নির্বাচন এলে দেশে উৎসবের আবহ সৃষ্টি হয়। টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার, প্রার্থীদের প্রচারসভা, ভোটারদের উচ্ছ্বাস সব মিলিয়ে গণতন্ত্রের এক প্রাণবন্ত দৃশ্য। কিন্তু এই ছবির আড়ালে যদি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তাহলে সেই উৎসব আসলে অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
নারী যদি রাস্তায় বের হতে ভয় পায়, ভোটকেন্দ্রে যেতে দ্বিধা করে, হয়রানির শিকার হয়- তাহলে গণতন্ত্রের দাবি অর্থহীন। নারী নিরাপত্তাহীনতা শুধু সামাজিক সমস্যা নয়; এটি সরাসরি রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রশ্ন।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় নারীদের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়া, নিকাব বা ওড়না টেনে হেনস্তা করা, প্রচারণার সময় কটূক্তি, এমনকি শারীরিক হামলার অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি উদ্বেগজনক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে নির্বাচনকালীন সময়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা, মিছিল, সমাবেশ, প্রচারণা সবকিছুর ভিড়ে নারীরা হয়ে ওঠেন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।
নিরাপত্তাহীনতা কেন বাড়ছে?
সমস্যার মূলে রয়েছে তিনটি বড় ঘাটতি- আইনের প্রয়োগের দুর্বলতা, প্রশাসনিক উদাসীনতা ও সামাজিক মানসিকতা। প্রথমত. অপরাধীরা জানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শাস্তি হয় না। অভিযোগ করলেও দ্রুত বিচার হয় না। ফলে দুষ্টচক্র সাহস পায়। দ্বিতীয়ত. আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক সময় ঘটনাকে ‘ছোটখাটো’ বলে এড়িয়ে যায়। কিন্তু নারীর কাছে এই ‘ছোট’ ঘটনাই বড় আতঙ্ক। তৃতীয়ত. সামাজিকভাবে নারীর চলাচলকে এখনো নিয়ন্ত্রণের চোখে দেখা হয়। ফলে ভুক্তভোগীকেই দায়ী করা হয়-“কেন বের হলো?”, “কেন ফোন ব্যবহার করছিল?”- এমন প্রশ্ন ওঠে।
এই মানসিকতা না বদলালে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
নির্বাচন ও নারী অংশগ্রহণ : বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। ভোটার তালিকাতেও নারীর সংখ্যা প্রায় সমান। অর্থাৎ নির্বাচন ব্যবস্থার অর্ধেক শক্তি নারীরা। কিন্তু যদি তারা ভয় বা নিরাপত্তাহীনতায় ঘরে বসে থাকে, তাহলে নির্বাচন কখনোই পূর্ণাঙ্গ হবে না।
একজন নারী ভোটকেন্দ্রে যেতে না পারা মানে একটি ভোট কমে যাওয়া নয় বরং গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া।
আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো- নারী প্রার্থী হলেও তিনি নিরাপদ নন। অনেক ক্ষেত্রে নারী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কটূক্তি, চরিত্রহনন, হুমকি, প্রচারণা ব্যাহত করা এসব ঘটনা ঘটে। ফলে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত হয়।
এটা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; রাষ্ট্রীয় ক্ষতি নির্বাচন কমিশনের দায়
নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু পুলিশের নয়; নির্বাচন কমিশনেরও। কমিশনের উচিত স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া- ভোটার, প্রার্থী, কর্মী বিশেষ করে নারী- হয়রানির শিকার হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান পদক্ষেপ দরকার। অভিযোগ গ্রহণের জন্য হটলাইন, দ্রুত প্রতিকার সেল, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত- এসব বাস্তবায়ন না করলে বিশ্বাস সৃষ্টি হবে না।
কমিশনের কথার সাথে কাজের মিল থাকতে হবে। অস্পষ্টতা বা ঢিলেমি নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে।
