুলিবিনিময়, প্রাণহানি ও দীর্ঘ অপেক্ষা
মুহুরীর চর নিয়ে বিরোধ কতটা স্পর্শকাতর ছিল, তার প্রমাণ রয়েছে অতীতের সীমান্ত সঙ্ঘাতেও। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ১৯৭৯ থেকে ১৯৯৯ সালের ২২ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিএসএফ ও তৎকালীন বিডিআরের মধ্যে ৫৮ দিন গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটে।
১৯৯৪ সালের ১৫ জানুয়ারি বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশের বাউর পাথর গ্রামের বেয়াধন বিবি নিহত হন বলে স্থানীয়রা জানান। এ বিরোধকে কেন্দ্র করে বহু বাংলাদেশী আহত হয়েছেন বলেও তাদের দাবি।
অর্থাৎ মুহুরীর চর কোনো সাধারণ ভূমি বিরোধ নয়। এর সাথে সীমান্ত নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার, কৃষিজমি এবং দুই দেশের সম্পর্কের প্রশ্ন জড়িত।
প্রধানমন্ত্রীর ফেনী সফর ঘিরে দুই প্রত্যাশা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন ফেনী সফরকে ঘিরে তাই স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা শুধু একটি বাঁধ নির্মাণের উদ্বোধনকে ঘিরে নয়।
তাদের একাংশ চান- ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকার বাঁধ প্রকল্পটি এমনভাবে বাস্তবায়িত হোক, যাতে ভবিষ্যৎ সরকারগুলোকে প্রতি বছর বাঁধ সংস্কারের জন্য নতুন করে অর্থ বরাদ্দ করতে না হয়। একই সাথে প্রকল্পে স্বচ্ছতা, মান নিয়ন্ত্রণ ও দুর্নীতি প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা থাকুক।
অন্য দিকে মুহুরীর চরের কৃষকরা চান, প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে স্থায়ী সীমান্ত পিলার স্থাপন, সীমানা দৃশ্যমান করা এবং বাংলাদেশী ভূমিমালিকদের জমিতে যাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিন।
পরশুরাম উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল হালিম মানিক বলেন, তারা মুহুরীর চরের জমির ন্যায্য অধিকার ফিরে পেতে চান, যাতে বাংলাদেশীরা নিজেদের জমিতে চাষাবাদ করতে পারেন। তার মতে, বল্লামুখা ও মুহুরী-কহুয়া নদীর বাঁধের দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের পাশাপাশি মুহুরীর চর সমস্যারও সমাধান হওয়া প্রয়োজন।
পরশুরাম উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আবদুল হালিমও সীমান্তবাসীর নিরাপত্তা ও দেশের স্বার্থে মুহুরীর চর বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানান।
ফেনী জেলা জামায়াতের আমির মুফতি আবদুল হান্নান বলেন, তারা সেনাবাহিনীর মাধ্যমে টেকসই বাঁধ নির্মাণ চান। তার মতে, অতীতে জোড়াতালি দিয়ে বাঁধ নির্মাণের কারণে মানুষ স্থায়ী সুফল পায়নি।
ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক মুন্সী রফিকুল আলম মজনু বলেন, মুহুরী-কহুয়া নদীর বাঁধ নির্মাণ বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। প্রধানমন্ত্রীর সফরে এর উদ্বোধন সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। একই সাথে মুহুরীর চরসহ সীমান্তের সমস্যাগুলোর ন্যায্য সমাধানে সরকার কাজ করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এখন নজর তিন জায়গায়
১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকার বাঁধ প্রকল্প এবং মুহুরীর চর- দু’টি পৃথক বিষয় হলেও সীমান্তবর্তী ফেনীর মানুষের কাছে এগুলো একই নিরাপত্তা বাস্তবতার অংশ।
এক দিকে পানি ও নদীর আগ্রাসন, অন্য দিকে সীমান্ত ও ভূমির অধিকার। একটি সমাধান করতে গিয়ে অন্যটি উপেক্ষা করলে সীমান্তবাসীর সঙ্কট থেকেই যাবে।
তাই এখন মূল প্রশ্ন তিনটি- প্রথমত. বিপুল ব্যয়ের বাঁধ প্রকল্পটি কতটা বৈজ্ঞানিক ও দীর্ঘস্থায়ী হবে; দ্বিতীয়ত. নির্মাণকাজে দুর্নীতি ও নি¤œমান ঠেকাতে কী ধরনের স্বাধীন তদারকি থাকবে; তৃতীয়ত. ২০১৪ সালের যৌথ জরিপের পরও কেন স্থায়ী সীমান্ত পিলার স্থাপন করা গেল না এবং বাংলাদেশী ভূমিমালিকরা কবে নিজেদের জমিতে ফিরতে পারবেন।ফেনীবাসীর কাছে এবারের প্রধানমন্ত্রীর সফরের তাৎপর্য এখানেই। তারা শুধু বাঁধের উদ্বোধন নয়- বাঁধের স্থায়িত্ব এবং মুহুরীর চরে অধিকার ফিরে পাওয়ার বাস্তব নিশ্চয়তা দেখতে চান।