গণমাধ্যমের ভূমিকা : গণমাধ্যম সমাজের আয়না। কিন্তু অনেক সময় নারীর কণ্ঠ যথেষ্টভাবে উঠে আসে না। অনেক সময় পুরুষ প্রতিবেদক বা বিশ্লেষকের আধিক্যে নারীদের অভিজ্ঞতা আড়াল হয়ে যায়।
নারীরা সাধারণত নারীর কাছেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাই মাঠপর্যায়ে নারী সাংবাদিক ও উপস্থাপকের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। এতে প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে। শুধু দীর্ঘ টকশো নয়- সমাধানমুখী, তথ্যভিত্তিক অনুষ্ঠান দরকার।
আইন ও বাস্তবতা : দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, দণ্ডবিধি, সাইবার আইন- সবই আছে। কাগজে-কলমে সুরক্ষা কম নয়। কিন্তু আইনের প্রয়োগ না হলে আইন অর্থহীন। অপরাধী যদি দ্রুত শাস্তি না পায়, তাহলে ভুক্তভোগীর আস্থা ভেঙে পড়ে। বিচার বিলম্ব মানেই বিচার অস্বীকার। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি জরুরি- যাতে অন্যরা সতর্ক হয়।
করণীয় : কথার বাইরে বাস্তব পদক্ষেপ
নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ এখনই নেয়া যায়- প্রথমত. টিভি চ্যানেলে নারীদের সাক্ষাৎকার নিতে হবে। দ্বিতীয়ত. নারী আলোচনাকারী এবং সাক্ষাৎদানকারীদের সংখ্যা বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত. নারীকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নারীদের ওপর হামলাকারীদের প্রতিরোধ করতে হবে। চতুর্থত. নারীদের নিজেদের মোবাইল ও নিকাব সাবধান রাখতে হবে। পঞ্চমত. অভিযোগ দ্রুত পুলিশকে জানাতে হবে এবং পুলিশকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে। ষষ্ঠত. শুধু অভিজাত পরিবারের কয়েকজনকে নিয়ে অভিযান করলে হবে না। সপ্তমত. টিভি চ্যানেলে মহিলা পাঠাতে হবে। টিভি চ্যানেল শুধু দীর্ঘ অনুষ্ঠান করলে হবে না? কার্যকর অনুষ্ঠান করতে হবে। অষ্টমত. নারী নিরাপত্তাহীন হলে নির্বাচন আনন্দমুখর হবে না। নারীর নিরাপত্তাহীনতা সর্বাগ্রে দূর করতে হবে। এটা কোন দলীয় ব্যাপার নয়; সমগ্র নারী সমাজের ব্যাপার। নবমত. নারীদের আত্মরক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দশমত. নারী বিরোধী অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। শেষত. আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ম্যাজিস্ট্রেট এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে হবে।
শেষ কথা : নারীর নিরাপত্তাহীনতা মুখ্য। নারীকে কিছুতেই নিরাপত্তাহীন হতে দেয়া যাবে না। আমাদের দেশে জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। এই জন্য এদের ব্যাপারটাকে উপেক্ষা করা যুয় না। নারীদের ব্যাপারে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে সামাজিক দায়বদ্ধতাও রয়েছে। সব দায় প্রশাসনের ওপর চাপিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।
পরিবার, সমাজ, রাজনৈতিক দল- সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে। নারী নিরাপত্তা কোনো দলীয় ইস্যু নয়; এটি মানবিক ও জাতীয় ইস্যু। যে সমাজ নারীর সম্মান রা করতে পারে না, সে সমাজ কখনো উন্নত হতে পারে না।
গণতন্ত্রের সাফল্য মাপা যায় ভোটের সংখ্যায় নয়, অংশগ্রহণের স্বাধীনতায়। নারী যদি ভয়মুক্ত না থাকে, তাহলে গণতন্ত্রও নিরাপদ নয়। নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে কেবল একজন ব্যক্তিকে সুরক্ষা দেয়া নয়; বরং পুরো রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা।
নির্বাচন আনন্দমুখর হতে হলে প্রথম শর্ত- নারীর নিরাপত্তা। এই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে সবাইকে। কারণ স্পষ্ট- নারী নিরাপদ না হলে গণতন্ত্রও নিরাপদ নয়। নারী নিরাপত্তাহীনতা কোনোভাবেই চলতে পারে না।



